
কুয়াকাটা (পটুয়াখালী) থেকে ফিরে আবু সালেহ আকনের লেখা ‘রাতের মুঠোয় জীবন নিয়ে সমুদ্রে ইলিশ ধরতেন কুয়াকাটার জেলেরা’ প্রতিবেদনটি ২০০৪ সালের ২৫ অক্টোবর নয়া দিগন্তের প্রথম সংখ্যায় জেলার সমস্যা, সম্ভাবনা ও সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম তুলে ধরার উদ্যোগ ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় পটুয়াখালীর উপকূলীয় এলাকার জেলেদের জীবন নিয়ে প্রকাশিত হয় ‘রাতের মুঠোয় জীবন নিয়ে সমুদ্রে ইলিশ ধরে কুয়াকাটার জেলেরা’ শিরোনামের প্রতিবেদন।
প্রতিবেদনের শুরুতে বলা হয়, ৫৬ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশে প্রতিটি জেলারই রয়েছে নিজস্ব সমস্যা, সম্ভাবনা, সাফল্য ও ব্যর্থতা। কিন্তু অনেক সময় এসব সমস্যা ও সম্ভাবনার যথাযথ চিত্র সামনে আসে না। ফলে সম্ভাবনাগুলো বাস্তব সাফল্যে রূপ নিতে পারে না। এ বাস্তবতায় দেশের বিভিন্ন জেলার সমস্যা, সম্ভাবনা ও সাফল্য তুলে ধরার পরিকল্পনা নিয়েছিল নয়া দিগন্ত। প্রথম পর্যায়ে বেছে নেয়া হয় দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকা পটুয়াখালীকে।
আজ নয়া দিগন্তের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রতিবেদনটি পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো—
রাতের মুঠোয় জীবন নিয়ে সমুদ্রে ইলিশ ধরে কুয়াকাটার জেলেরা
আবু সালেহ আকন, কুয়াকাটা (পটুয়াখালী) থেকে ফিরে
৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই দেশে জেলার সংখ্যা ৬৮। প্রতিটি জেলাতেই আছে নানারকম সমস্যা-সম্ভাবনা, রয়েছে সফলতা-ব্যর্থতা। সমস্যার আড়ে আড়ে অনেক। কিন্তু কেবল সমস্যা-ব্যর্থতার চিত্রটাই বড় করে ফুটিয়ে তোলা প্রায়ই উঠে আসে না সঠিকভাবে। এ কারণে সম্ভাবনা যেমন ব্যর্থতার পরিণতি লাভ করে না, তেমনি সম্ভাবনার সমীকরণও ভুলে থাকে নিজের পর দিন, বছরের পর বছর। আপনাদের পত্রিকা 'নয়া দিগন্ত' অন্যয়েরও পড়তে থাকা যেসব সমস্যা-সম্ভাবনা ও সাফল্য-সাফল্যের খবর তুলে আনতে চায় জাতির সামনে। তারই ধারাবাহিকতায় পর্যায়ক্রমে প্রতিটি জেলার ওপর থেকে একাধিক ভিন্ন ভিন্ন পাতার আয়োজন। প্রথম পর্যায়ে আমরা বেছে নিয়েছি দেশের সর্বদক্ষিণের উপকূলীয় জেলা পৌরসাখালীকে। জেলা সম্পাদনায় এবং সমৃদ্ধ থেকে তাদের ঘরে ঘরে আনা হেল্প নিচেই আমাদের প্রথম প্রতিবেদন।
লবণাক্ত সমুদ্রের ছোঁয়া লাগা জীবন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগরে যাওয়া। জীবনটা যাদের মুঠোয় নিয়ে ফিরে আসে। মালে মালে ঝড়-তুফানে তলিয়ে যায় জীবনের মায়া বাড়িয়ে দিনরাত। নিমজ্জিত হয় অনেক জেলেরা। জীবন সন্ধ্যাতে থাকা জেলেরা যে মায়া ধরে আসে, তার সবটাই বিক্রি করে দেয়।
মহাজনদের কাছে মহাজনদের হাত ধরেছে সমুদ্রের কালাখানি ইলিশ চলে যায় লেড়ার সব ঘাটে। তবে মহাজনের কাছ থেকে রুমিন্টের যে দাম পায় জেলেরা, তাদেরকে কতক্ষণ বেশি নামে তা জেলেরাঁ, তাদেরকে কয়েকজন বেশি দামে তা বিক্রি হয় দেশের বিভিন্ন বাজারে। একদিকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গভীর সূত্রে ইলিশ ধরে আনার পর আর নায়াত্মনা থেকে বঞ্চিত হয় জেলো। অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ক্রেতা-ভোক্তারা অতি উচ্চমূল্যে ইলিশ কিনতে বাধ্য হয়। নদী কিংবা সমুদ্র ইলিশ ধরা ও খুচরা বাজারে বিপণনের এই প্রক্রিয়ায় অবিশ্বাস্য রকমের সুবিধা হাতিয়ে নেয় 'মহাজন' পরিচয়ধারী অসাধু মধ্যস্বত্বভোগী চক্র। সহজ কথায় রূপালি ইলিশের জগতে এখন এক শ্রেণীর মুনাফালোভী অসাধু মহাজন চক্রের হাতে জিম্মি।
সরজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, পটুয়াখালীর কলাপাড়া থানার কুয়াকাটা, আলিপুর ও মহিপুর এলাকা এবং পিরোজপুর ও বরগুনা জেলার উপকূলীয় গ্রাম জনপদে অন্তত ৫০ হাজার জেলে আছে যারা বছরজুড়ে গভীর সমুদ্রে ইলিশ মাছ ধরে। ইলিশের মৌসুমে প্রতিদিন গড়ে এক হাজার থেকে তিন হাজার মন পর্যন্ত ইলিশ ধরা পড়ছে এই এলাকায়। এ অঞ্চলের অধিকাংশ জেলেরই বাপ-দাদার পেশা মাছ ধরা। সেই সূত্র ধরেই তারা এই পেশায় জড়িয়ে পড়েছে। বেশিরভাগ জেলে পরিবারই ভূমিহীন। পরের জায়গায় অথবা সরকারি খাস জমিতে ঘর তুলে তারা বসবাস করে। আর সাগরে গিয়ে মাছ ধরে সংসার চালায়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা সাগরে যায়। কখনো ঝড়-তুফান, আবার কখনো জলদস্যুদের হামলা—এসব কিছুর সাথে যুদ্ধ করে তারা সাগরে মাছ ধরে। কুয়াকাটার লেন্দুর চরের বাসিন্দা সুফিয়া একজন জেলে বউ। তার স্বামী ইউসুফ হাওলাদার একসময় সাগরে মাছ ধরতেন। বেশ কিছুদিন যাবৎ তিনি অসুস্থ। ছেলে সোহারাব এখন মাছ ধরে সংসার চালায়। ছেলে সাগরে মাছ ধরতে গেলে তিন/চার দিনে আর বাড়িতে ফেরে না। এই সময় মা সুফিয়া সাগর পাড়ে বসে থাকেন। সুফিয়া বলেন, 'পেটের দায়ে ছেলেকে পাঠাতে হয় সাগরে। কখন কি হয়ে যায় আল্লাহ জানেন। ছেলে ফিরে না আসা পর্যন্ত রাত-দিন এভাবেই সাগর পাড়ে বসে থাকি।' মাঝে মাঝেই মাছ ধরতে গিয়ে সাগরে হারিয়ে যায় জেলেরা। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত ৫ বছরে সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে দু'শতাধিক জেলে নিখোঁজ হয়েছে। দুর্বৃত্তদের হাতে অপহৃত ও নিহত হয়েছে কমপক্ষে আরো ৫০ জন। এভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জেলেরা সাগরে মাছ ধরে। সেই মাছ নামমাত্র মূল্যে মহাজনের আড়তে বিক্রি করতেই চলে তাদের সংসার। মহাজনের মর্জি মাফিক মাছের দাম বাবদ সামান্য আয় হয়, তাতেই তুষ্ট থাকতে হয় তাদের। কুয়াকাটার জেলে অনিল জানান, বাজারে যখন ইলিশ মাছের সর্বোচ্চ মূল্য থাকে, তখনও জেলেরা কেজিপ্রতি ৮০ টাকার বেশি পায় না। সাধারণ মানুষ এই মাছ অনেক সময় কেজিপ্রতি ৪/৫ শত টাকায় কিনে খায়। যদিও বেশিরভাগ জেলেই জানতে পারে না, খুচরা বাজারে তাদের মাছ কি দামে বিক্রি হয়।
চলতি অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে জেলেরা যখন সাগর থেকে মাছ ধরে বিভিন্ন আড়তে ৫০ টাকা কেজি দরে ইলিশ বিক্রি করেছে, তখন রাজধানীতে ইলিশের কেজি ছিল ২শ' টাকারও বেশি। অথচ মহাজনরা জেলেদেরকে সবসময় বলে যে, তারা কেজিপ্রতি ৫/১০ টাকা ব্যবসা করে। মহিপুরের আড়তদার হালিম বলেছেন, তারা ইলিশের মনপ্রতি ৪/৫শ' টাকা ব্যবসা করে থাকেন। কিন্তু খরচ যায় হয়ে পথে পথে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় মাছ পাঠাতে পরিবহন ব্যয় হয় অনেক। এছাড়া রাস্তায় রাস্তায় পুলিশকে চাঁদা দিতে হয়। কুয়াকাটার মৎস্য আড়তদার সমিতির সভাপতি আব্দুর রহিম জানান, তারা ঢাকা, রাজশাহী, মধুখালী, মাগুরা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, দিনাজপুর, যশোর এবং গোপালগঞ্জে মাছ পাঠান। এসব স্থান থেকে আবার অধিকাংশ ইলিশ ভারতে রপ্তানি হয়। মাছ পাঠাতে গিয়ে তারা প্রতিনিয়ত পুলিশের চাঁদাবাজির শিকার হন। কুয়াকাটা থেকে ঢাকায় এক ট্রাক মাছ পাঠাতে কমপক্ষে তিন হাজার টাকা পুলিশকে দিতে হয়। খেপুপাড়া থেকে শুরু হয়ে যায় পুলিশের চাঁদাবাজি। এরপর আমতলী, পটুয়াখালী, দপদুপিয়া, বরিশাল, ভাঙা, ফরিদপুর, মানিকগঞ্জসহ কমপক্ষে ২০ স্থানে পুলিশকে চাঁদা দিতে হয়। চাঁদা দিতে না চাইলে তল্লাশির নামে পুলিশ এক/দুই ঘণ্টা গাড়ি আটকে রাখে। এতেই বরফ গলে অনেক সময় মাছ নষ্ট হয়ে যায়। আবার অনেক সময় বাজার ধরা না গেলে লোকসান দিতে হয়। ফলে পুলিশের দাবি পূরণ করেই ইলিশ নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছতে হয়। আর এভাবেই বেড়ে যায় ইলিশের দাম, ৫০ টাকার ইলিশ সাধারণ মানুষকে খেতে হয় ২শ' থেকে ৩শ' টাকা দরে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








