রেলওয়ে
রেলওয়ে। নয়া দিগন্ত

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে স্বপ্নের চট্টগ্রাম–কক্সবাজার রেলপথ চালুর পর দেশের পর্যটন ও যোগাযোগে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। প্রতিদিন হাজারো যাত্রী এই পথে যাতায়াত করছেন। তবে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথে রেলওয়ে পুলিশের কোনো থানা, ফাঁড়ি বা স্থায়ী নিরাপত্তা ইউনিট না থাকায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের লাশ উদ্ধারের পর আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতেও স্বজনদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

Advertisement

গত ৯ জুন বিকেল ৫টার দিকে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া-সাতকানিয়া সীমান্তে বারদোনা শরীফ পাড়া এলাকায় ট্রেনের ধাক্কায় নিহত হন স্কুলছাত্র শহিদুল ইসলাম টিপু (১৭)। শহিদুলের বাড়ি কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার হারবাং ইউনিয়নে। সে বারদোনায় নানার বাড়িতে বেড়াতে এসে ট্রেন দুর্ঘটনায় মারা যায়। লাশ দাফনের আগে আইনী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। তাই রেলওয়ে পুলিশের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন স্বজনরা।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর কক্সবাজার থেকে রেলওয়ে পুলিশ আসে রাত ১১টায়। এরপর প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে রাত ২টার দিকে শহিদুলের লাশ নানার বাড়ির কবরস্থানেই দাফন করা হয়।

গত ২৯ আগস্ট ট্রেনের ধাক্কায় এক প্রতিবন্ধী যুবক নিহত হয়। লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের খৈয়ারকুল এলাকায় চট্টগ্রাম—কক্সবাজার রেলপথে এ ঘটনা ঘটে।

নিহত যুবকের নাম শাহাব উদ্দিন (৪৩)। তিনি পশ্চিম আমিরাবাদ খৈয়ারকুল এলাকার আব্দুস সোবহানের ছেলে। তিনি শ্রবণ প্রতিবন্ধী এবং এক মেয়ে সন্তানের জনক।

স্থানীয়রা জানায়, দুপুরের খাবার খেয়ে শাহাব উদ্দিন বাড়ির পাশে রেলপথের দিকে হাঁটতে যান। বিকেল ৩টার দিকে তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় রেলপথে পড়ে থাকতে দেখেন কয়েকজন। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

সেদিন দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৩টার মধ্যে পর্যটক এক্সপ্রেস ও কক্সবাজার এক্সপ্রেস নামে দু’টি ট্রেন লোহাগাড়া অতিক্রম করে। এই দু’টি ট্রেনের কোনো একটির ধাক্কায় তিনি নিহত হয়ে থাকতে পারেন এমন ধারণা লোহাগাড়া রেলস্টেশনের কর্মকর্তার।

স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি ও রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, নিরাপত্তা ব্যবস্থার এই ঘাটতির কারণে চুরি, নাশকতা, রেললাইনের বিভিন্ন সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি যেমন রয়েছে, তেমনি জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে না। এতে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির সংখ্যা বাড়ছে।

লোহাগাড়া স্টেশন মাস্টার মো: এনামুল হক চৌধুরী বলেন, ‘চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত নতুন রেলপথটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। কিন্তু এই পথে রেলওয়ে পুলিশের নিজস্ব কোনো থানা বা ফাঁড়ি না থাকায় পুরো পথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো দুর্ঘটনা, নাশকতা, চুরি কিংবা যাত্রীদের সাথে অপরাধমূলক ঘটনা ঘটলে দ্রুত তা সমাধান করা যায় না।’

রেললাইনের বিভিন্ন অংশ দুর্গম এলাকা, পাহাড়ি অঞ্চল ও বনাঞ্চল অতিক্রম করেছে। এসব স্থানে কোনো নিরাপত্তা সদস্যের নিয়মিত টহল নেই বললেই চলে। ফলে রেললাইনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশসহ অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী চুরি হয়। এ ছাড়া রেললাইনে গবাদিপশু উঠে যায়। কারো মালামাল, চুরি, ছিনতাই বা হারিয়ে গেলে আইনি প্রতিকারের জন্য দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানায় যেতে হয়।’

চট্টগ্রাম রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মাঝখানে ১১টি রেলস্টেশন বর্তমানে সচল আছে। প্রতিদিন চলাচল করে চারটি ট্রেন। চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানার অধীনে ষোলশহর রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়ি ও কক্সবাজারে স্থাপিত রেলওয়ে পুলিশের একটি ক্যাম্প পুরো রেলপথটি দেখাশুনা করে। 
রেলপথের নিরাপত্তায় দুইটি থানা ও চয়টি ফাঁড়ি চালু করার জন্য ২২০ জন রেলওয়ে পুলিশের চাহিদা আছে। তবে তার বিপরীতে এখনো কোনো জনবল নিয়োগ হয়নি।

লোহাগাড়া রেলওয়ে স্টেশনটি আধুনগর ইউনিয়নে অবস্থিত। ওই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘নতুন রেলপথে ভ্রমণ আরামদায়ক হলেও নিরাপত্তা নিয়ে অনেকে শঙ্কায় থাকেন। বিশেষ করে রাতের ট্রেনে যাতায়াতের সময় কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে রেলওয়ে পুলিশের তাৎক্ষণিক উপস্থিতি পাওয়া যায় না। পুলিশ না থাকায় রেললাইনে চুরি, ছিনতাই, মাদকের কারবার ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ট্রেনে কাটা পড়া লাশ নিয়ে অনেক সময় স্বজনদের ছয় থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দ্রুত হাসপাতালে নেয়া যায় না।’

আমিরাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হোসাইন মো: সরপু বলেন, ‘রেল স্টেশন ও রেললাইনের অনেক মূল্যবান যন্ত্রাংশ চুরি হয়। বাচ্চারা রেললাইন উঠে পাথর কৃষিজমিতে ছুড়ে মারে। এতে রেল লাইন থেকে পাথর সরে যাচ্ছে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে। জনপ্রতিনিধি হিসেবে সচেতনতার উদ্দেশ্যে আমি রেললাইনে একটি লোহার সাইনবোর্ড দিয়েছিলাম। তিনদিন পর সেটিও চুরি হয়ে যায়। রেলপথ দেখতে আসা দর্শনার্থী ও যাত্রীদের অনেক সময় বখাটেরা উত্যক্ত করে। শুষ্ক মৌসুমে রেলপথের পাশের সড়ক দিয়ে অবৈধ মাটি পরিবহন হয়। রেলওয়ে পুলিশের উপস্থিতি থাকলে এসব অপরাধ অনেকাংশে কমে যেত। রেললাইন ঘেঁষে অনেক এলাকায় অবাধে মানুষ চলাচল করে। এসব এলাকায় সচেতনতা কার্যক্রম ও নিয়মিত টহল থাকলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো যেত।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রেলওয়ে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার তহুরা জান্নাত বলেন, ‘চট্টগ্রাম—কক্সবাজার রেলপথের নিরাপত্তা জোরদারের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে। আমরা দুইটি থানা ও চয়টি ফাঁড়ি স্থাপনের জন্য ২২০ জন জনবল চেয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছি অনেক আগে। তবে কবে নাগাদ নতুন থানা বা ফাঁড়ি স্থাপন হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। অন্তত চাহিদার অর্ধেক জনবলও যদি নিয়োগ দেয়া হয়, তাহলে আপাতত অস্থায়ী ক্যাম্প চালু করে হলেও নিরাপত্তা অনেকটা নিশ্চিত করা যাবে।’