
২০০৪ সালের ২৫ অক্টোবর নয়া দিগন্তের প্রথম সংখ্যার বাংলার দিগন্ত বিভাগে ‘বিলুপ্তির পথে বরগুনার রাখাইনদের তাঁতশিল্প’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়, উপকরণমূল্য বৃদ্ধি, পুঁজির অভাব, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাহীনতা এবং চোরাইপথে আসা সস্তা বর্মিজ পণ্যের অবাধ দখলের কারণে বরগুনার তালতলীর রাখাইন সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প আজ বিলুপ্তির পথে। পৈতৃক এই পেশা রক্ষা করতে এবং মানবেতর জীবনযাপন করা রাখাইন পরিবারগুলোর ভাগ্যোন্নয়নে সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ, ন্যায্যমূল্যে উপকরণ সরবরাহ ও অবৈধ পণ্য প্রবেশ রোধে সরকারি জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
বরগুনার রাখাইনদের তাঁতশিল্প নিয়ে লেখা প্রতিবেদনটি আজ নয়া দিগন্তের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো—
বিলুপ্তির পথে বরগুনার রাখাইনদের তাঁতশিল্প
বরগুনা থেকে সংবাদদাতা
পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে বরগুনার তালতলীর রাখাইন সম্প্রদায়ের আদি ও প্রধান পেশা তাঁত শিল্প। প্রথাগতভাবেই এই সম্প্রদায়ের মহিলারা নিজেদের কাপড় নিজেরাই বুনে থাকেন। নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর পর উদ্বৃত্ত লুঙ্গি, চাদর, তোয়ালে প্রভৃতি বিক্রি থেকে আয় দিয়ে সংসার চলে তাদের। কিন্তু আবহমানকাল থেকে চলে আসা রাখাইনদের সেই জীবনচিত্র পাল্টে গেছে এখন। জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া আনন্দ-বিনোদনের মতোই হারিয়ে যেতে বসেছে তাদের জীবিকার প্রধান অবলম্বন তাঁতশিল্প। অথচ একটু পৃষ্ঠপোষকতা পেলেই টিকে থাকত তাদের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প। ফিরে আসত তাদের জীবনের স্বাভাবিক প্রাণস্পন্দন।
বরগুনার তালতলী থানার বাসিন্দা খেমু খং (২৫) রাখাইন জানান, পূর্বপুরুষের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প এখন ধ্বংসের মুখোমুখি। প্রয়োজনীয় উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি, পুঁজির অভাব, বাজারজাতকরণের সমস্যা, ব্যাংকঋণ প্রকৃতির জটিলতা, সর্বোপরি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে রাখাইনদের তাঁতশিল্প এখন বিলুপ্তির পথে। আবহমানকাল থেকেই রাখাইন সম্প্রদায় তাঁত শিল্পকে আদি ব্যবসা বলেই জেনে আসছে এবং করে আসছে। কিন্তু নানা সমস্যার জালে আটকা পড়ে তারা আজ বাধ্য হচ্ছে তাঁতশিল্প থেকে নিজেদের সরিয়ে নিতে।
একসময় পটুয়াখালী, বরগুনা জেলার তিনটি থানায় প্রায় ৩-৪ হাজার রাখাইন পরিবারের বসতি ছিল। কুয়াকাটা, হাজিপুর মহিপুর, আলিপুর, মনিপুর, মিশ্রিপাড়া, আমখোলাপাড়া, কাফনিপাড়া, ছায়ানিপাড়া, নয়াপাড়া, চেইয়াপাড়া, নাচনাপাড়া নিথোপাড়া, ঠাকুরপাড়া, ছাত্রতন পাড়া, তালতলী পাড়া, মুনখে পাড়া, আগা ঠাকুর পাড়া, তালুকদার পাড়া, সওদাগর পাড়া, কবিরাজ পাড়া, মামেসে পাড়া, লাউপিড়া, তাঁতি পাড়া অংকুজে পাড়াসহ বিভিন্ন রাখাইন এলাকায় একসময় প্রায় ৫ হাজার পরিবার তাঁতশিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিল। কিন্তু নানা প্রতিকূলতায় এর বেশি ভাগ তাঁত এখন আর চলে না। নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত হয়েও নিজেদের বৈশিষ্ট্য ধরে রাখা এবং ব্যবহারের পোশাক তৈরির নিমিত্তে কিছু রাখাইন পরিবার এখনো তাঁত বুনে চলেছে।
রাখাইনদের তাঁতে বোনা পণ্যের মধ্যে লুঙ্গি, চাদর, তোয়ালে, ব্যাগ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে এ দুটি জেলায় প্রায় ৫ হাজার পরিবারের বর্তমানে শুধু কলাপাড়া ও তালতলী থানায় একশ’র মতো পরিবার তাঁত শিল্পের সঙ্গে জড়িত আছে। বাকিরা সবাই বাধ্য হয়েছে হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী পেশাকে বিদায় জানাতে। পর্যবেক্ষক মহলের মতে রাখাইনদের ধ্বংস ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে বর্মিজ পণ্যের। সীমান্ত দিয়ে চোরাইপথে প্রতিদিন ঢুকছে বর্মিজ লুঙ্গি, চাদর, সেভেল প্রভৃতি পণ্য। চাকচিক্যময় এসব বর্মিজ পোশাকের প্রতি ক্রেতাদের স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহ বেশি। উপরন্তু দামও রাখাইনদের বোনা কাপড়ের চেয়ে কম। সুতরাং বর্মিজ পণ্যের অবাধ প্রবেশ এবং বাজার দখলও এদের করেছে। এ ব্যাপারে রাখাইনদের বক্তব্য হচ্ছে তাদের কাপড় বর্মিজ কাপড়ের চেয়ে বেশি দাম হলেও দ্বিগুণ টেকসই। ক্রেতারা এসব বিচার-বিবেচনা না করেই পণ্য কিনছে। সব মিলিয়ে রাখাইন পল্লীতে এখন বাজছে অভাবের করুণ সুর। মানবতের জীবনযাপন করছে তারা। এতকিছুর পরও এখনো তারা সুদিনের স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন দেখে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার, তাদের ভাগ্যোন্নয়নের। সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ এবং ন্যায্যমূল্যে প্রয়োজনীয় উপকরণ পেলে আবার বিপুল উৎসাহ ফিরে পেয়ে তারা যেতে পারে পৈতৃক পেশায়। পাশাপাশি অবৈধ পথে বর্মিজ পণ্য যাতে না ঢুকতে পারে সে দিকেও সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন রাখাইনরা।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








