
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘লুটেরা ও চাঁদাবাজদের জন্য চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতা রক্ত দেয়নি। জনগণ কোনোভাবেই লুটতরাজ, চাঁদাবাজি ও অন্যায়-অবিচার মেনে নেবে না। আগামীতে প্রত্যেকটি অপরাধের হিসাব দিতে হবে। মানুষের ওপর জুলুম করা, মানুষের অধিকার হরণ করা এবং অন্যের হক মেরে দেয়ার জবাবদিহি করতে হবে।’
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুপুরে নগরীর জিইসি কনভেনশন সেন্টারে চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াত আয়োজিত ছাত্র ইসলামী আন্দোলনের সাবেক সাথী-সদস্য সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘ইসলামী আন্দোলনের দায়িত্ব আমৃত্যু পালন করতে হবে। গত ১৭ বছর আমাদের ওপর ভিন্ন মাত্রার জুলুম-নির্যাতন চালানো হয়েছে।
শীর্ষস্থানীয় ১২ জন নেতাকে শতাব্দীর নিকৃষ্ট অপবাদ দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। অথচ তারা এক আল্লাহর ওপর অবিচল ঈমান রেখেছিলেন এবং একটি সুন্দর বাংলাদেশ
বিনির্মাণের স্বপ্ন বুকে ধারণ করেছিলেন।’
জামায়াত আমির বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বাস করে, জামায়াত মানুষের আমানত রক্ষা করবে। এ বিশ্বাস একদিনে তৈরি হয়নি। ফ্যাসিবাদী আমলে অসংখ্য নারী-পুরুষকে জীবন দিতে হয়েছে, অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন।’
তিনি বলেন, ‘অতীতের বিভিন্ন ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। সাবেক একজন বিচারপতির পালানোর সময় ভারত সীমান্তে কলাপাতার ওপর থেকে আটক হওয়ার মতো
ঘটনাও আমাদের শিক্ষা দেয়। মানুষের ওপর জুলুম করা, মানুষের অধিকার হরণ করা এবং অন্যের হক নষ্ট করার পরিণতি সম্পর্কে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। অন্যায় করে কেউ পার পাবে না, প্রত্যেককে নিজ নিজ কর্মকাণ্ডে জবাব দিতে হবে।’
প্রাক্তন সাথী-সদস্যদের উদ্দেশে জামায়াত আমির বলেন, ‘হালাল পথে জীবিকা অনুসন্ধান করতে হবে এবং সততা ও নৈতিকতার সাথে জীবন পরিচালনা করতে হবে। দেশের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এমন কিছু বক্তব্য দেয়া হচ্ছে, যেগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অবান্তর। এসব কথার জবাব দেয়ার ন্যূনতম সময় আমাদের নেই। কথার প্রতিযোগিতায় না গিয়ে আদর্শ, নৈতিকতা ও কাজের মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জন করতে হবে। এ দেশে ইসলাম কায়েম হবে, ইনসাফের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হবে।’
কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগর আমির মুহাম্মদ নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আজাদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ শাহজাহান, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী এমপি, সাবেক চাকসু ভিপি অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন সরকার, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ও ডাকসু জিএস এস এম ফরহাদ, চাকসু ভিপি ইব্রাহিম হোসেন রনি প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে বাংলাদেশের কয়েকটি জেলার মধ্যে চট্টগ্রাম বীরদর্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। চট্টগ্রামে প্রাক্তন সাথী-সদস্যদের এমন আয়োজন আমাকে অভিভূত করেছে। ইসলামী আন্দোলন দুনিয়াবি কোনো স্বার্থ বা ব্যক্তিগত প্রাপ্তির জন্য নয়, বরং আদর্শিক বিশ্বাস ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যেই এ আন্দোলন পরিচালিত হয়। দেশ ও জাতির কল্যাণে ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে একটি সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।’
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আজাদ বলেন, ‘আমাদের সবার মধ্যে ঈমানের সেই ফুলকি এখনো জাগ্রত রয়েছে। প্রাক্তন সাথী-সদস্য সম্মেলনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সবার উপস্থিতি তারই প্রমাণ। এ সম্মেলন কেবল একটি মিলনমেলা নয়, বরং দেশের প্রয়োজনে ও জাতির সঙ্কটময় মুহূর্তে ঐক্যবদ্ধভাবে অগ্রণী ভূমিকা পালনের প্রত্যয়। অতীতের আদর্শিক শিক্ষা ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দেশ গঠনে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে ‘
