
গাজীপুরের টঙ্গীতে সাত বছর বয়সী এক ছাত্রীকে উত্যক্ত করার অভিযোগকে কেন্দ্র করে ‘ক্বারীউল কুরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদরাসা’য় অনধিকার প্রবেশ, হামলা, ভাঙচুর, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মারধর এবং ১৭ লাখ টাকা চুরির অভিযোগে টঙ্গী পশ্চিম থানায় পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
পুলিশ উত্যক্তের মামলায় অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠালে আদালত তাকে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন। অন্যদিকে, মাদরাসা কর্তৃপক্ষের দায়ের করা মামলায় হামলাকারীদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান ঘটনার বিষয়ে জানান, মাদরাসায় কোনো ধর্ষণ বা বলাৎকারের ঘটনা ঘটেনি। তবে প্রথম শ্রেণির এক ছাত্রীকে চুমু দেয়ার অভিযোগে শিশুটির বাবার দায়ের করা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় (উত্যক্তকরণ) মামলা নেয়া হয়েছে। এ মামলায় অভিযুক্ত খণ্ডকালীন শিক্ষক মো: মোসলেম উদ্দিনকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানো হলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠান।
ওসি আরো জানান, মাদরাসায় বহিরাগতদের নিয়ে অনধিকার প্রবেশ, হামলা, ভাঙচুর, নারী শিক্ষকসহ অন্যদের মারধর ও নগদ ১৭ লাখ টাকা লুটের অভিযোগে পৃথক আরেকটি মামলা করেছেন প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ। আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
মামলার এজাহার ও মাদরাসা সূত্র জানায়, ঘটনার দিন অভিযুক্ত অভিভাবক শাহজালাল রুমি (৩০) ১০ থেকে ১৫ জন বহিরাগত লোক সাথে নিয়ে মাদরাসায় প্রবেশ করেন। তারা অধ্যক্ষের কক্ষের কাচ ও বৈদ্যুতিক বোর্ড ভেঙে তাণ্ডব চালায়। একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া খণ্ডকালীন শিক্ষক মো: মোসলেম উদ্দিনকে ছাত্রীকে ‘বেড টাচের’ অভিযোগে ভারী স্টেপলার দিয়ে মাথায় আঘাত করে রক্তাক্ত জখম করা হয় এবং পরনের পোশাক ছিঁড়ে মারধর করা হয়। বাধা দিতে গেলে প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য শিক্ষক-শিক্ষিকা, উপাধ্যক্ষ ও নিরাপত্তাপ্রহরী দেলোয়ার হোসেন পাটোয়ারীকে মারধর ও লাঞ্ছিত করা হয়। এসময় ড্রয়ারে জমি কেনার জন্য রাখা নগদ ১৭ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যাওয়া হয় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়। এই তাণ্ডবের ভিডিও চিত্র মাদরাসার সিসিটিভি ক্যামেরায় সংরক্ষিত রয়েছে বলে অধ্যক্ষের দাবি।
মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ মাওলানা ক্বারী মো: আলমাছ হোসেন গাজীপুরী বলেন, ‘অভিযুক্ত শিক্ষক মোসলেম উদ্দিন বর্তমানে একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয়ে অনার্স শেষ বর্ষে অধ্যয়নরত। তিনি প্রতিদিন মাত্র তিন ঘণ্টার জন্য খণ্ডকালীন ক্লাস নিতেন। অথচ তাকে উপাধ্যক্ষ বানিয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। উপাধ্যক্ষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ছুটিতে থাকায় তিনি মাদরাসায় ছিলেন না।’
তিনি দাবি করেন, বহিরাগতদের এনে পরিকল্পিতভাবে এ হামলা চালানো হয়েছে এবং জমি কেনার গচ্ছিত ১৭ লাখ টাকা লুটের প্রমাণ তাদের কাছে রয়েছে।
এদিকে, অভিযুক্ত অভিভাবক শাহজালাল রুমির পক্ষে-বিপক্ষে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। তার স্ত্রী দুই সন্তানকে নিয়ে স্থানীয় সফিউদ্দিন রোডে পিত্রালয়ে বাস করেন এবং সেই ক্ষোভ থেকেই বহিরাগতদের নিয়ে পরিকল্পিতভাবে এই মব সৃষ্টি ও তাণ্ডব চালিয়েছেন বলে স্থানীয় একটি পক্ষ দাবি করছে।
আইন নিজের হাতে না নেয়ার আহ্বান জানিয়ে মাদরাসা কর্তৃপক্ষের সংবাদ সম্মেলন
এদিকে, মাদরাসায় হামলা, ভাঙচুর ও শিক্ষকদের ওপর মারধরের প্রতিবাদে শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বিকেলে টঙ্গীর সফিউদ্দিন সরকার একাডেমি রোডে মাদরাসার নিজস্ব ভবনের সামনে এক প্রতিবাদ সমাবেশ ও সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন প্রিন্সিপাল হেদায়েত উল্লাহ আজাদী, মাওলানা আব্দুল মমিন, মাওলানা আব্দুর রহিম, মাওলানা আমিরুল ইসলাম ও মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আলমাছ হোসেনসহ বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনের নেতারা।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, ‘যৌন নিপীড়নের যেকোনো অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করতে হবে। তবে কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে শিক্ষককে মারধর কিংবা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও তাণ্ডব চালানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
তারা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার জোরালো দাবি জানান। একইসাথে হামলায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
বক্তারা বলেন, মাদরাসা শিক্ষা থেকে সাধারণ মানুষ যাতে মুখ ফিরিয়ে নেয় সেজন্যই মব সৃষ্টি করে সাথে সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কথিত ধর্ষণ ও বলাৎকারের গুজব ছড়ানো হয়।
এর আগে ‘শানে সাহাবা খতিব ফাউন্ডেশন’সহ বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনের নেতারাও মব কালচারের তীব্র নিন্দা জানিয়ে হামলাকারীদের অবিলম্বে গ্রেফতার করা না হলে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেন।
প্রতিবেদন প্রকাশ করায় দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রতিনিধিকে হত্যার হুমকি
মাদরাসায় হামলা, ভাঙচুর, শিক্ষক লাঞ্ছনা ও নগদ টাকা লুটের নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন করায় দৈনিক নয়া দিগন্তের গাজীপুর মহানগর প্রতিনিধি মো: আজিজুল হককে মোবাইল ফোনে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছে হামলাকারীরা।
জানা গেছে, ঘটনার সত্যতা তুলে ধরে উভয়পক্ষের বক্তব্যসহ বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করায় ক্ষিপ্ত হয়ে শাহ জালাল রুমি ও ইসমাইল হোসেন রানাসহ হামলাকারীরা সাংবাদিক আজিজুল হককে ফোন করে হত্যার হুমকি দিয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে এবং দেখে নেয়ার হুমকি দেয়। এ ঘটনায় তিনি পেশাগত নিরাপত্তা চেয়ে এবং জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্দেশ্যে টঙ্গী পশ্চিম থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছেন। সাংবাদিককে হত্যার হুমকির ঘটনায় স্থানীয় সাংবাদিক সমাজ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে হুমকিদাতাদের অবিলম্বে গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








