হাসপাতাল
হাসপাতালের চিত্র। নয়া দিগন্ত

ঠিক এক মাস আগে ঢাকঢোল পিটিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার শাখাওয়াত হোসেন বকুল সিলেটের সরকারি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শনে আসেন। সেদিন সাত দিনের মধ্যে গুরুতর সমস্যাগুলো সমাধানের আশ্বাস দেন তিনি। কিন্তু মাস পেরিয়ে গেলেও কোনো কিছুই বদলায়নি ওসমানী হাসপাতালে। তার সফরের পর দিন থেকেই আগের অবস্থায় ফিরে গেছে সবকিছু।

Advertisement

আজ রোববার (৪ অক্টোবর) মন্ত্রীর হাসপাতাল পরিদর্শনের এক মাস পূর্ণ হলো।

শুধু তার সফরের তিন দিনের মাথায় হাসপাতালের পরিচালক বদলি হয়ে নতুন পরিচালক দায়িত্ব নিয়েছেন। 

আগের মতোই সবকিছু 
টয়লেট আর নর্দমার গন্ধে অতিষ্ঠ সিলেট ওসমানী হাসপাতালে আগত রোগী ও দর্শনার্থীরা। জরুরি বিভাগ দিয়ে প্রবেশ করে মূল ভবনে ঢোকার সংযোগ স্থলে দুর্গন্ধে নাকে হাত দিয়ে প্রবেশ করেন আগত রোগী ও দর্শনার্থীরা। বছরের পর পর এ অবস্থা চলতে থাকলেও দেখার যেন কেউ নেই। হাসপাতাল ভবনের পাশে খোলা ড্রেনে মানুষের মলমূত্র ভাসছে। এতে হাসপাতালে সেবা নিতে এসে উল্টো অসুস্থ হচ্ছেন রোগী ও স্বজনরা। 

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জরুরি বিভাগ দিয়ে হাসপাতালের প্রবেশমুখে তীব্র দুর্গন্ধ। কেউ মাস্ক অথবা হাত দিয়ে নাক ঢেকে হাসপাতালে প্রবেশ করছেন। হাসপাতালে প্রবেশের পরের চিত্র আরো ভয়ঙ্কর। প্রতিটি ওয়ার্ডে টয়লেট ব্যবহারের অনুপযোগী। টয়লেটের উপরে ভাসছে মলমূত্র। ময়লা আবর্জনাও ফেলছেন সেখানে রোগীর স্বজনরা। নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না টয়লেট।  

যদিও গেল মাসের শুরুতে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শনে এসে সাত দিনের মধ্যে হাসপাতালের সব সমস্যা সমাধানের কথা জানিয়েছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন। তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সফরের একমাস পেরোতে চললেও হাসপাতালের চিত্র বদলায়নি। 

শনিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জরুরি বিভাগ দিয়ে ঢোকার পর নিচতলার বিভিন্ন স্থানে প্লাস্টিক-পলিথিন ও পানের পিক পড়ে থাকতে দেখা যায়। সিঁড়ির বিভিন্ন কোনেও জমে আছে ময়লা-আবর্জনা ও পানের পিক। হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার হৃদরোগ ওর্য়াডে রোগীদের ভিড় দেখা গেছে। 

এ ওয়ার্ডের বারান্দা ও মেঝেতেও বেড পেতে রোগীদের রাখা হয়েছে। টয়লেটে দুর্গন্ধ। মেঝেতে জমে থাকা পানির সাথে জুতার ধুলোবালি মিশে পিচ্ছিল হয়ে তৈরি হয়েছে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। বাথরুমের পাশেই বেডে এবং মেঝেতেও রোগী ও স্বজনরা অবস্থান করছেন। দুর্গন্ধের কারণে তারা নাকমুখ চেপে থাকছেন। 