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ শাহজাহান বলেন, ‘দেশের মানুষ একটি আদর্শিক পরিবর্তনের জন্য অপেক্ষা করছে। এ পরিবর্তন ছাড়া দেশের প্রকৃত কল্যাণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মানুষের প্রত্যাশার কিছুটা প্রতিফলন দেখা গেছে। জনগণের এ প্রত্যাশাকে ধারণ করে ন্যায়বিচার, সততা ও জনকল্যাণের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে সবাইকে ভূমিকা রাখতে হবে।’
ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির ও সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি বলেন, ‘ছাত্রজীবনে সংগঠন থেকে অর্জিত নীতি-নৈতিকতা, আদর্শ ও প্রশিক্ষণের শিক্ষা পুরো জীবন কাজে লাগাতে হবে। ছাত্রশিবির নেতৃত্ব তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারখানা। ছাত্রজীবনে অর্জিত সেই নেতৃত্বের গুণাবলি মূল সংগঠন ও সমাজজীবনে প্রতিফলিত করতে হবে। দেশের মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসতে হবে এবং সততা ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে।’
ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, ‘ক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে দলাদলি কাম্য নয়। বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জনে পারস্পরিক ঐক্য, সহনশীলতা ও দায়িত্বশীলতা বজায় রাখতে হবে। দেশের নেতৃত্ব যদি জামায়াতের হাতে না আসে, তাহলে বাংলাদেশ থেকে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও রাহাজানি কখনো বন্ধ হবে না। দেশ ও মানুষের কল্যাণে প্রাক্তন সাথী-সদস্যদেরও সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসতে হবে।’
শাহজাহান চৌধুরী এমপি বলেন, ‘চট্টগ্রামকে ইসলামের রঙে রাঙাতে হলে প্রাক্তন সাথী-সদস্যদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। তাদের অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা ও সাংগঠনিক দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে সমাজে ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের কল্যাণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।’
ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ বলেন, ‘বাংলাদেশ একদিন ইনসাফ ও কল্যাণের রাষ্ট্রে পরিণত হবে, ইনশাআল্লাহ। আমরা সেই বাংলাদেশ দেখে যেতে চাই। এ লক্ষ্য অর্জনে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রাম করতে ছাত্রশিবির প্রস্তুত রয়েছে। ন্যায়বিচার, সাম্য ও জনকল্যাণভিত্তিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় তরুণ সমাজকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।’
সভাপতির বক্তব্যে চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের আমির মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘মুমিনের দৃষ্টান্ত একটি ভবনের মতো। একটি ভবন নির্মাণে যেমন ইট, বালু ও সিমেন্টের প্রয়োজন হয়, তেমনি একটি আদর্শিক সংগঠনকে শক্তিশালী করতে সবাইকে সংঘবদ্ধ জীবনযাপন করতে হবে। আমরা আর সাবেক থাকব না। বরং আনসার ও মুহাজিরদের মতো শপথবদ্ধ জীবনে প্রবেশ করব। যতক্ষণ নিঃশ্বাস থাকবে, ততক্ষণ ইসলামী আন্দোলনের পথে অবিচল থাকব এবং দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করে যাব।’
কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মুহাম্মদ নুরুল আমিন, সহকারী সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মাওলানা খাইরুল বাশার, মুহাম্মদ উল্লাহ, ফয়সল মুহাম্মদ ইউনুছ ও মোরশেদুল ইসলাম চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ মুহাম্মদ শামসুজ্জামান হেলালী ও শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি এস এম লুৎফর রহমান সম্মেলন পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








