চকরিয়া সুন্দরবনের পেরাবন ধ্বংস করে তৈরি হচ্ছে চিংড়ি ঘের
চকরিয়া সুন্দরবনের পেরাবন ধ্বংস করে তৈরি হচ্ছে চিংড়ি ঘের। নয়া দিগন্ত

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের হাত থেকে কক্সবাজারের উপকূলীয় মানুষের সুরক্ষা দেয়া ‘চকরিয়া সুন্দরবন‘ হারিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় প্রভাবশালী মহল সুন্দরবন এলাকার ঐতিহাসিক ম্যানগ্রোভ বন বা পেরাবন ধ্বংস করে অবৈধভাবে চিংড়ি ঘের নির্মাণ করছে।

Advertisement

কক্সবাজারের চকরিয়া ও মাতামুহুরি উপজেলার উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দারা জানান, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলোচ্ছ্বাস থেকে দীর্ঘ সময় ধরে সুরক্ষা দিয়ে আসছিল ম্যানগ্রোভ বন। অবৈধভাবে লিজ ও অনিয়ন্ত্রিত চিংড়ি ঘের গড়ে উঠায় উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ম্যানগ্রোভ বন বা পেরাবন হিসেবে পরিচিত চকরিয়া ও মাতামুহুরি উপজেলার বিস্তৃত বিশাল এই বন দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে।

তারা আরো জানান, সৃজিত সুন্দরী, কেওড়া, বাইন ও গেওয়াসহ নানান প্রজাতির গাছে সমৃদ্ধ ছিল এই ম্যানগ্রোভ বন। এই বনে হরিণ, বন বিড়াল, বাঘসহ বিভিন্ন  বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ছিল।

সরেজমিনে পরিদর্শনকালে অভিজ্ঞ মহল জানায়, ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯০৩ সালে এই বনটিকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯২৬ সালের দিকে সুন্দরবন এলাকায় বসতি স্থাপন শুরু হয়। এ সময় কৃষি কাজের জন্য এক হাজার ছয় শত হেক্টর জমি ইজারা দেয়া হয়। মূলত এখান থেকেই বন ধ্বংসের প্রক্রিয়া শুরু হয় বলে মনে করছেন অভিজ্ঞ মহল।

তারা আরো জানান, ১৯৫০ সালের দিকে প্রায় ২১ হাজার একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত বনের প্রায় সাড়ে ১৮ হাজার একর জমি সংরক্ষিত থাকলেও বাকি অংশ বসতি স্থাপন ও কৃষি কাজের জন্য ইজারা দেয়া হয়। এরপর ১৯৮০ সালের দিকে বাণিজ্যিকভাবে চিংড়ি চাষ করার জন্য একটি মহল বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক নেতাদের হস্তক্ষেপে দখল বাণিজ্য শুরু করে। যার ফলে এই পেরাবন বা ম্যানগ্রোভ বনের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস হয়। কৃত্রিম বাঁধ নির্মাণ করে জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ বাধগ্রস্ত করা হয়। এতে লবণাক্ত পানি ঢুকিয়ে নির্মিত হয় চিংড়ি ঘের।

চকরিয়ার এই সুন্দরবনকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে উচ্চ আদালত। পাশাপাশি বনকে রক্ষা করতে সুরক্ষা ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে একটা রিট আবেদন করা হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে চকরিয়া সুন্দরবনের সংরক্ষিত ২১ হাজার একরেরও বেশি বনভূমিতে দেয়া সব ধরনের অবৈধ ইজারা কেন বাতিল ঘোষণা করা হবে না এবং অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে প্রশাসনের রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তাকে কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না মর্মে একটি রুল জারি করেন আদালত।

স্থানীয়দের দাবি, কক্সবাজার জেলার উপকূলীয় ঐতিহাসিক চকরিয়া সুন্দরবন রক্ষায় অবিলম্বে অবৈধ দখলদার ও অবৈধ লিজ বাতিল এবং ব্যাপক বন নিধন বন্ধ করে ভয়াবহ পরিণতি থেকে রক্ষা করতে হবে।

চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও মাতামুহুরি উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহীন দেলোয়ার জানান, চকরিয়া সুন্দরবন উপকূলীয় এলাকার জলোচ্ছ্বাস, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। এই বনাঞ্চল রক্ষায় সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়নে স্থানীয় প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্তা নেবে।