
সাগরকন্যা কুয়াকাটা এখন পর্যটকের পদভারে মুখরিত হয়ে আছে। কুয়াকাটা বিচ কার্নিভাল-২০২৬, আর এর সাথে যুক্ত হয়েছে দুর্গাপূজার ছুটির সাথে এক দিনের সরকারি ও দুই দিনের সাপ্তাহিক ছুটি। সব মিলিয়ে গোটা কুয়াকাটা এখন উৎসবের শহরে পরিণত হয়েছে।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) থেকেই পর্যটকের আনাগোনা শুরু হয়। ইতোমধ্যে তারকা মানের ও আধুনিক মানের সেবাসম্বলিত হোটেলগুলো ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত বুক্ড হয়ে আছে। এছাড়া মাঝারি ও ছোট মানের হোটেলগুলোতেও এখন ৯০ শতাংশ কক্ষে গেস্ট রয়েছে।
পূজা ও সরকারি ছুটিসহ মোট পাঁচ দিনের ছুটির মোক্ষম সুযোগকে কাজে লাগিয়ে হোটেল-মোটেল রিসোর্ট মালিকরা এখন চুটিয়ে ব্যবসা করছেন। তবে খাবার হোটেল ও অভ্যন্তরীণ অটো-ভ্যানসহ যানবাহনে জুলুম চলছে বলে অধিকাংশ পর্যটক অভিযোগ করেছেন।
দুর্গাপূজার উৎসব শেষ হওয়ায় আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই কুয়াকাটা সৈকতে পর্যটকের উপচে পড়া ভিড় শুরু হয়েছে। গোটা সৈকতজুড়ে বেলা ১১টা থেকে পর্যটকরা গোসলে মত্ত হয়ে আছেন। ঘুরছেন পর্যটনকেন্দ্রের সৌন্দর্যমণ্ডিত স্পটগুলো। পর্যটকরা সকাল থেকে রাত অবধি ঘুরছেন কুয়াকাটা সৈকতসহ আশপাশের এলাকায়।
লম্বা ছুটির মধ্যে ২৩ ও ২৪ অক্টোবর দুই দিনের কুয়াকাটা বিচ কার্নিভাল-২০২৬ যোগ হওয়ায় পর্যটনকেন্দ্রটিতে তৈরি হয়েছে বাড়তি উচ্ছ্বাস। ইতোমধ্যে দেশবরেণ্য সঙ্গীত তারকারা এখানে উপস্থিত হয়েছেন। স্থানীয় শিল্পীরাও প্রস্তুতি নিয়েছেন সঙ্গীতানুষ্ঠানের।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) প্রত্যুষে উদ্বোধনী দিনের অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে থাকছে কুয়াকাটা জিরো পয়েন্ট থেকে গঙ্গামতি সৈকত পর্যন্ত ছয় কিলোমিটার বিচ ম্যারাথন। সেখানে গিয়ে সবাই মিলে সূর্যোদয়ের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করবেন।
আজ সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সৈকতের বেলাভূমি থেকে স্পিবোট ও ওয়াটার বাইকে চড়ে সাগরের অগভীর এলাকায় চক্কর দিচ্ছেন কেউ কেউ। শত শত পর্যটক সৈকতের বেলাভূমির বেঞ্চিতে বসে উপভোগ করছেন সাগরের নির্মল প্রকৃতি। আবার কেউ পায়ের পাতা ভেজানো পানিতে নেমে নীরবে হাঁটছেন।
দর্শনার্থীরা নানা কায়দায়, নিজস্ব চিন্তা ও দর্শনে উপভোগ করছেন কুয়াকাটাকে। কেউ কেউ ঘুরছেন রাখাইন পল্লীতে। দেখছেন তাদের নিজস্ব জীবনযাত্রার চিত্র। দেখতে ভুলছেন না আড়াই শ’ বছরের পুরোনো নৌকা। অনেকে রাখাইনদের শত বছরের পুরোনো বৌদ্ধবিহারগুলো পরিদর্শন করছেন। এখানকার ইতিহাস, ঐতিহ্যের খবর নিচ্ছেন। নিজের জানাকে সমৃদ্ধ করছেন কেউ কেউ।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড ও বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের উদ্যোগে এই আয়োজন ঘিরে স্থানীয় সংসদ সদস্য এ বি এম মোশাররফ হোসেনের উপস্থিতিতে প্রস্তুতি সভাও হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতিটি ইভেন্টের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিয়ে নিয়মিত সভা করা হয়েছে। এমপি মোশাররফ হোসেন এসব কর্মসূচি সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নে সার্বক্ষণিক তদারকি করছেন।
পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) মো: শামীমুজ্জামান জানান, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো: জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, পটুয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী, পিরোজপুরের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মিজ সুলতানা জামান জুঁই ও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নূরুন্নাহার চৌধুরীর।
