সিলেট ও শ্রীমঙ্গলের কয়েকটি রিসোর্ট
সিলেট ও শ্রীমঙ্গলের কয়েকটি রিসোর্ট। ইন্টারনেট থেকে নেয়া

ফাইভ স্টার হোটেল ও রিসোর্ট নির্মাণের ক্ষেত্রে অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স ও পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র নেই মৌলভীবাজার ও সিলেটের অধিকাংশ রিসোর্টের।

Advertisement

শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার ও সিলেট মিলিয়ে হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের সংখ্যা হাজারের কাছাকাছি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

কক্সবাজারের উখিয়ায় টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জন নিহতের পর সিলেট ও মৌলভীবাজারের রিসোর্টগুলোর অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টি সামনে আসছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স ও পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র ছাড়া হোটেল ও রিসোর্ট নির্মাণ করা আইনত গুরুতর অপরাধ। তাই যেসকল রিসোর্ট ও হোটেলের অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স ও পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র নেই, সেগুলো সরকারকে বন্ধ করতে হবে।

স্থানীয় পর্যটন সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, পাহাড়ি এলাকায় রিসোর্ট নির্মাণের আগে জমির প্রকৃতি, পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব এবং সংশ্লিষ্ট দফতরের অনুমোদন যাচাই করা জরুরি। শুধু পর্যটন ব্যবসা সম্প্রসারণের দৃষ্টিতে এসব স্থাপনা গড়ে উঠলে প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। রিসোর্টের অনুমোদন ও পরিবেশগত প্রভাবের পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

কক্সবাজারের টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যুর খবরের পর দেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তা ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলার প্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

তথ্য বলছে, পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলসহ
বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে দুই শতাধিক রিসোর্ট।

পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পাহাড়, টিলা ও সবুজ প্রকৃতির পাশে নতুন নতুন অবকাশকেন্দ্র তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের কতটির প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে, পরিবেশগত ছাড়পত্র আছে কি-না এবং পর্যটকদের নিরাপত্তায় কী ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে রিসোর্টের বিস্তারের সাথে সাথে বাড়ছে বৈধতা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন।

তথ্য অনুযায়ী, মৌলভীবাজার জেলায় রিসোর্টের সংখ্যা দুই শতাধিকেরও বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রিসোর্ট রয়েছে শ্রীমঙ্গল উপজেলায়। এছাড়া মৌলভীবাজার সদর, কুলাউড়া, রাজনগর ও কমলগঞ্জ উপজেলায়ও অনেক রিসোর্ট রয়েছে।

তবে সেই রিসোর্টগুলোর কতগুলোর অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স ও পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র রয়েছে তার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মৌলভীবাজারের পাহাড় টিলায় গড়ে উঠা এসব রিসোর্টের অধিকাংশেরই নেই অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স ও পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র। এছাড়া সিলেট জেলার রিসোর্টেও একই অবস্থা। ফলে বড় ঝুঁকিতে রয়েছেন পর্যটকরা।

শ্রীমঙ্গল ট্যুরিজম সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এস কে দাস সুমনের হিসাবে, উপজেলায় প্রায় ১০৩টি রিসোর্ট রয়েছে। তার মতে, রিসোর্ট পরিচালনার ক্ষেত্রে স্থাপনার ধরণ, সুযোগ-সুবিধা ও প্রয়োজনীয় অনুমোদনের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেয়া জরুরি।

একই সংগঠনের সভাপতি ও গ্র্যান্ড সেলিম রিসোর্টের মালিক সেলিম আহমেদ জানান, মৌলভীবাজার জেলায় রিসোর্টের সংখ্যা প্রায় ২০০। এর মধ্যে শ্রীমঙ্গলে রয়েছে শতাধিক। কিন্তু নামের সাথে রিসোর্ট যুক্ত থাকলেই কোনো প্রতিষ্ঠানকে পূর্ণাঙ্গ রিসোর্ট বলা যায় না। তার মতে, কয়েকটি কক্ষ ভাড়া দেয়ার ব্যবস্থাকে রিসোর্ট হিসেবে প্রচার করার প্রবণতা রয়েছে।

রিসোর্টের সংখ্যা সম্পর্কে স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন হিসাব পাওয়া গেলেও কতটি প্রতিষ্ঠান সব ধরনের অনুমোদন নিয়ে চলছে, তার সমন্বিত তথ্য স্পষ্ট নয়। 

পরিবেশ অধিদফতরের কর্মকর্তারা কিছু প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্র দেয়ার কথা জানিয়েছেন। তবে ছাড়পত্র পাওয়া প্রতিষ্ঠানের বাইরে থাকা রিসোর্টগুলোর অনুমোদনের অবস্থা কী, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি।

মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক মো: মঈদুল ইসলাম জানান, তাদের দফতর থেকে প্রায় ৬০টি রিসোর্টকে ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। ২০টি বা তার বেশি কক্ষ রয়েছে, এমন রিসোর্টের ক্ষেত্রে ছাড়পত্র দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়।

অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো কোন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে, সে বিষয়ে তার কাছে নির্দিষ্ট তথ্য নেই।

সিলেট বিভাগীয় পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক মো: আবুল কালাম আজাদ বলেন, অন্তত ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগের হোটেল ও রিসোর্টের ক্ষেত্রে পরিবেশগত ছাড়পত্র দেয়া হয়। এর চেয়ে কম বিনিয়োগের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে তাদের দফতর ছাড়পত্র দেয় না। ছাড়পত্র পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয় বলেও জানান তিনি।

তিনি বলেন, তবে পরিবেশগত ছাড়পত্রের পাশাপাশি জমির ব্যবহার, ভবন নির্মাণ, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি ও অগ্নিনিরাপত্তাসহ অন্যান্য শর্ত পূরণ করা হয়েছে কি-না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। একটি প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত ছাড়পত্র থাকলেই সব ধরনের অনুমোদন নিশ্চিত হয়েছে, এমনটি ধরে নেয়ার সুযোগ নেই।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো: জিয়াউর রহমান বলেন, কোথায় কারা রিসোর্ট নির্মাণ করছে এবং সেগুলো কী ধরনের অনুমতি নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ বিষয়ে একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। রিসোর্ট স্থাপন ও পরিচালনার জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা বা নির্দেশিকা প্রয়োজন। 

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের জাতীয় পরিষদের সদস্য এ এস এম সালেহ সোহেল বলেন, পাহাড় ও বন কেটে রিসোর্ট তৈরির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এ ধরনের নির্মাণকাজ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নজরদারি নেই। কোথায় ও কী শর্তে রিসোর্ট নির্মাণ করা যাবে, তা নির্ধারণে সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা দরকার।

সিলেট হোটেল অ্যান্ড গেস্ট হাউস ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি সুমত নূরী জুয়েল বলেন, সিলেট জেলায় হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট মিলিয়ে ৫৫০টির বেশি প্রতিষ্ঠান রয়েছে বলে জেলা প্রশাসনের তথ্য থেকে জানা যায়। 
তবে সব প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন রয়েছে কি-না, সে বিষয়ে নিশ্চিত নই। আমার সংগঠনের সদস্য ২২-২৫টি প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। 

পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নির্দিষ্ট মানদণ্ড ও নীতিমালা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।