গোপালগঞ্জ ডেন্টাল কলেজ হাসপাতাল, প্রকল্প ব্যয়
নির্মাণাধীন গোপালগঞ্জ ডেন্টাল কলেজ হাসপাতাল। নয়া দিগন্ত

গোপালগঞ্জে ঠিকাদারের গাফিলতি, গণপূর্ত ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তাদের উদাসীনতায় দফায় দফায় মেয়াদ বাড়িয়েও গোপালগঞ্জ ডেন্টাল কলেজ হাসপাতালটি ৩০ মাসের কাজ ১২ বছরেও শেষ করতে পারেনি স্বাস্থ্য অধিদফতর। এদিকে অবকাঠামোর নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় অনুমোদন পেয়েও ডেন্টাল কলেজের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছে না। তাছাড়া নির্মাণ কাজে ধীরগতির কারণে দাঁতের সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয়রা। দ্রুত হাসপাতালটি নির্মাণ করার দাবি জানান তারা।

Advertisement

দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিশাল জনগোষ্ঠীর দাঁতের চিকিৎসার জন্য কোনো বিশেষায়িত সরকারি ডেন্টাল কলেজ হাসপাতাল নেই। এজন্য এই এলাকার জনগণের দাঁতের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণে ২০১৪ সালে গোপালগঞ্জে একটি পূর্ণাঙ্গ ডেন্টাল কলেজ হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্প নেয় সরকার। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গোপালগঞ্জ ডেন্টাল কলেজটি সাড়ে সাত একর জায়গার ওপর ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার ঘোনাপাড়া মোড়ে অবস্থিত। ডেন্টাল কলেজটির কাজ আড়াই বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও দফায় দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ১২ বছরেও কাজ শেষ করতে পারেনি স্বাস্থ্য অধিদফতর।

৮৮ কোটি ৬৯ লাখ ৯৮ হাজার টাকা ব্যয়ে গোপালগঞ্জ ডেন্টাল কলেজ হাসপাতাল স্থাপনের প্রকল্পটি ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে একনেকে অনুমোদন দেয়া হয়। বাস্তবায়ন মেয়াদ ধরা হয় ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত। নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ায় মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০১৮ সাল পর্যন্ত। এরপর ২০২০ সালের ডিসেম্বর, ২০২১ সালের ডিসেম্বর, ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়। কিন্তু তাতেও প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। এ অবস্থায় প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনীতে নতুন করে দেড় বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়। অবশিষ্ট কার্যক্রম শেষ করতে মেয়াদ ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এখন পুনরায় ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানোর জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। 

দফায় দফায় মেয়াদ বাড়ানোয় প্রকল্পটির ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশ। প্রথমে গণপূর্ত অধিদফতরের রেট শিডিউল পরিবর্তন ও বিভিন্ন খাতের খরচ বেড়েছে এমন কারণ দেখিয়ে ২০১৮ সালে প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় ১১২ কোটি ৮১ লাখ ৮২ হাজার টাকা। দ্বিতীয় সংশোধনীতে রাজস্ব খাতের বিভিন্ন আইটেমের দাম বেড়ে যাওয়া, ক্রয় পরামর্শকের নতুন কোড অন্তর্ভুক্তি এবং ফার্নিচার ও বিভিন্ন যন্ত্রের দাম বেশি দেখিয়ে প্রকল্পের নতুন ব্যয় ধরা হয় ১৩৯ কোটি ৬৮ লাখ ৭৯ হাজার টাকা। অর্থাৎ নির্ধারিত মেয়াদে কাজ করতে না পারায় খরচ বাড়ছে ৫১ কোটি টাকা।

গোপালগঞ্জ ডেন্টাল কলেজ হাসপাতালটির ১৪টি ভবনের মধ্যে ৮তলা ফাউন্ডেশনসহ ৪তলা ডেন্টাল কলেজ হাসপাতাল বা অ্যাকাডেমিক ভবন, অধ্যক্ষের বাস ভবন, স্টুডেন্ট হোস্টেল (পুরুষ) একটিতে ১০০ জন, স্টুডেন্ট হোস্টেল (নারী) একটিতে ১০০ জন, ইন্টার্নি ডক্টরস ডরমেটরি (পুরুষ) একটিতে ২৪ জন, ইন্টার্নি ডক্টরস ডরমেটরি (নারী) একটিতে ২৪ জন, শিক্ষক ডরমেটরি (প্রফেসর/এসোসিয়েট প্রফেসর) ১০ জন, শিক্ষক ডরমেটরি (এসিসটেন্ট প্রফেসর/ লেকচারার) ২০ জন, তৃতীয় শ্রেণির বাসভবনে ছয়জন, চতুর্থ শ্রেণির বাসভবনে আটজন, নার্সদের ডরমেটরি একটিতে আটজন। এছাড়া সাবস্টেশন, পাম্প, গেরেজ ও জেনারেটর রুম রয়েছে।

এ কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হলে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সাথে সামঞ্জস্য রেখে আনুপাতিক হারে অধিক সংখ্যক দাঁতের ডাক্তার তৈরি হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া দন্ত চিকিৎসার ক্ষেত্রে রাজধানী শহরের ওপর চাপ হ্রাস পাবে, এই চিকিৎসার ক্রমবর্ধমান শিক্ষার চাহিদা পূরণ হবে এবং চিকিৎসা ও অন্য পেশার লোকদের চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হবে।

গোপালগঞ্জ ডেন্টাল কলেজটির ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জিকেবিপিএল অ্যান্ড ডিসিএলের (জেভি) সিনিয়র প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার মো: সোহেল রানা বলেন, ‘আমাদের কাজ শেষ পর্যায়ে। আমাদের ফাইল এখন প্লানিং কমিশনে আছে। টাইম এক্সটেনশন হয়ে গেলে আশা করি এ অর্থবছরের  মধ্যে কাজ শেষ করতে পারব।’

গোপালগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর কুমার মণ্ডল বলেন, ‘প্রকল্পের কাজ ৯০ ভাগেরও বেশি সম্পন্ন হয়েছে। নতুন করে সময় বৃদ্দির জন্য আবেদন করা হয়েছে। সময় বৃদ্ধি পেলে ও পর্যাপ্ত ফান্ড পেলে আশা করি দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে পারব।’

প্রকল্প পরিচালক ডা: মো: শাহরিন তরফদার বলেন, ‘প্রকল্পের অবশিষ্ট কার্যক্রম শেষ করতে মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।’ 

কলেজের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম শুরু না হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ডেন্টাল কলেজের অ্যাকাডেমিক অনুমোদন পাওয়া গেছে। তবে অবকাঠামো নির্মাণ এবং যন্ত্রপাতি না বসানো পর্যন্ত অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছে না। অবকাঠামো না থাকলে ছাত্রছাত্রী ভর্তি করে তো লাভ হবে না।’