ময়মনসিংহে সড়ক দুর্ঘটনা, সড়ক দুর্ঘটনা, চার প্রজন্মের মৃত্যু, বাস-অটোরিকশা সংঘর্ষ, সিএনজিচালিত অটোরিকশা
সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের চার প্রজন্ম নিহত। সংগৃহীত

মাকে গাজীপুরে নিজের কাছে নিয়ে যেতে গতকাল শুক্রবার সকালে জামালপুরের দড়ি হামিদপুর গ্রামের বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন মোফাজ্জল হোসেন লেবু। সাথে ছিলেন তার মেয়ে মর্জিনা আক্তার ও পাঁচ বছরের নাতি মিনান। কয়েক ঘণ্টার সেই যাত্রাই হয়ে উঠল তাদের জীবনের শেষ যাত্রা।

Advertisement

শুক্রবার (২ অক্টোবর) দুপুরে ময়মনসিংহ নগরের রহমতপুর বাইপাস সড়কের দাপুনিয়া হাড়গুজির পাড় এলাকায় রাজীব পরিবহনের একটি বাসের সাথে তাদের বহনকারী সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে একই পরিবারের চার প্রজন্মের চারজনসহ সাতজন নিহত হন।

নিহত একই পরিবারের চারজন হলেন রাশিদা বেগম (৭০), তার ছেলে মোফাজ্জল হোসেন লেবু (৫০), নাতনি মর্জিনা আক্তার (২৫) ও প্রপৌত্র মিনান (৫)।

এ দুর্ঘটনায় নিহত অন্য তিনজন হলেন অটোরিকশাচালক সুজন আলী (৪৪), আকরাম আলী (৫১) ও তার স্ত্রী মমতা বেগম (৩৯)।

মোফাজ্জলের ছোট ভাই মোবারক হোসেন বলেন, ‘মাকে নিজের কাছে বেড়াতে নিতে এসেছিল। মেয়ে ও নাতিও সাথে যাওয়ার বায়না ধরেছিল। তিনজনকে নিয়ে বের হয়েছিল। কিন্তু এ যাওয়া যে শেষ যাওয়া হবে, সেটি তারা বুঝতে পারেনি।’

শুক্রবার সকালে মাকে সাথে নিয়ে গাজীপুরের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন মোফাজ্জল। পরিবারের স্বাভাবিক একটি যাত্রা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পরিণত হয় মর্মান্তিক দুর্ঘটনায়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বাস ও অটোরিকশার সংঘর্ষের শব্দ ছিল বিকট। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, অটোরিকশাটি দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। ভেতরে আটকে পড়েন যাত্রীরা।

প্রত্যক্ষদর্শী নাজিম উদ্দিন জানান, তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে শিশুসহ এক নারীকে উদ্ধারের চেষ্টা করেন। তবে হাসপাতালে নেয়ার প্রস্তুতির মধ্যেই তাদের মৃত্যু হয়।

দুর্ঘটনার পর ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। রাতেই আইনি প্রক্রিয়া শেষে লাশগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

শনিবার সকালে জামালপুরের রানাগাছা ইউনিয়নের দড়ি হামিদপুর ভাটিপাড়া গ্রামে পাশাপাশি দাফন করা হয় একই পরিবারের চারজনকে। যে বাড়ি থেকে আগের দিন তারা গাজীপুরের পথে বের হয়েছিলেন, সেখানেই ফিরলেন নিথর দেহ হয়ে।

পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, সড়কের বাঁকে দ্রুতগতিতে আসা দুই যানবাহন নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারায় মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শিবিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

দুর্ঘটনার পর যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, চালকদের দায়িত্বশীলতা, যানবাহনের ফিটনেস ও চালকদের বৈধ কাগজপত্র এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ ওই এলাকায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এসব বিষয়ে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারণ হবে।

একই পরিবারের চারজনকে একসাথে হারানোর ঘটনায় দড়ি হামিদপুরসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয়দের কাছে ঘটনাটি যেন অবিশ্বাস্য এক বাস্তবতা। যাদের সাথে প্রতিদিন দেখা ও কথা হতো, তাদের এভাবে একসাথে হারানোর ঘটনায় স্তব্ধ স্বজন ও এলাকাবাসী।

একটি সড়ক দুর্ঘটনা একসাথে কেড়ে নিল একটি পরিবারের চার প্রজন্মের চারটি প্রাণ। আজ পাশাপাশি চারটি কবর যেন সেই শোকেরই নীরব সাক্ষী হয়ে রইল।

মাকে নিতে বেরিয়ে যারা ঘর ছেড়েছিলেন, তারা আর ফিরে এলেন না। ফিরলেন নিথর দেহ হয়ে—এক পরিবারের চার প্রজন্মের চারজন।