বৃত্তি পরীক্ষা
গাজীপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস। নয়া দিগন্ত

গাজীপুরে বেসরকারি প্রাথমিক বিদালয়ের (এমপিওভুক্ত ও কিন্ডারগার্টেন) নিবন্ধন জটিলতা নিরসন না হলে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধসহ কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ভুক্তভোগী সকল অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃপক্ষ। 

Advertisement

তাদের অভিযোগ, প্রশাসনিক জটিলতায় নিবন্ধন ও পাঠদানের অনুমতি আটকে থাকায় ২০২৬ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছে শিক্ষার্থীরা। ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রমেও।

বিভিন্ন অজুহাত ও শর্তের বেড়াজালে টঙ্গীর সফিউদ্দিন সরকার অ্যাকাডেমি অ্যান্ড কলেজসহ সকল মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক শাখার নিবন্ধন ও পাঠদানের অনুমতি আটকে দিয়েছে গাজীপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস। 

প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে এসব প্রতিষ্ঠান সুনামের সাথে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণের সুযোগ ও প্রশাসনিক সমন্বয় নিশ্চিত না করে নিবন্ধন আটকে রাখায় এর মাশুল গুনতে হচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের।

প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সফিউদ্দিন সরকার অ্যাকাডেমি অ্যান্ড কলেজের প্রাথমিক শাখা থেকে ২০২৫ সালের বেসরকারি পর্যায়ের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় ৯১ জন শিক্ষার্থী বৃত্তি পেয়েছিল। অথচ পুরো টঙ্গী থানার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মিলিয়ে বৃত্তি পেয়েছিল ১১১ জন। এমন সাফল্যের নজির থাকা প্রতিষ্ঠানটির প্রাথমিক শাখার নিবন্ধন না হওয়ায় চলতি বছরের পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে প্রতিকার চেয়ে গত ১২ অক্টোবর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক বরাবর যৌথ আবেদন করেছেন টঙ্গীর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের নয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানেরা। আবেদনে বৃত্তি পরীক্ষার্থীদের ডিআর (ডেসক্রিপটিভ রোল) অনুমোদন এবং পাঠদানের অনুমতির জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেয়ার সময় বাড়ানোর দাবি জানানো হয়। 

তাদের দাবি, গত ৫ অক্টোবর টঙ্গী থানা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নিবন্ধন ও পাঠদানের অনুমতি না থাকার কারণ দেখিয়ে তাদের জমা দেয়া ডিআর আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন।

‘আইনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই’

নিবন্ধন জটিলতার বিষয়ে গাজীপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তসলিম হোসেন বলেন, আলোচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এক বছর সময় দেওয়া হয়েছিল। কয়েক দফা সময় বাড়ানোর পরও তারা আইন অনুযায়ী সব শর্ত পূরণ করে নিবন্ধন নিতে পারেনি। সফিউদ্দিন সরকার একাডেমি অ্যান্ড কলেজের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তারা তো এখনো কমিটিই করতে পারেনি।’

একই প্রতিষ্ঠানে পৃথক ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন নিয়ে দ্বৈততা তৈরির আশঙ্কা নাকচ করে তিনি বলেন, এ ধরনের কোনো দ্বৈততা নেই। নীতিমালায় যেসব শর্ত রয়েছে, সেগুলো পূরণ করেই নিবন্ধন নিতে হবে। তাঁরা আইনের বাইরে যেতে পারবেন না।

নিবন্ধন আটকে থাকার পেছনে উচ্চ আদালতের রিটের প্রসঙ্গ তুলে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, ‘আপনাদের একজন সাংবাদিক রিট করেছেন, তার কাছ থেকে বিস্তারিত জানতে পারবেন।’

তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানপ্রধানদের দাবি, ওই রিটের কারণে তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর নিবন্ধন আটকে রাখার যৌক্তিকতা নেই। আদালতের আদেশের পরিধি যাচাই করে কোন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য, তা নির্ধারণ করা উচিত বলে মনে করেন তাঁরা।

দুই মন্ত্রণালয়ের বিধিমালা নিয়ে প্রশ্ন

প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের অভিযোগ, একই প্রতিষ্ঠানে পৃথক দুটি ব্যবস্থাপনা কমিটি থাকতে পারে না। অথচ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুসরণ করলে প্রাথমিক স্তরের জন্য আলাদা কমিটি করতে হয়। আবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালায় অভিন্ন কমিটির কথা বলা হয়েছে।

তারা বলেন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০২৩ সালের নিবন্ধন বিধিমালায় সংযুক্ত প্রাথমিক বিদালয়ের জন্য পৃথক ব্যবস্থাপনা কমিটির বিধান রয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০২৪ সালের প্রজ্ঞাপনে উচ্চমাধ্যমিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অনুমোদিত প্রাথমিক স্তর সংযুক্ত থাকলে প্রাথমিক শিক্ষকদের মধ্য থেকে একজন সাধারণ শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচনের বিধান রাখা হয়েছে। তাঁদের মতে, দুটি বিধানের সমন্বিত প্রয়োগ সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় নিবন্ধনপ্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হচ্ছে।

এ ছাড়া ফায়ার সার্ভিস ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের পৃথক ছাড়পত্র বা সনদ চাওয়ার বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছেন তারা। তাদের দাবি, এ দুটি শর্ত নীতিমালায় নেই। এসব শর্ত ও কাগজপত্রের জটিলতা দ্রুত নিরসন করে নিবন্ধনের জন্য যৌক্তিক সময় দিতে হবে।

প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের আশঙ্কা, সময়মতো নিবন্ধন ও ডিআর অনুমোদন না হলে যোগ্য শিক্ষার্থীদের একটি অংশ বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ হারাতে পারে। এতে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে।

সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, দ্রুত সমস্যার সমাধান না হলে তারা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবেন। প্রয়োজনে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধসহ কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হতে পারে। 

তাদের দাবি, প্রশাসনিক ও আইনগত জটিলতার দায় কোনোভাবেই শিক্ষার্থীদের ওপর চাপানো যাবে না। বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংযুক্ত প্রাথমিক শাখাগুলোর নিবন্ধন জটিলতা নিরসনে জরুরি উদ্যোগ নিতে হবে।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে শিক্ষার্থীদের বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর নিবন্ধনপ্রক্রিয়ার পরবর্তী অগ্রগতি।