
রংপুরে মন্দিরের নামে জেলা কৃষক লীগ সভাপতি প্রাণ নাথ কৃষ্ণ প্রান্নু কর্তৃক জমি দখলের চেষ্টার কারণে পূজা শেষ হওয়ার ৪০ ঘণ্টা এবং জেলা প্রশাসকের নির্দেশনার ১৮ ঘণ্টা পরেও দুর্গাপূজার প্রতিমা বিসর্জন করা হয়নি।
কালিমূর্তি সরানো ছাড়াই প্রতিমা বিসর্জনে ডিসির নির্দেশনাকে অন্যায় দাবি করে প্রত্যাখান করেছে মালিক দাবিদার পক্ষ। তারা ডিসির বিরুদ্ধে কাগজ ও ভিডিও ফুটেজ না দেখার অভিযোগও তুলেছেন। ফলে জটিলতা আরো বেড়েছে।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বিকেলে ৩টায় সরেজমিনে রংপুর মহানগরীর ঠিকাদারপাড়া অস্থায়ী দুগামন্দিরের গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে এখনো প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হয়নি। দুর্গা প্রতিমা স্থাপন করাই আছে। এছাড়াও সেখানে কালি, স্বরসতীসহ আরো চারটি প্রতিমাও আছে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) সন্ধ্যায় জেলা কৃষক লীগ সভাপতি ও ঠিাকাদারপাড়া অস্থায়ী দুর্গামন্দির কমিটির সভাপতি প্রাণকৃষ্ণ গোস্বামী প্রান্নু ও তার ভাই মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক কমল গোস্বামীর বিরুদ্ধে অস্থায়ী দুর্গামন্দিরে কালিমূর্তি স্থাপন করে প্রতিমা বিসর্জন করার চেষ্টার অভিযোগ উঠে। এসময় জমির মালিক রীতা রানী রায় ও তার পরিবার তাতে বাধা দিলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়। দুইপক্ষের মধ্যে হাতাহাতি, বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটে। ফলে লগ্ন পেরিয়ে গেলেও দুর্গা প্রতিমা বিসর্জন বন্ধ থাকে। ঘটনাস্থলে বুধবার রাত থেকেই বিজিবি মোতায়েন করা হয়। পরিস্থিতি শান্ত হওয়ায় শুক্রবার সকাল থেকে বিজিবি তুলে নেয়া হয়। এখন সেখানে পুলিশ পাহারা দিচ্ছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৭টায় ডিসি অফিসের সম্মেলন কক্ষে জমির মালিক এবং অস্থায়ী মন্দির কমিটির লোকজনের সাথে বৈঠক করেন ডিসি ইসরাত জাহান। দীর্ঘ দুই ঘণ্টা ধরে হয় বৈঠক। এ সময় মহানগর পুলিশসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে ডিসি অস্থায়ী পূজা মণ্ডপটিতে কালীমূর্তি রেখে দুর্গা প্রতিমা বিসর্জন দেয়ার সিদ্ধান্ত জানালে তার তীব্র প্রতিবাদ করেন জমির মালিক রীতা রানী রায় ও তার পরিবার। ডিসির সিদ্ধান্তকে অন্যায় দাবি করে বৈঠক প্রত্যাখ্যান করে চলে যান তারা।
পরে ব্রিফিংয়ে ডিসি ইসরাত জাহান বলেন, ‘রংপুর জেলার প্রতিমা বিসর্জনের যে জটিলতা তৈরি হয়েছে সেই বিষয়ে আমরা উভয় পক্ষের সাথে কথা বলেছি। যারা মালিক পক্ষ এবং মন্দির কমিটি আমরা উভয় পক্ষেরই সুবিধা-অসুবিধা শুনেছি। তাদের বক্তব্য নিয়েছি। আমরা আশা করছি যে এটি খুব সহজেই আমরা সমাধান করতে পারব।’
