
দেশের উত্তরাঞ্চলের শস্য ভাণ্ডার নামে খ্যাত নওগাঁয় এবার আউশ ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। কিন্তু বাজারে ধানের দাম কম। উৎপাদন খরচই উঠছে না। দাম কম হলেও একরকম নিরুপায় হয়ে লোকসান দিয়ে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে কৃষকদের। একদিকে বীজ, সার, সেচ, কীটনাশক, ডিজেল ও শ্রমিকের বাড়তি দাম অপরদিকে বাজারে ধানের দাম না পেয়ে কৃষকেরা বিপাকে পড়েছেন।
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে নওগাঁয় ৫৬ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে আউশ ধান উৎপাদন হয়েছে ও চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ ধরা হয়েছে এক লাখ ৮৬ হাজার ৪৭৯ মেট্রিক টন। জেলা বিভিন্ন হাটবাজার ঘুরে ও খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, বাম্পার ফলনের কারণে বাজারে ধানের সরবরাহ বেশ বেড়েছে। বাজারে জিরাশাইল, কাটারি, ব্রি-২৮ জাতের ধান কয়েক সপ্তাহ আগে মণপ্রতি ৮৫০ থেকে ৯৫০ টাকা দামে বিক্রি হলেও এখন তা বিভিন্ন হাটে ৭৫০ থেকে ৮৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
গত বছরের তুলনায় জাতভেদে মণপ্রতি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত কমেছে বলে দাবি কৃষকদের। প্রতি বিঘা জমিতে উৎপাদন খরচ ১৬ থেকে ১৭ হাজার টাকা এবং উৎপাদন হয় ১৪ থেকে ১৫ মণ ধান। বাজারে দাম কম হওয়ায় উৎপাদন বাড়লেও লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষকদের।
বাজারে ধানের সরবরাহ বাড়লে দাম কমে যায়। উৎপাদনের পুরো ঝুঁকি কৃষককেই নিতে হয়। কৃষকদের বক্তব্য, বাজারে তারা কম দামে ধান বিক্রি করলেও ভোক্তা পর্যায়ে চালের দাম সেই অনুপাতে কমে না। ফলে ধান উৎপাদনকারী কৃষক ও চাল ক্রয়কারী সাধারণ ভোক্তা উভয়পক্ষই বাজারব্যবস্থার অসঙ্গতিতে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন।
এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে ধান উৎপাদন থেকে শুরু করে ক্রয়মূল্য, মিল পর্যায়ের ধান থেকে চাল ব্যয়, পরিবহণ ব্যয়, পাইকারী বিক্রয়মূল্য, খুচরা মূল্য পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতার দাবি করেছেন কৃষকরা।
নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার চকগৌড়িহাটে ধান বিক্রয় করতে আসা শিবরামপুর গ্রামের কৃষক আব্দুর রহমান বলেন, ‘প্রতি বিঘা জমিতে ধান উৎপাদন করতে ১৬ থেকে ১৭ হাজার টাকা খরচ হয়। উৎপাদন হয় সর্ব্বোচ বিঘাপ্রতি ১৬ মণ। ধান নিয়ে এসেছিলাম, ৭৫০ মণে বিক্রি করলাম। উৎপাদন খরচই উঠবে না। এমনিতেই লোকসান হবে এরপর যদি জমির বর্গা, পরিবহণ ব্যয় ও অন্য খরচ যুক্ত করা হয় লোকসান আরো বাড়বে।’
নওগাঁ সদর উপজেলার মাতা সাগর হাটে ধান বিক্রি করতে আসা কৃষক মতিউর রহমান অভিযোগ করে বলেন, ‘ধানের বাজারে যদি সরবরাহ বেশি থাকে ও মিলাররা কম দামে কেনেন, তাহলে উৎপাদনকারী কৃষকের লোকসান কমানো দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘শুধু বাজার তদারকি করে ধানের দরপতন ঠেকানো সম্ভব নয়। মৌসুমের শুরুতেই প্রকৃত কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার পরিমাণ বাড়াতে হবে। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে যাচাই করে প্রকৃত কৃষকের কাছ সরাসরি ধান কেনা হলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম কমে যাবে ও কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবে।’
একই সাথে উৎপাদন খরচ বিবোচনায় ধানের যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ, সহজ শর্তে কৃষি লোন, কৃষি উপকরণে সহায়তা এবং ধান সংরক্ষণের জন্য পযাপ্ত গুদাম সুবিধার নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
নওগাঁর চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, ‘চালের বাজারের চাহিদা, মজুদ, পরিবহণ ব্যয় এবং ধানের ক্রয়মূল্যের উপর ভিত্তি করেই মিল পর্যায়ে ধান কেনা হয়। বাজারে চাল বিক্রির গতি ধীর হলে মিল মালিকদের নতুন ধান ক্রয়ের সক্ষমতা ও আগ্রহ কমে যায়। চালকল শিল্পের সঙ্কটের সাথে কৃষকের অবস্থাও সরাসরি সম্পর্কিত।’
তিনি আরো বলেন, ‘মিলারদের বিরুদ্ধে অনিয়মের যেসব ঢালাও অভিযোগ তোলা হয়, সকল ক্ষেত্রে তার সত্যতা থাকে না।’
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








