জলাতঙ্ক
ময়মনসিংহের ম্যাপ। ফাইল ছবি

কখনো কুকুরের কামড়, কখনো বিড়ালের আঁচড়, আবার কখনো বানরের আক্রমণ। ময়মনসিংহে প্রাণীর কামড় ও আঁচড়ে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। প্রতিদিন শতাধিক মানুষ জলাতঙ্কের টিকা ও চিকিৎসা নিতে আসছেন হাসপাতালে। কোনো কোনো দিন এই সংখ্যা দেড় শতাধিক ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আক্রান্তদের বড় একটি অংশ শিশু।

Advertisement

ময়মনসিংহ নগরের সূর্যকান্ত (এসকে) হাসপাতালের পরিসংখ্যানেও উঠে এসেছে এমন চিত্র। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত প্রাণীর কামড় ও আঁচড়ে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ২০ হাজার ৭৩ জন। এর মধ্যে সাত হাজার ৫০৬ জন কুকুরের কামড়ের শিকার। আক্রান্তদের মধ্যে পাঁচ হাজার ৯৫৫ জনের বয়স ১৫ বছরের নিচে।

গত বছরের একই সময়ে প্রাণীর কামড় ও আঁচড়ে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছিলেন ১৬ হাজার ৫৭০ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই রোগীর সংখ্যা বেড়েছে তিন হাজার ৫০৩ জন।

হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, আজ মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত নতুন করে চিকিৎসা নিয়েছেন ১২৩ জন। এর আগের দিন রোববার ১৪২ জন, শনিবার ১৬২ জন, বৃহস্পতিবার ১২৬ জন, বুধবার ১৩১ জন এবং মঙ্গলবার ১৫৪ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, অনেক দিনই নতুন রোগীর সংখ্যা ১০০ থেকে ১৫০ জনের মধ্যে থাকে।

আক্রান্তদের বড় অংশ শিশু
প্রাণীর কামড় ও আঁচড়ে আক্রান্তদের মধ্যে শিশুদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে চিকিৎসা নেয়া ২০ হাজার ৭৩ জনের মধ্যে পাঁচ হাজার ৯৫৫ জনের বয়স ১৫ বছরের কম।

গত বছরও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। ২০২৫ সালে প্রাণীর কামড় ও আঁচড়ে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছিলেন ২৯ হাজার ১৪ জন। তাদের মধ্যে আট হাজার ৩৩৮ জনের বয়স ছিল ১৫ বছরের কম। একই বছরে কুকুরের কামড়ের শিকার হন ১১ হাজার ৯৬৮ জন।

এর আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালে প্রাণীর কামড় ও আঁচড়ে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছিলেন ২১ হাজার ২৭৩ জন। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৯ হাজার ১৪ জনে। আর চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই আক্রান্তের সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়েছে।

বানরের কামড়ে আহত স্কুলছাত্রী
সোমবার দুপুরে ময়মনসিংহ নগরের কাঠগোলা-বানিয়াবোর্ড সরকারি কোয়ার্টার এলাকায় বানরের কামড়ের শিকার হয় পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাইবা তাসনিম। বানরকে কলা খাওয়াতে গিয়ে তার হাতে কামড় লাগে। পরে তাকে এসকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন মা হাফসা আক্তার।

তিনি বলেন, ‘সরকারি কোয়ার্টারের আশপাশে প্রায়ই বানর আসে। খাবার দিতে গেলে তার মেয়ের হাতে বানরটি কামড় দেয়।’

চিকিৎসকের পরামর্শ
এসকে হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক প্রজ্ঞানন্দ নাথ বলেন, ‘কুকুর, বিড়াল, শেয়াল, বেজি ও বানরের কামড় কিংবা আঁচড়ে আক্রান্ত হয়ে রোগীরা হাসপাতালে আসছেন। অনেক দিন নতুন রোগীর সংখ্যা ১০০ থেকে ১৫০ জন পর্যন্ত হয়।’

তিনি বলেন, ‘কোনো প্রাণী কামড়ালে বা আঁচড় দিলে দ্রুত ক্ষতস্থান সাবান ও পানি দিয়ে অন্তত ১৫ মিনিট ধুয়ে ফেলতে হবে। এরপর দেরি না করে হাসপাতালে এসে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী টিকা নিতে হবে।’

ক্ষতস্থানে লবণ পোড়ানো, পানি পোড়ানোসহ লোকজ চিকিৎসা না করার পরামর্শ দেন তিনি।

টিকা নিয়ে সঙ্কট নেই
প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের পর জলাতঙ্কের ঝুঁকি এড়াতে দ্রুত চিকিৎসার পাশাপাশি পর্যাপ্ত টিকার প্রাপ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ।

ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, ‘এসকে হাসপাতালে কুকুরের কামড়ের ভ্যাকসিন ও র‍্যাবিস ইমিউনোগ্লোবুলিন দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে এসবের কোনো সঙ্কট নেই।’

তিনি বলেন, ‘প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের পর দ্রুত ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। একই সাথে কুকুরকে অকারণে উত্ত্যক্ত করা বা ঢিল ছোড়া থেকে বিরত থাকতে হবে।’

বন্ধ সরকারি কুকুরের টিকাদান কার্যক্রম
ময়মনসিংহ জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কুকুরের টিকাদানের একটি সরকারি কার্যক্রম আগে চালু ছিল। তবে বর্তমানে সেটি বন্ধ রয়েছে। প্রাণীদের টিকাদানের জন্য প্রাণিসম্পদ কার্যালয় থেকে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, জলাতঙ্ক প্রতিরোধযোগ্য রোগ। তবে আক্রান্ত প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের পর চিকিৎসা নিতে দেরি করলে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই এমন ঘটনা ঘটলে দ্রুত ক্ষতস্থান সাবান ও পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী টিকা নিতে হবে।