ডিসি ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘এখানে মালিকানার যারা দাবিদার অর্থাৎ এই তিন শতক জমির মালিকানা দাবি করছে তাদের এখনো চূড়ান্ত রায় আসেনি। আমি তাদেরকে আশ্বস্ত করেছি যে আগামী রোববার (২৫ অক্টোবর) আমি স্বয়ং জেলা ও দায়রা জজ স্যারের সাথে কথা বলে তাদের এই রায়ের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারব যে, রায় কি বলছে, কোর্ট কি বলছে এবং আদালত কি বলছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘ঠিক একইভাবে যারা অপর পক্ষ আছে অর্থাৎ মন্দির কমিটি আছে তাদেরকেও বলেছি, আপনারা মৌখিকভাবে আশ্বস্ত করেন যে, মালিকানা যার প্রতিষ্ঠিত হবে, তারপর সেখান থেকে সিদ্ধান্ত হবে যে অন্য যেসব প্রতিমা আছে সেগুলো দূরীভূত বা সরানো হবে। আমরা চাচ্ছি এ মুহূর্তে প্রতিমা অর্থাৎ দুর্গা প্রতিমা বিসর্জন হোক আমরা সম্প্রীতির রংপুরে একত্রে থাকি।’
ডিসির এই বক্তব্যকে প্রত্যাখান করেছেন জমির মালিক রীতা রানী বলেন, ‘আমার এইটুকুই সম্পদ। জেলা কৃষক লীগ সভাপতি প্রাণ কৃষ্ণ গোস্বামী মন্দীর নয়, প্রান্নু নিজের নামে একটা সাদা কাগজে আমার স্বামীর কাছ থেকে সই নিয়ে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকায় বায়না করেন। যে বায়নার মেয়াদ শেষ হয়েছে সেটা দিয়ে মন্দিরের নামে, ধর্মের নামে দখল করার চেষ্টা করছেন। আমরা ডিসির কাছের বৈঠকে আমাদের কাগজপাতি নিয়ে গেছিলাম। আমাদের যে হুমকি-ধামকি দিয়েছে, তারা যে আমাদের অত্যাচার করছে তার প্রমাণ হিসেবে ভিডিও ফুটেজ নিয়ে গেছিলাম। কিন্তু ডিসি আমাদের সে ভিডিও ফুটেজও দেখেননি এমনকি আমাদের কাগজপাতিও দেখেননি।’
রীতা রানী আরো বলেন, ‘আমাদের ডিসি মহোদয়ের কাছে চাওয়া ছিল যে দুর্গা বিসর্জনের সাথে বাকি যে চারটা মূর্তি আছে এখানে, কালি, লক্ষ্মী, সরস্বতী- এই চারটা মূর্তিও যেন মা দুর্গার সাথে বিসর্জন হয়ে যায়। এই এতটুকুই আবেদন তার কাছে ছিল। কিন্তু সেটা আমাদের গ্রহণযোগ্য হয়নি। কিন্তু উনি বলে দেন যে শুধু দুর্গামূর্তি বিসর্জন হবে। এর জন্য ডিসির এই কথায় আমরা সাড়া না দিয়ে আমরা ওখান থেকে বের হয়ে চলে আসি।’
রীতা রানীর অভিযোগ, ‘আমরা ১৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে প্রতারিত হয়ে আসছি, আমরা ন্যায়বিচার চেয়েও কখনো কোথাও ন্যায়বিচার পাইনি। এখনো সেটাই চলতেছে। এখনো আমরা ন্যায়বিচার পাচ্ছি না। আমাদের জমির খাজনা-খারিজ সব ঠিক আছে, আদালতের রায় আছে। তারপরেও ডিসি সাহেব কাগজপত্র না দেখেই জমি নিয়ে কথা বলছেন। কেন বলছেন জানি না। আমাদের যদি মৃত্যু হয় তবুও আমরা আমাদের জমি কৃষক লীগ নেতার দখলে যেতো দিবো না।’
ঠিকাদারপাড়া অস্থায়ী মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক জেলা কৃষক লীগ সভাপতি প্রাণকৃষ্ণ গোস্বামী প্রান্নুর ভাই কমল কোমল গোস্বামী বলেন, ‘ডিসি মহোদয়ের সাথে বৈঠক করলাম, আমরা বললাম এবং আমাদের কথা উনি শুনলো, দুপক্ষেরই কথা শুনলো। আমাদের কথা হচ্ছে যে আমরা আইনের শ্রদ্ধা রেখে বলছি, কোর্ট আমাদেরকে যেটা রায় দেবে, আমরা সেটাই মেনে নেবো। আদালতে যদি আমরা রায় পাই, বা আদালত যদি ওই জায়গা আমাদেরকে বুঝায় দেয়, তো আমরা থাকবো। আজকেই যদি আমরা মামলায় হেরে যাই, তাহলে আমরা কালকেই ছেড়ে দেব।’
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








