
যমুনার ভাঙনে বদলে যাচ্ছে সাঘাটার মানচিত্র। গত ২৩ বছরে নদীতে বিলীন হয়েছে ২০.৮৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা। রাত নামলেই এলাকার মানুষের মনে বাড়ে আতঙ্ক। ঘুম যেন আসে না চোখে। চোখ বন্ধ করলেই মনে হয়— ভোর হওয়ার আগেই হয়তো বসত ভিটাটুকুও নদী গর্ভে চলে যাবে। ঘরের চাল, উঠানের গাছ, জমির ফসল, সবই একসময় ছিল নিজের। এখন নদীর স্রোতের দিকে তাকিয়ে শুধু হিসেব করতে হয়, আর কতটুকু জমি বা ঘরবাড়ি অবশিষ্ট আছে।
এভাবেই যমুনার সাথে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে বেঁচে আছেন গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার নদীপাড়ের মানুষ। কারো ঘর গেছে একবার, কারো দুই-তিনবার। কেউ হারিয়েছেন ফসলি জমি, কেউ স্কুল, কেউবা মসজিদ-মাদরাসা। ভাঙনের কবলে পড়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটতে ছুটতে অনেক পরিবারের জীবনে স্থায়ী ঠিকানাটিই যেন এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
গবেষণা তথ্য বলছে, এ আতঙ্কের পেছনে রয়েছে বাস্তবতাও। ২০০০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ২৩ বছরে যমুনার গতিপথ পরিবর্তন ও তীব্র ভাঙনে সাঘাটা উপজেলার প্রায় ২০.৮৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভারতখালী, সাঘাটা, হলদিয়া, কামালেরপাড়া ও কচুয়া ইউনিয়ন।
নয়া দিগন্তের অনুসন্ধানে সরেজমিনে সাঘাটার নলছিয়া ও হলদিয়া ইউনিয়নের নদী তীরবর্তী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ভাঙন প্রতিরোধে কোথাও সিসি ব্লক, কোথাও জিওব্যাগ ফেলা হয়েছে। তবুও মানুষের চোখে-মুখে স্বস্তির চেয়ে আতঙ্কই বেশি।
নলছিয়া গ্রামের ৫৫ বছর বয়সী রাশিদুল ইসলাম বলেন, নদীভাঙনের কারণে আমরা খুব বিপদে আছি। সরকারি কাজ চলছে। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার পর আমরা কতটা নিরাপদ থাকব, সেটাই বুঝতে পারছি না।
হলদিয়া ইউনিয়নের কাজলী আক্তারের কণ্ঠেও একই আতঙ্ক। তিনি বলেন, ‘রাত হলে ভয় হয়, ঘুমাতে পারি না। কখন নদীগর্ভে চলে যাই,এই চিন্তা থাকে। এক সময় যমুনা এখান থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার পূর্বে ছিল। এখন নদী আমাদের ইউনিয়নের কাছে চলে এসেছে। জানি না, এর শেষ পর্যন্ত কী হবে।’
স্থানীয়দের ভাষ্য, গত এক দশকে হলদিয়া ইউনিয়নের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা নদী ভাঙনের শিকার হয়েছে। কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও মাদরাসা একাধিক বার সরিয়ে নেয়া হলেও থামেনি ভাঙনের হুমকি।
নদী ভাঙনের সবচেয়ে নির্মম আঘাত পড়েছে শিশুদের শিক্ষাজীবনেও। সাঘাটার গোবিন্দপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী মাহবুর রহমান বলেন, ‘আমি একসময় গোবিন্দপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়তাম। স্কুলটির পাকা ভবন নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পর থেকেই আমার পড়াশোনা আর করা সম্ভব হয়নি।’
গাইবান্ধা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লক্ষ কুমার দাস জানান, এক বছরে জেলার বিভিন্ন নদীর ভাঙনে আটটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এখনো সদর, সাঘাটা, সুন্দরগঞ্জ ও ফুলছড়ির কয়েকটি বিদ্যালয় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
নদীভাঙনের পাশাপাশি অবৈধভাবে বালু উত্তোলন নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। হলদিয়া ইউনিয়নের মমিম মিয়া বলেন, ‘অবৈধভাবে বালু তোলা বন্ধ না হলে নদীভাঙন রোধ হবে না। সরকার যতই কাজ করুক, নদীর তলদেশ থেকে বালু সরিয়ে ফেললে আবার ভাঙন দেখা দেবে।’
স্থানীয়দের দাবি, নদীর গতিপথ ও স্রোতের ধরন বিবেচনায় নিয়ে ভাঙন প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। শুধু ভাঙন শুরু হলে জিওব্যাগ ফেলে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি সামাল দিলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
হলদিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ইয়াকুব আলী বলেন, ‘যমুনার ভাঙনে হলদিয়া ইউনিয়নের প্রায় ৮০ ভাগ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। সরকার দ্রুত ভাঙন প্রতিরোধের কাজ শেষ করলে হয়তো অবশিষ্ট মানুষগুলোকে ধরে রাখা সম্ভব হবে।’
