
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগমন ঘিরে উৎসবমুখর রাজশাহী। তাকে বরণে নগরীর সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো সাজানো হয়েছে। ঐতিহাসিক মাদরাসা মাঠে জনসভার প্রস্তুতিও সম্পন্ন। সফর ঘিরে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। তবে এই সফরকে কেন্দ্র করে নগরবাসীর প্রত্যাশা শুধু জনসভা কিংবা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ, কৃষি ও শিল্পের বিকাশ, শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবার উন্নয়নসহ রাজশাহীর দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর সমাধানেও কার্যকর উদ্যোগ চান তারা।
আজ মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে রাজশাহী ধর্মসভা মন্দিরের দুর্গাপূজামণ্ডপ পরিদর্শন করবেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর বিকেল ৩টায় ঐতিহাসিক মাদরাসা মাঠে জনসভায় বক্তব্য দেয়ার কথা রয়েছে তার।
সফর উপলক্ষে নগরীর সৌন্দর্যবর্ধন, সড়ক সংস্কার ও পরিচ্ছন্নতার কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। পাশাপাশি সফরের নির্ধারিত স্থান ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
ভূমিমন্ত্রী মো: মিজানুর রহমান মিনু বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর এই সফর রাজশাহীর মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। জনসভাকে কেন্দ্র করে নেতা-কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ তৈরি হয়েছে।’
রাজশাহীর উন্নয়ন ও মানুষের প্রত্যাশার বিষয়গুলো প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে বলে তিনি আশা করেন।
রাজশাহী-৩ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল হক মিলন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে মানুষের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।’
রাজশাহীর উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও স্থানীয় সমস্যাগুলো সমাধানে এ সফর ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা করেন।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো: মাহফুজুর রহমান রিটন জানান, প্রধানমন্ত্রীর সফর সফল করতে সংশ্লিষ্ট দফতর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। নগরীর উন্নয়ন পরিকল্পনার মধ্যে বিমান চত্বর থেকে কাশিয়াডাঙ্গা পর্যন্ত চার লেনের সড়ক নির্মাণ এবং গুলগফুর পেট্রোল পাম্প থেকে বড়কুঠি ও বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর হয়ে ফায়ার ব্রিগেড মোড় পর্যন্ত সড়ক উন্নয়ন ও প্রশস্তকরণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডে খেলার মাঠ উন্নয়ন এবং প্রবীণ নাগরিকদের জন্য পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, হেতেমখাঁ-বর্ণালি সড়কের উন্নয়নকাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) চেয়ারম্যান মো: আবুল কালাম আজাদ সুইট বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে রাজশাহীতে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। এই সফরকে ঘিরে মানুষের মধ্যে উৎসাহ রয়েছে।’
রাজশাহীর উন্নয়ন সম্ভাবনা কাজে লাগানো এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সফরটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
রাজশাহী মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (সদর) গাজিউর রহমান জানান, প্রধানমন্ত্রীর সফরের নির্ধারিত স্থান ও সড়কগুলোতে নিরাপত্তা পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
রাজশাহীর উন্নয়ন নিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনায় রয়েছে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ, বরেন্দ্র অঞ্চলে সেচসুবিধা সম্প্রসারণ, কৃষিপণ্য সংরক্ষণে হিমাগার স্থাপন, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার সুযোগ বাড়ানোর বিষয়গুলো। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগের প্রত্যাশা করছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
তাদের মতে, রাজশাহীর সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে শুধু পরিকল্পনা ঘোষণা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন প্রকল্প বাস্তবায়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং উন্নয়ন কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা।
