
সাত লাখ টাকা ঋণ করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন বাবা আব্দুল বাছির। স্বপ্ন ছিল, ছেলে উপার্জন করে পরিবারের অভাব ঘোচাবে, ঋণের বোঝা কমবে, সংসারে ফিরবে একটু স্বস্তি। কিন্তু সেই ছেলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর তাকে জানতে হলো গণমাধ্যমের সংবাদে।
এখন শোকের ভারে নুয়ে পড়া বাবা আব্দুল বাছিরের একটাই আকুতি— ছেলের লাশটা যেন দেশের মাটিতে ফিরে পান। আর যদি বিনা কারণে তার ছেলেকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়ে থাকে, তবে তিনি এর বিচার চান।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামের আব্দুল বাছিরের বড় ছেলে নজরুল ইসলাম। পরিবারের চার সন্তানের মধ্যে সবার বড়, পরিবারের হাল ধরার স্বপ্ন নিয়ে ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর পাড়ি জমিয়েছিলেন সৌদি আরবে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার মাত্র ছয় মাসের মাথায় কারাগারে যেতে হয় তাকে।
এরপর কেটে গেছে তিন বছর তিন মাস। পরিবার জানত, নজরুল কারাগারে আছে। কিন্তু কী অপরাধে তাকে আটক করা হয়েছিল, তা আজও জানতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর ছড়িয়ে পড়ে।
নজরুলের মৃত্যুর খবরে বিরামপুরের বাড়িটিতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজনদের কান্না আর প্রতিবেশীদের সান্ত্বনায় ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। ছেলেকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ মা-বাবা।
তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পরও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে পরিবারকে কিছু জানানো হয়নি। এমনকি নজরুল আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পেয়েছিল কি-না, কিংবা তাকে আইনি সহায়তা দিতে বাংলাদেশ দূতাবাস কী ভূমিকা রেখেছিল, সে বিষয়েও তারা কিছু জানেন না।
নজরুলের মা রহিমা বেগম জানান, কারাগারে থাকার সময়ও ছেলে প্রতি রোববার পরিবারের সাথে কথা বলত। সেই নিয়মিত যোগাযোগের মধ্যেই শেষবার কথা হয়েছিল তার সাথে। কিন্তু এরপর আর কোনো খবর নয়— গণমাধ্যমের সংবাদেই জানতে পারেন ছেলের মৃত্যুর কথা। যে ছেলের কণ্ঠ শুনে মা বুক বাঁধতেন, সেই ছেলে আর কোনোদিন ফোন আসবে না— এ সত্য যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না তিনি।
ছেলের মৃত্যুর খবরটি নজরুলের পরিবারের জন্য শুধু শোকের সংবাদ হয়েই আসেনি, কেড়ে নিয়েছে আরো একটি প্রাণ। খবরটি শোনার পর বুধবার রাতেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তার ফুফু আবেদা বেগম (৬৫)। ভাতিজার মৃত্যুর শোক সহ্য করতে না পেরে তার এই চলে যাওয়া পরিবারটির বেদনা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
আব্দুল বাছিরের কণ্ঠে এখন অসহায়ত্ব আর অনিশ্চয়তা। তিনি বলেন, ‘সাত লাখ টাকা ঋণ করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, পরিবারের হাল ধরবে। কিন্তু যাওয়ার ছয় মাস পর থেকেই সে জেলে। এর মধ্যে মাত্র দেড় লাখ টাকা পাঠাতে পেরেছিল। এখন ঋণদাতারাও টাকা পরিশোধের জন্য চাপ দিচ্ছেন। আমার ছেলের লাশটা দেশে ফিরিয়ে আনা হোক এটাই চাই। সে যদি বিনা কারণে মৃত্যুদণ্ড পেয়ে থাকে, তাহলে আমি এর বিচার চাই।’
নজরুল ও সৌদি আরবে একই ঘটনায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া সুইটি আক্তারকে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হলেও নজরুলের পরিবার তা নাকচ করেছে।
আব্দুল বাছির বলেন, ‘সুইটি আক্তারকে তারা চেনেন না। তার ছেলে কখন বিয়ে করেছে, সে বিষয়েও তাদের কিছু জানা নেই।’
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা একই জায়গায় কাজ করতেন বলে শুনেছেন। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তাদের স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ের তথ্য নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
নজরুলের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই স্বজন ও প্রতিবেশীরা তাদের বাড়িতে আসছেন, সমবেদনা জানাচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে নজরুলের আইনি অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছিল কি-না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একইসাথে বাংলাদেশ সরকারকে সৌদি কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে ঘটনার বিস্তারিত তথ্য উদ্ঘাটন এবং পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শাখার জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি গাজী নিয়াজুল করিম বলেন, নজরুল এমন কোনো অপরাধ করেছেন বলে তিনি মনে করেন না। তার দাবি, বাংলাদেশ দূতাবাসের ভূমিকা খতিয়ে দেখা এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা জরুরি।
তার অভিযোগ, এখন পর্যন্ত নজরুলের পরিবারের সাথে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর যোগাযোগের বিষয়টি স্পষ্ট নয়।
এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো: আবুসাঈদ জানান, নজরুলের লাশ দেশে ফিরিয়ে আনা বা এ বিষয়ে সহায়তার জন্য প্রশাসনের কাছে কোনো নির্দেশনা আসেনি। পরিবারের পক্ষ থেকেও আবেদন করা হয়নি। তবে লাশ দেশে এলে নিয়ম অনুযায়ী পরিবারকে সহায়তা করা হবে।
সব মিলিয়ে বিরামপুরের এই পরিবারটির সামনে এখন শোকের পাশাপাশি অনিশ্চয়তার দীর্ঘ পথ। একদিকে সাত লাখ টাকার ঋণ, অন্যদিকে প্রিয় সন্তানের মৃত্যুর যন্ত্রণা। তার ওপর ছেলের লাশ আদৌ দেশে ফিরবে কি-না, সেই নিশ্চয়তাও নেই।
যে বাবা একদিন ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর আশায়, সেই বাবাই আজ ছেলের শেষ চিহ্নটুকু ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায়। তার প্রশ্ন, ছেলেকে কেন মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলো, আর শেষবারের মতো ছেলের মুখ দেখার সুযোগটুকুও কি তিনি পাবেন না?
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








