প্রতাপপুর জমিদার বাড়ি, ফেনীর ঐতিহাসিক জমিদার বাড়ি, দাগনভূঞা প্রতাপপুর রাজবাড়ি, প্রতাপপুর জমিদার বাড়ির ইতিহাস, জমিদার বাড়ি সংস্কার
জরাজীর্ণ প্রতাপপুর জমিদার বাড়ি। সংগৃহীত

রাজা নেই, মসনদ নেই, প্রতাপও নেই। প্রতাপহীন দাগনভূঞার প্রতাপপুর রাজবাড়ী এখন কেবল কালের সাক্ষী হয়ে ঠাঁয় দাড়িঁয়ে আছে। নেই আগের সেই কোলাহল ও জনবসতি। বছরের পর বছর গড়ালেও ঐতিহ্যবাহী প্রতাপপুর জমিদার বাড়িটি সংরক্ষণে নেই কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি। কালের গর্বে হারিয়ে যেতে বসেছে জমিদার বাড়িটির ইতিহাস ঐতিহ্য। অবিভক্ত বাংলার জমিদারি প্রথার জীবন্ত নমুনা এই জমিদার বাড়িটি সংরক্ষণের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন স্থানীয়রা।

Advertisement

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলা ১২২৮ সালের ১৩ ফাল্গুন জমিদার রামনাথ কৃষ্ণ সাহা ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার পূর্বচন্দ্রপুর ইউনিয়নের প্রতাপপুর গ্রামে জমিদার বাড়ি নির্মাণ করেন। স্থানীয়দের কাছে এটি বড়বাড়ি ও রাজবাড়ি নামেই পরিচিতি। প্রায় সাড়ে ১৩ একর জায়গায় নির্মিত রাজপ্রাসাদ সম এ বাড়িতে রয়েছে পাঁচটি অভিজাত ডিজাইনের দ্বিতল ভবন। ওই ভবনে রামনাথসহ তারা পাঁচ ভাই পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। ঘরগুলোর চারপাশে খনন করা ১২টি পুকুরের স্বচ্ছ পানিতে জমিদাররা মাছ চাষ করতেন। পুকুরগুলোতে পাঁচটি দৃষ্টিনন্দন বৈঠকখানা বেষ্টিত ঘাটলায় জমিদারদের পাঁচ পরিবারের বউ-ঝিরা গোসল ও খোসগল্পে মেতে থাকতেন। জমিদারি আমলে দেশ-বিদেশের অন্যান্য জমিদাররা এ বাড়িতেই সফরে বিরতি করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন বলে জনশ্রুতি আছে। একটা সময় মাঠের ধানে ভরে যেত জমিদার বাড়ির উঠান–গোলা আর কাচারি ঘর। ধান উঠানো শেষে শুষ্ক মৌসুমে সেই জমিতে চাষ হতো সরিষা, মটরশুটি, খেসারি, কলাই ও মুসরিসহ বিভিন্ন রবিশস্য। ঘোড়ায় চড়ে জমিদাররা যাতায়াত করতেন এ বাড়ি-ও বাড়ি। উপজেলার সিন্দুরপুর ও রাজাপুর ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে বসে ১০ তালুকের খাজনা আদায় করতেন তারা। সেই খাজনা জমা দিতেন সরকারি কোষাগারে। এ জমিদার বাড়ির ঈশারায় ওঠবস করতেন আশপাশের এলাকার মানুষ। ১৯৫০ সালে জমিদার প্রথা বিলুপ্তির পর এ পরিবারটির ক্ষমতা-দাপট কমতে থাকে। তারপরও দীর্ঘ ৪৮ বছর পর্যন্ত তারা এ বাড়িতে থেকেই নিজস্ব কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ১৯৯৮ সালের দিকে ওই বাড়িতে কয়েকবার হামলা ও লুটপাট হওয়ার পর জমিদারের ওয়ারিশদের মাঝে ভয় কাজ করতে থাকে। একপর্যায়ে তারা নিরাপত্তার অভাব, ব্যবসায়িক সমস্যা ও যোগাযোগ সমস্যার কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ভারতের ত্রিপুরা ও কলকাতায় চলে যান। যাওয়ার সময় তাদের সব জমি ও পুকুরগুলো স্থানীয় কৃষকদের মাঝে বর্গা দেন। দাগনভূঞায় কয়েকটি চৌধুরী, ভূঞা এবং জমিদার বংশের মধ্যে প্রতাপপুর জমিদারদের অবস্থান ছিল শীর্ষে। তারা ছিলো আশপাশের এলাকার জন্য প্রভাবশালী। জমিদারদের চাহিদা অনুযায়ী বাড়িটি ৮০০ থেকে ১৬৪৪ শতাংশে বর্ধিত করা হয়। বর্তমানে প্রতাপ হারালেও ঐতিহ্য নিয়ে মাথা উচুঁ করে দাঁড়িয়ে আছে প্রতাপপুর জমিদার বাড়ি।