১১ নম্বর ওর্য়াডের পুরুষ সার্জারি বিভাগে রোগীর চাপ অন্য ওর্য়াডের চেয়ে কম, তবে ওর্য়াডের মেঝে ও বাথরুমে ময়লা-আবর্জনা রয়েছে। বাথরুম থেকে দুর্গন্ধ ছাড়াচ্ছে। ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের গাইনি বিভাগেও একই চিত্র দেখা গেছে। দ্বিতীয় তলার লেবার ওটির বারান্দা ও আশপাশেও পড়ে আছে ময়লা-আবর্জনা। একই ভবনে থাকা চিকিৎসকদের ক্যান্টিনের চারপাশের মেঝেতেও ময়লা, পানের পিক ও প্লাস্টিকের কাপ পড়ে থাকতে দেখা গেছে।

হাসপাতালের নতুন ভবনের বহির্বিভাগের নিচতলায়ও মলমূত্রের তীব্র গন্ধ। ভবনে নাক ঢেকে হাসপাতালে প্রবেশ করতে দেখা যায় সেবা নিতে আসা রোগীদের। নতুন এই ভবনের পরিবেশ চরম অস্বাস্থ্যকর। ভবনটির তৃতীয় তলায় চর্ম-যৌন ও মানসিক বিভাগ সংলগ্ন টিনের ছাউনিতে জমে আছে ময়লার বিশাল স্তূপ। 

অন্যদিকে, একই ভবনের পুরুষ মেডিসিন বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, বাথরুমগুলোর স্যাঁতসেঁতে ও জরাজীর্ণ অবস্থা। চারপাশ ময়লা-আবর্জনায় ভরে থাকার পাশাপাশি বাথরুমের ভেতর থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে, যা চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও খাবারের মান এবং পরিবেশন পদ্ধতি নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা। 

হৃদরোগ ওয়ার্ডে এক রোগীর স্বজন বকুল মিয়া বলেন, ‘বাথরুমের গন্ধের কারণে হাসপাতালে টেকাই যাচ্ছে না।’ 

মেডিসিন বিভাগের রোগী আবুল মিয়া বলেন, ‘এখানকার পরিবেশ এতোই অস্বাস্থ্যকর, কিন্তু কোনো কর্তৃপক্ষ আছে বলে মনে হয় না। নিয়মিত পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হয় না।’ 

চিত্র না বদলালেও হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন ও প্রশিক্ষণ) ডা: আবুল কালাম আজাদ দাবি করেন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। ডাক্তারাও ঠিক সময়ে হাসপাতালে আসেন। সকাল ৭টা থেকে ৮টা পর্যন্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চলে, তারপর ডাক্তারা ওর্যাডে যান। 
তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্যমন্ত্রী নির্দেশের পর হাসপাতালের জলবল ও যন্ত্রপাতির চাহিদা পাঠানো হয়েছে মন্ত্রণালয়ে। এছাড়াও নতুন ক্যানসার বিল্ডিং চালু করার জলবল চাহিদা পাঠানো হয়েছে।’

তবে হাসপাতালের এই অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের পেছনে জনবল সঙ্কটকে দায়ী করছেন এ কর্মকর্তা। 

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ২৬২ জন কর্মচারী দিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চলছে। তবে এই হাসপাতালে এ কাজের জন্য ৫০০ থেকে ৬০০ জন লোক দরকার।’

সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক হুমায়ুন কবির বলেন, ‘হৃদরোগ ওয়ার্ডে রোগী থাকার কথা ৪০ জন, প্রতিদিন গড়ে ১৫০-১৮০ জন রোগী ভর্তি থাকেন। রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পরও কিছুক্ষণ পরই আবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কয়েক বার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয় হাসপাতালে।’ 

তিনি বলেন, ‘৯০০ শয্যার হাসপাতাল হলেও জনবল রয়েছে ৫০০ শয্যার জন্য। অথচ প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার রোগীকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। বাথরুমের দরজা-জানালা সংস্কারের জন্য গণপূর্ত বিভাগের সাথে আলোচনা চলছে।’