সাঘাটা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এ এইচ এম গোলাম শহীদ রঞ্জু বলেন, ‘আট-১০ বছর আগে আমি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় জনগণের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল নদীভাঙন প্রতিরোধ। ইউপি চেয়ারম্যানদের নিয়ে তৎকালীন সংসদ সদস্য ও সাবেক ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়ার কাছে বিষয়টি তুলে ধরেছিলাম। পরে সরকারি উদ্যোগে ভাঙন প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেয়া হয়। কাজ শেষ হলে আশা করি মানুষকে আর ঘরবাড়ি সরিয়ে নিয়ে কাঁদতে হবে না।’
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, যমুনা নদীর ডান তীরের ভাঙন থেকে গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার কাতরামাড়ি এবং সাঘাটা উপজেলার গোবিন্দিয়া ও হলদিয়া এলাকা রক্ষায় প্রায় ৮২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প নেয়া হয়েছে। ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রকল্পটি একনেকের অনুমোদন পায়।
প্রকল্পের আওতায় নদীতীর রক্ষায় বিভিন্ন স্থানে সিসি ব্লকসহ প্রতিরোধমূলক কাজ করা হচ্ছে। কোথাও কাজ শেষ হয়েছে, আবার কোথাও চলছে বাস্তবায়ন।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সাঘাটার ভাঙনকবলিত কয়েকটি স্থানে কাজ চলমান রয়েছে। কোথাও নদীর ভাঙন প্রকল্পের নির্ধারিত ব্যাংক লাইন বা ডিজাইনের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিজ দায়িত্বে সাময়িকভাবে সিসি ব্লক বসিয়েছে। পরে ডিজাইন অনুযায়ী কাজ বাস্তবায়ন করা হবে। এর জন্য অতিরিক্ত কোনো ব্যয় হবে না। ভাঙন রক্ষায় পর্যাপ্ত সিসি ব্লক মজুদ রয়েছে। এ মুহূর্তে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।’
তিনি আরো বলেন, ‘নতুন করে যেসব স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে, সেখানে জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা করছি। নতুন কোনো বরাদ্দ না থাকায় সেখানে স্থায়ীভাবে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না।’
বেসরকারি গণ উন্নয়ন কেন্দ্রের (জিইউকে) প্রতিষ্ঠাতা ও উন্নয়ন গবেষক এম আবদুস সালাম নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘নদীভাঙন এ অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকাকে তছনছ করে দিচ্ছে। শুধু জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলা বা সাময়িক ত্রাণ দিয়ে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।’
তিনি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, ঘরহারা পরিবারের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, জমি ও গুরুত্বপূর্ণ দলিলের নিরাপত্তা, বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা এবং পরিকল্পিত দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্ব দেন।
সিইজিআইএসের স্যাটেলাইটভিত্তিক বিশ্লেষণেও নদীভাঙনের বিস্তৃত চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটির তথ্য মতে, ১৯৭৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত যমুনা, গঙ্গা ও পদ্মার ভাঙনে প্রায় এক লাখ ৫৮ হাজার ৩৫৩ হেক্টর, অর্থাৎ প্রায় এক হাজার ৫৮৫ বর্গকিলোমিটার জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। একই সময়ে প্রায় ৪৩৩ বর্গকিলোমিটার নতুন চর জেগে উঠলেও নিট ভূমি ক্ষতির পরিমাণ প্রায় এক হাজার ১৫৩ বর্গকিলোমিটার। মোট ক্ষয়ের প্রায় ৬০ শতাংশই হয়েছে যমুনার ভাঙনে।
সিইজিআইএসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে দেশের ছয়টি জেলার ১১টি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে প্রায় ৯১৫ হেক্টর জমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
সাঘাটার নদীপাড়ের মানুষের চোখে তাই শুধু ভাঙনের ভয় নয়, রয়েছে স্থায়ীভাবে বেঁচে থাকার আকুতি। তাদের দাবি, ভাঙন শুরু হওয়ার পর নয়, ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আগেই নিতে হবে কার্যকর ব্যবস্থা। কারণ একটি পরিবার যখন ঘর হারায়, তখন শুধু একটি ঘরই হারায় না। হারায় জমি, স্মৃতি, জীবিকা, শিক্ষার সুযোগ এবং বহু বছরের গড়ে তোলা একটি জীবন।
যমুনার তীরে দাঁড়িয়ে এখন তাদের একটাই প্রশ্ন, নদী আর কতটুকু নেবে আর মানুষ কোথায় গিয়ে দাড়াবে।