কৃষিনির্ভর এই অঞ্চলে উৎপাদিত আমসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি করা গেলে কৃষক ও উদ্যোক্তা—উভয়েই উপকৃত হতে পারেন। মৌসুমি পণ্যের বাজারজাতকরণে চাপ কমাতে আধুনিক হিমাগার, প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এবং কৃষিভিত্তিক বিনিয়োগ বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় কমানো, সেচসুবিধা নিশ্চিত করা এবং পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার পরিবেশ তৈরিও জরুরি।
বরেন্দ্র অঞ্চলে পানিসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা রাজশাহীর অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানো, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন এবং পদ্মা নদীর পানির কার্যকর ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের দাবি এ অঞ্চলের মানুষের অন্যতম প্রত্যাশা। প্রকল্পটির কারিগরি সম্ভাব্যতা, অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনায় অগ্রগতি হলে কৃষি, সেচ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি সুফলের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শিল্পায়নও রাজশাহীর বড় প্রত্যাশার জায়গা। উচ্চশিক্ষার সুযোগ থাকলেও শিক্ষিত তরুণদের জন্য স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি এখনো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিকাশ, রাজশাহী আইটি পার্কের কার্যকর ব্যবহার, কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপন এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর প্রত্যাশা রয়েছে। এ জন্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন ও সম্প্রসারণে সহায়ক পরিবেশ তৈরি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগের সমন্বয় প্রয়োজন।
শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রেও রাজশাহীর মানুষের প্রত্যাশা রয়েছে। রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম এগিয়ে নেয়া, বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার সুযোগ বাড়ানো এবং আধুনিক চিকিৎসাসুবিধা সম্প্রসারণের মাধ্যমে এ অঞ্চলের মানুষের ভোগান্তি কমানো সম্ভব হতে পারে। পাশাপাশি রাজশাহীকে শিক্ষা নগরী হিসেবে আরো কার্যকরভাবে গড়ে তুলতে শিক্ষার মানোন্নয়ন, গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি এবং শিক্ষিত তরুণদের কর্মজীবনে প্রবেশের সুযোগ সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ, যানজট নিরসন, জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ, পরিচ্ছন্নতা ও নাগরিক সেবার মানও সরাসরি জড়িত। সড়ক উন্নয়নের পাশাপাশি পরিকল্পিত নগরায়ণ, পর্যাপ্ত খেলার মাঠ ও বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলা এবং নাগরিক সুবিধা সম্প্রসারণের প্রয়োজন রয়েছে।
এসব উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে নগরীর বাসযোগ্যতা বাড়বে বলে প্রত্যাশা করছেন বাসিন্দারা।
জাতীয় নির্বাচনের আগে গত ২৯ জানুয়ারি ঐতিহাসিক মাদরাসা মাঠের জনসভায় রাজশাহী অঞ্চলের উন্নয়নে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ, বরেন্দ্র উন্নয়ন প্রকল্প পুনরুজ্জীবিত করা, কৃষিপণ্য সংরক্ষণে হিমাগার স্থাপন, কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলা এবং আইটি পার্ক সচল করার মতো বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছিলেন তারেক রহমান।
এসব পরিকল্পনার বাস্তবায়নে এখন পর্যন্ত কী অগ্রগতি হয়েছে, কোন উদ্যোগ কোন পর্যায়ে রয়েছে এবং রাজশাহীর দীর্ঘদিনের উন্নয়ন-প্রত্যাশা পূরণে নতুন কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে—প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরে সেসব বিষয়েও নগরবাসীর আগ্রহ রয়েছে।
রাজশাহীর উন্নয়ন নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা, অর্থ বরাদ্দ, প্রকল্প অনুমোদন এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রকল্পের ঘোষণা আর তার বাস্তবায়ন এক বিষয় নয়। তাই প্রধানমন্ত্রীর আজকের জনসভায় রাজশাহীর জন্য কী পরিকল্পনা তুলে ধরা হয় এবং পরবর্তী সময়ে সেগুলোর বাস্তবায়নে কী পদক্ষেপ নেয়া হয়, সেদিকেই নজর থাকবে নগরবাসীর।
প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে রাজশাহীতে যে উৎসাহ ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তার প্রতিফলন যেন উন্নয়নের বাস্তব অগ্রগতিতে দেখা যায়—এমনটাই চান স্থানীয় মানুষ।
তাদের প্রত্যাশা, এ সফর রাজশাহীর দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধান, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কৃষি, শিল্প, শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে কার্যকর উদ্যোগের পথ তৈরি করবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