লম্বা ছুটি ও বিচ কার্নিভাল-কুয়াকাটা ঘিরে দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক মন্দা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন কুয়াকাটার হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, খাবার হোটেলসহ পর্যটননির্ভর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ব্যবসায়ীরা। প্রায় ৩০০ হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট, দেড় শতাধিক খাবার হোটেল ও পর্যটনকেন্দ্রিক অন্তত তিন সহস্রাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এখন ব্যস্ত পর্যটক সেবায়।
সংশ্লিষ্টদের মন্তব্য, পাঁচ দিনের ছুটি ও কার্নিভালের সম্মিলিত আয়োজনে এবার জমে উঠেছে কুয়াকাটার পর্যটন ও ব্যবসা-বাণিজ্য।
কার্নিভালকে ঘিরে দেশবরেণ্য ও স্থানীয় শিল্পীদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ঘুড়ি উৎসব, তারকাদের অংশগ্রহণে বিচ ফুটবল, ক্রিকেটসহ নানা আয়োজন রাখা হয়েছে। পর্যটকদের জন্য একাধিক ইভেন্ট বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া ও প্রস্তুতি সম্পন্ন রয়েছে।
উন্নতমানের হোটেলগুলোতে ইতোমধ্যে শতভাগ কক্ষ বুকিং রয়েছে। কুয়াকাটার আধুনিক তারকামানের হোটেল প্রেসিডেন্ট পার্কের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) এমজি মোর্শেদ খান জানান, তাদের হোটেলের সব কক্ষ ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত বুকিং রয়েছে। আগত অতিথিদের সর্বোচ্চ সেবা দিতে তারাও প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। একই তথ্য দিয়েছেন সাধারণ ও মাঝারি মানের তাজওয়ার আবাসিক হোটেলের পরিচালক রণজিৎমিত্র।
তবে খাবারের মান ও পরিবহন সেক্টর নিয়ে অভিযোগ করছেন পর্যটকরা। তাসনিম আহসান নামে এক পর্যটক জানান, তাদেরকে বাসি ফ্রিজিং করা মাছ খাওয়ানো হয়েছে। দামও অনেক বেশি রাখা হয়েছে। তারপরও ভিড়ের কারণে দরকষাকষি করার কোনো সুযোগ নেই।
পৌরসভার নিয়ম অনুযায়ী, কুয়াকাটা চৌরাস্তা থেকে লেম্বুরবন পর্যন্ত জনপ্রতি অটোভ্যান ভাড়া ৪০ টাকা নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু সেখানে ৬০-৮০ টাকা পর্যন্ত নেয়া হচ্ছে। একইভাবে মিশ্রিপাড়াম গঙ্গামতি, কাউয়ারচর, তিন নদীর মোহনা সর্বত্রই মাত্রারিক্ত ভাড়া নেয়া হচ্ছে।
পর্যটক সায়রা পারভিন-জামাল হায়দার দম্পতি জানান, তারা গঙ্গামতি থেকে মাত্র চার কিলোমিটার দূরে কাউয়ার চরে গিয়ে আবার ফিরে এসেছেন। এতেই তাদের থেকে ৬০০ টাকা মোটরসাইকেল ভাড়া নেয়া হয়েছে। এটাকে তারা জুলুম বলছেন।
একটা ডাব বিক্রি হচ্ছে ১৫০-২৫০ টাকা করে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পান দোকানি বললেন, এদের রাজনৈতিক সিন্ডিকেট গডফাদার রয়েছে। বিগত ১৫ বছর ধরে এমনটাই করে আসছেন। এ কারণেই পর্যটকরা এখানে এলে আর দ্বিতীয়বার আসতে চায় না। এছাড়া অধিকাংশ পর্যটক বিচ নোংরা করে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক ইয়াসীন সাদেক জানান, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
কুয়াকাটা বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্য সচিব ও কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো: আরিফুজ্জামান জানান, পর্যটকের নিরাপত্তা ও সেবা নিশ্চিতে সব ধরনের আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ট্যুরিস্ট পুলিশ, থানা পুলিশ, নৌ-পুলিশ, এসআরবির টহল রয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। বিশেষ সেবার জন্য বিশেষ মেডিক্যাল টিম ও অস্থায়ী টয়লেট স্থাপন করা হয়েছে। সর্বাত্মক প্রস্তুতি রয়েছে বিচ কার্নিভাল ও কুয়াকাটায় বেড়াতে আসা পর্যটকের জন্য। মোটকথা কুয়াকাটা এখন পর্যটকের পদভারে মুখরিত রয়েছে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








