
দেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, জরাজীর্ণ ও ১১৪ বছরের পুরোনো সিলেট-আখাউড়া রেলপথ জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার ও পুনর্বাসন শুরু করেছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ে ২৪৫ কোটি ৩৯ লাখ টাকার জরুরি একটি প্রকল্পের দরপত্র (টেন্ডার) আহ্বান করেছে।
গত ১০ সেপ্টেম্বর ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের রেলপথ সংস্কার ও পুনর্বাসন’ প্রকল্পের আওতায় ২৪৫ কোটি ৩৯ লাখ টাকার এই টেন্ডার আহ্বান করা হয়। সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পটি তিনটি আলাদা প্যাকেজে বিভক্ত।
প্রথম প্যাকেজে সিলেট রেলওয়ে স্টেশন থেকে কুলাউড়ার লংলা স্টেশন পর্যন্ত সংস্কার কাজ করা হবে। যার প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা।
দ্বিতীয় প্যাকেজের আওতায় লংলা স্টেশন থেকে হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের সাটিয়াজুড়ী স্টেশন পর্যন্ত সংস্কার কাজ হবে। এর প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১০২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা।
তৃতীয় প্যাকেজে সাটিয়াজুড়ী থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া জংশন পর্যন্ত সংস্কারের জন্য প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৯ কোটি ২৩ লাখ টাকা।
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, সিলেট আখাউড়া রেলপথের পুরো ১৭৯ কিলোমিটারজুড়েই এই সংস্কার কাজ চালানো হবে। এর মধ্যে বিভিন্ন এলাকার প্রায় ৬০ কিলোমিটার অংশ সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে নতুন রেললাইন (পাথ) স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত স্লিপার অপসারণ, পর্যাপ্ত ব্যালাস্ট (পাথর) সরবরাহ, পয়েন্টসহ যাবতীয় প্রয়োজনীয় ফিটিংস পরিবর্তন এবং টেম্পিংসহ লাইন সংস্কারের আনুষাঙ্গিক কাজ সম্পন্ন করা হবে।
রেলওয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, এটি মূলত লাইনের কার্যক্ষমতা ধরে রাখার একটি জরুরি প্রকল্প। তবে এর পাশাপাশি সিলেট-আখাউড়া রেলপথের আধুনিকায়নে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে একটি ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ সংক্রান্ত মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের চূড়ান্ত প্রক্রিয়াও বর্তমানে চলমান।
বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (উন্নয়ন) আল ফাত্তাহ মো: মাসউদুর রহমান নয়া দিগন্তকে জানান, চট্টগ্রাম, সিলেট ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের পুরোনো রেললাইন ও স্টেশন সংস্কারের জন্য এক হাজার ৭৯১ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবেই সিলেট-আখাউড়া লাইনের জরুরি সংস্কার ও পুনর্বাসন কাজ দ্রুত শুরু হচ্ছে।
সিলেট-আখাউড়া রেললাইন সংস্কার ও পুনর্বাসন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ও পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান প্রকৌশলী তানভীরুল ইসলাম জানান, দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং প্রাক্কলিত ব্যয় কিছুটা কমতে পারে।
তিনি আরো জানান, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ট্রেনের গতি আগের চেয়ে অনেক বৃদ্ধি পাবে, ভ্রমণের সময় কমবে এবং যাত্রীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসবে।
ব্রিটিশ আমলে ১৯১২-১৫ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে চালু হওয়া ১৭৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথটির বয়স ইতোমধ্যে ১১৪ বছর পার হয়েছে। দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে এই রেলপথ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। অনেক স্থানে পাথর ও স্লিপার ক্ষয় হয়ে যাওয়ায় মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে ট্রেন চলাচল করছে। এতে প্রায়ই ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটে চলছে। মূলত ট্রেন চলাচল নিরাপদ ও টেকসই করা এবং ট্রেনের গতি বাড়িয়ে যাত্রীদের ভ্রমণ সময় কমানোর জন্যই এই জরুরি উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
সিলেট-আখাউড়া রেলপথের দৈর্ঘ্য ১৭৯ কিলোমিটার। জরাজীর্ণ হয়ে পড়া এই সেকশনে রয়েছে ১৩টি মহাঝুঁকিপূর্ণ সেতু। রেলওয়ের ভাষায় যা ‘ডেডস্টপ’। এছাড়া ট্রেন লাইনও ত্রুটিপূর্ণ। এসবের সাথে রয়েছে ট্রেনের পুরোনো ইঞ্জিন আর বগি। এইসব মিলিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়া সিলেট-আখাউড়া রেলপথে ট্রেন ভ্রমণ এখন ভোগান্তি বাড়িয়েছে যাত্রীদের।
ঘনঘন দুর্ঘটনার কারণে এই সেকশনে ট্রেনের সময়সূচিও ঠিক থাকছে না। রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানান, সিলেট-কুলাউড়া-আখাউড়া সেকশনে আগে ট্রেন চলত ৭০-৮০ কিলোমিটার গতিতে। এখন সেই গতি অর্ধেকে অর্থাৎ ৪০ কিলোমিটারে নেমে এসেছে।
রেলওয়ের সংশ্লিষ্টরা জানান, পাহাড়ি ও আঁকাবাঁকা সড়ক হওয়ায় আখাউড়া-সিলেট সেকশনের রশিদপুর থেকে মাইজগাও পর্যন্ত সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। তবে জরাজীর্ণ লাইন, মেয়াদোত্তীর্ণ সেতু ও পুরোনো কোচের কারণে এই সেকশনে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে।
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলীয় জোনের তথ্যমতে, আখাউড়া-সিলেট রেলপথে পারাবত, জয়ন্তিকা, পাহাড়িকা, উদয়ন, উপবন ও কালনি এক্সপ্রেস ট্রেনে প্রতিদিন ১২-১৫ হাজার যাত্রী সিলেট-ঢাকা ও সিলেট-চট্টগ্রাম যাতায়াত করেন।
এই রেলপথের জরুরি সংস্কার ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে চলাচলে ঝুঁকি কমে আসবে এবং যাত্রী সাধারণের যাতায়াতের সংখ্যাও বাড়বে বলে মনে করছেন রেলওয়ের সংশ্লিষ্টরা।
_GDN_970x90px_English.gif&w=2048&q=75)








