নদী ভাঙনে বিলীন ফসলি জমি ও ঘর-বাড়ি
নদী ভাঙনে বিলীন ফসলি জমি ও ঘর-বাড়ি। নয়া দিগন্ত

কুড়িগ্রামের রৌমারীতে ব্রহ্মপুত্র নদের ভয়াবহ ভাঙনে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন নদী তীরবর্তী মানুষ। নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি, বসতভিটা ও বাপ-দাদার স্মৃতিবিজড়িত আবাসস্থল।

Advertisement

উপজেলার চরশৌলমারী ইউনিয়নের সুখেরবাতি, ঘুঘুমারী, সোনাপুর, খেদাইমারী ও পশ্চিম পাখিউড়াসহ বিভিন্ন গ্রামে নদী ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। নদীতীরের বসতবাড়ি ও আধাপাকা রোপা আমন ধানক্ষেত ভাঙনের কবলে পড়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা তোতা মিয়া জানান, গত এক সপ্তাহের ভাঙনে প্রায় ১৮টি বাড়ি ও ৫০ একর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এতে বহু পরিবার ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

নদী ভাঙনে নিঃস্ব পরিবারগুলো জীবিকা ও বাসস্থানের তাগিদে অন্যের জমিতে অর্থের বিনিময়ে বার্ষিক চুক্তিতে কাঠ ও বাঁশ দিয়ে অস্থায়ী ঘর নির্মাণ করে বসবাস করছে। আবার কেউ কেউ আর্থিক সঙ্কটে জন্মভূমি ছেড়ে অন্যত্র চলে গিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রৌমারী উপজেলার ৩ ও ৬ নম্বর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা শত বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনের শিকার। বছরের পর বছর নদী ভাঙনে ফসলি জমি, বসতভিটা ও বাগানবাড়ি বিলীন হলেও এ অঞ্চলের মানুষের স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। নদীর অব্যাহত ভাঙনে সাত পুরুষের ভিটেমাটিও মুহূর্তের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে। নদীতীরের মানুষের আহাজারি যেন শেষ হওয়ার নয়।

যুগের পর যুগ সরকার পরিবর্তন হয়েছে, নদীশাসনে বিভিন্ন প্রকল্প ও বরাদ্দের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু নদী ভাঙনপ্রবণ এলাকার মানুষের দুর্ভোগ পুরোপুরি কাটেনি। এ অবস্থায় নদীশাসন প্রকল্পের কার্যকারিতা, অর্থের যথাযথ ব্যবহার এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা।

সুখেরবাতি গ্রামের বাসিন্দা ইয়াকুব আলী (৭০) ক্ষোভ ও অভিমান প্রকাশ করে বলেন, দেশ পরিচালনায় সরকার গঠনের সময় মানুষের সমস্যার সমাধান করবে, মানুষের খোঁজখবর নেবে— এমন কত প্রতিশ্রুতিই দেয়া হয়। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর অনেক প্রতিশ্রুতিই আর বাস্তবায়িত হয় না। নদী ভাঙনে আমাদের ঘরবাড়ি ও জমিজমা চলে যাচ্ছে। আমাদের দুর্দশা দেখার যেন কেউ নেই।

তিনি আরো বলেন, নদী ভাঙন রোধে স্থায়ী সমাধানের জন্য সঠিক পরিকল্পনা ও জরিপের মাধ্যমে নদীর প্রশস্ততা ও গতিপথ নির্ধারণ করতে হবে। নদীর দুই তীর রক্ষায় বিজ্ঞানসম্মত নদীশাসন নীতি গ্রহণ করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা জরুরি।

এ বিষয়ে স্থানীয় কলেজশিক্ষক ইউনুস আলী বলেন, দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় নদীশাসনকে ধারাবাহিক কর্মসূচি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। সরকার পরিবর্তন হলেও নদী ভাঙন প্রতিরোধের কার্যক্রম যেন বন্ধ না হয়। পরিকল্পিত নদী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মানুষের বসতভিটা ও কৃষিজমি রক্ষার পাশাপাশি নদীকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্পদে পরিণত করা সম্ভব।

তিনি আরো বলেন, নদীর মাঝ থেকে বালু উত্তোলন ও পলি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা ও পরিবেশগত মূল্যায়ন জরুরি। উপযুক্ত স্থানে পরিকল্পিতভাবে বালু ও পলি ব্যবস্থাপনা করা গেলে নদীর নাব্যতা রক্ষা, ভূমি উন্নয়ন ও নদীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি সম্ভাব্যতা যাচাই করে আবাসন, পর্যটনকেন্দ্র, শিল্পকারখানা, কৃষি ও নৌপরিবহন খাতের উন্নয়ন করা সম্ভব। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্প্রসারণের সুযোগ বাড়বে।

স্থানীয়দের দাবি, ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন রোধে জরুরি ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর তীর সংরক্ষণ কাজ শুরু করতে হবে। একইসাথে ভিটেমাটিহারা পরিবারগুলোর পুনর্বাসন, ফসলি জমি রক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি নদীশাসন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

নদীতীরের মানুষের প্রশ্ন— আর কত বাড়িঘর, ফসলি জমি ও বাপ-দাদার ভিটেমাটি বিলীন হলে স্থায়ী নদীশাসনের উদ্যোগ নেয়া হবে? প্রত্যাশা, প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন থেকে জনপদ ও মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষা করা হোক।