জমিদার বংশধররা জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পরও ২০০২ সাল পর্যন্ত এই জমিদার বাড়িটিতে ছিল। সরকারি ও বেসরকারিভাবে কোনো উদ্যোগ না থাকায় ক্রমেই ঐতিহ্য হারাচ্ছে ফেনীর প্রতাপপুর জমিদার বাড়িটি। এখানকার দালান-কোঠা দেখতে অনেকটা নারায়ণগঞ্জের পানাম সিটির মতোই। যার কারণে কম সময়েই স্যোশাল মিডিয়া ও ইউটিউবে বাড়ির ঐতিহ্য শুনে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এখানে দর্শনার্থীরা ছুটে আসেন। কিন্তু নানা সমস্যার কারণে তারা মারাত্মক ভোগান্তিতে পড়েন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ঐতিহাসিক এ বাড়িটি দীর্ঘ সংস্কারহীনতায় জরাজীর্ণ হয়ে আগাছায় ভুতুড়ে বাড়িতে পরিণত হচ্ছে। তবে পর্যটক বান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতের জন্য সংস্কারের দাবি জানান দর্শনার্থীরা। দাগনভুঞা পৌর শহর থেকে যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো হওয়ায় বাড়িটি এক নজর দেখার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থী আসেন প্রতিদিনই। জমিদারদের রেখে যাওয়া নিদর্শনগুলো দেখতে আশপাশের জেলা ও উপজেলার মানুষও ভিড় জমান এ বাড়িতে। তবে নিরাপত্তা, শৌচাগার ও বৈদ্যুতিক বাল্ব না থাকায় সন্ধ্যার আগেই এ বাড়ি ছাড়তে হয় দর্শনার্থীদের।

এছাড়াও দীর্ঘদিন সংস্কারহীনতা ও পরিচ্ছন্নতার কাজ না হওয়ায় এ বাড়িটি ক্রমেই ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। দ্রুত বাংলার জমিদারি প্রথার নিদর্শন হিসেবে বাড়িটি সংস্কার করে পর্যটন বান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার দাবি দর্শনার্থীদের।

দর্শনার্থী আতাউর রহমান মারুফ নয়া দিগন্তকে জানান, ‘আমি ঢাকা থেকে প্রতাপপুর জমিদার বাড়ি দেখতে এসেছি কিন্তু এখানে এসে দেখছি এটি নানা সমস্যায় ভরপুর। বাংলার জমিদারি প্রথার ইতিহাস ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে বাড়িটি সংরক্ষণ করা অতীব জরুরী। সরকার যদি বাড়িতে নিজ উদ্যাগে সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করে এর ইতিহাস ঐতিহ্য রক্ষা পাবে।’

স্থানীয় বাসিন্দা মোজাম্মেল হক সুমন নয়া দিগন্তকে জানান, ‘প্রতাপপুর জমিদার বাড়িটি আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দাগনভূঞার গর্ব এই জমিদার বাড়িটি বর্তমানে নানা সমস্যায় জর্জরিত। আমরা সরকারের কাছে জোর দাবি জানাবো যাতে বাড়িটি সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।’

এ বিষয়ে দাগনভূঞা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহিদুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি নয়া দিগন্তকে জানান, ‘আসলে প্রতাপুর জমিদার বাড়িটি নানা সমস্যায় আক্রান্ত। এটি বাংলার জমিদারি প্রথার অন্যতম নিদর্শন। তবে আমরা খোঁজ নিয়ে জেনেছি, বাড়িটি বর্তমানে ব্যক্তি মালিকানাধীন রয়েছে। এর মূল মালিক বাড়িটি ইজারা দিয়ে তারা ভারতে চলে গিয়েছেন। ব্যক্তি মালিকানা হওয়ায় এ বিষয়ে প্রশাসনের করণীয় কিছুই নেই।’