হাওর, পর্যটক, পুলিশ
কিশোরগঞ্জের হাওরে পুলিশের উদ্যোগে পর্যটক ছাউনি। নয়া দিগন্ত

বর্ষার পানি এখনো পুরোপুরি নামেনি কিশোরগঞ্জের হাওর থেকে। বিস্তীর্ণ জলরাশির বুক চিরে ছুটে চলছে ট্রলার। নিকলীর বেড়িবাঁধ, খয়রতের মোড়, করিমগঞ্জের বালিখোলা কিংবা চামড়া নৌবন্দর—হাওরে প্রবেশের পথগুলো এখনো পর্যটকে মুখরিত। কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সাথে আবার কেউবা দল বেঁধে আসছেন হাওরের জল-আকাশের মিতালি দেখতে।

তবে পানির এই মৌসুম আর বেশি দিন নেই। সাধারণত বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ থেকে আশ্বিন-কার্তিক পর্যন্ত হাওর পানিতে পরিপূর্ণ থাকে। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে পানি ধীরে ধীরে নামতে শুরু করে। ফলে এখন যারা আসছেন, তারা মূলত হাওরের জলময় রূপ দেখার মৌসুমের শেষ সময়টুকু উপভোগ করছেন।

এ সময়টায় কিশোরগঞ্জের হাওরে আসা পর্যটকেরা শুধু নিকলী বা বালিখোলায় থেমে থাকছেন না। নৌপথে ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় ছুটে যাচ্ছেন তারা। বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম অল-ওয়েদার সড়ক। মিঠামইনের দিল্লির আখড়াসহ ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থানগুলোও রয়েছে পর্যটকদের আগ্রহের তালিকায়। এছাড়াও করিমগঞ্জ উপজেলার গুনধর ইউনিয়নের খয়রতের মোড় পর্যটনের অনন্য এলাকা হয়ে উঠেছে।

আর এসব জায়গায় নিরাপদে ঘুরে বেড়ানোর পরিবেশ তৈরিতে কাজ করছে জেলা পুলিশ। হাওরে পর্যটকদের সুবিধার জন্য প্রবেশপথগুলোতে পুলিশ সুপারের উদ্যোগে স্থাপন করা হয়েছে পর্যটক ছাউনি। সেখানে বিশ্রামের পাশাপাশি মিলছে নৌকা, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, রিসোর্টের নাম্বারসহ পর্যটন এলাকার নানা তথ্য। রয়েছে পুলিশের কন্ট্রোলরুম, জরুরি ফোন নম্বর ও প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা।

ছাউনির প্রবেশপথে ছোট ছোট তোরণে লেখা—‘মাদক ছাড়ি, ভ্রমণ করি’।

কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান হাওরের পর্যটন নিয়ে বেশ কিছু পরিকল্পনা নেন। তার পরিকল্পনায় অনেকটাই আধুনিক হয়েছে হাওরের পর্যটন।

হাওরের চৌকাঠে পর্যটক ছাউনি
কিশোরগঞ্জের হাওরে যাওয়ার কয়েকটি প্রধান প্রবেশপথ রয়েছে। এসব পথ যেন হাওরের চৌকাঠ। সড়ক পথ পেরিয়ে সামনে পৌঁছালেই খুলে যায় হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশি।

কিশোরগঞ্জ জেলা শহর থেকে একরামপুর হয়ে নিকলী উপজেলার বেড়িবাঁধ এলাকায় প্রতিদিনই আসছেন বিপুলসংখ্যক পর্যটক। এখান থেকেই হাওর ভ্রমণের জন্য নৌকা ভাড়া করা হয়। ঢাকা থেকে বাজিতপুর হয়ে কিংবা পুলেরঘাট দিয়েও সরাসরি নিকলীতে যাওয়া যায়।
পর্যটকদের সুবিধার জন্য বেড়িবাঁধের মাঝামাঝি স্থানে জেলা পুলিশের উদ্যোগে স্থাপন করা হয়েছে পর্যটক ছাউনি। সেখানে পর্যটকরা বিশ্রাম নিতে পারেন। ছাউনির পাশে রয়েছে পুলিশের কন্ট্রোলরুম।

হাওরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ করিমগঞ্জের বালিখোলা ফেরিঘাট। ভরা মৌসুমে প্রতিদিন হাজারো পর্যটকের সমাগম হয় সেখানে। বালিখোলাতেও স্থাপন করা হয়েছে পর্যটক ছাউনি। এর পাশের চামড়া নৌবন্দরেও একই ধরনের ছাউনি স্থাপন করেছে জেলা পুলিশ।
প্রতিটি ছাউনির প্রবেশপথে ছোট তোরণে রাখা হয়েছে একই বার্তা—‘মাদক ছাড়ি, ভ্রমণ করি’।

ছাউনি থেকে হাওরের বিভিন্ন গন্তব্যে
নিকলী কিংবা বালিখোলা থেকে নৌকা নিয়ে হাওরের ভেতরে ঢুকে পর্যটকরা ছুটে যান বিভিন্ন গন্তব্যে। ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম এখন হাওরভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ।

বিশেষ করে ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম অল-ওয়েদার সড়ক পর্যটকদের কাছে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করেছে। পানির বিস্তীর্ণ প্রান্তরের মধ্য দিয়ে চলে যাওয়া দীর্ঘ সড়কটি বর্ষায় এক ভিন্ন দৃশ্য তৈরি করে। সড়কের দুই পাশে পানি, দূরে গ্রাম আর মাথার ওপর খোলা আকাশ—এই দৃশ্য দেখতে অনেকেই নৌকা ভ্রমণের পাশাপাশি সড়কপথেও হাওরের ভেতরে ঘুরে বেড়ান।

অষ্টগ্রামের কুতুব শাহী মসজিদ পর্যটকদের অন্যতম গন্তব্য। মিঠামইনের দিল্লির আখড়াতেও ছুটে যাচ্ছেন পর্যটকরা। ইতিহাস ও স্থাপত্যের সাথে হাওরের প্রাকৃতিক পরিবেশ মিলিয়ে জায়গুলো দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে।

ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখার পাশাপাশি পর্যটকেরা স্থানীয় জীবনযাত্রা, হাওরের গ্রাম, নৌযান ও বর্ষাকালের জলমগ্ন প্রকৃতিও উপভোগ করছেন।

পুলিশের পর্যটন পরিকল্পনার কারণে এসব এলাকায় যাতায়াতের সময় পর্যটকরা প্রয়োজনীয় তথ্য ও সহযোগিতা পাচ্ছেন। কোথা থেকে নৌকা নিতে হবে, কোন পথে কোন এলাকায় যাওয়া যায়, নৌকা ভাড়া কত—এসব তথ্য পর্যটক ছাউনিতে আগে থেকেই জানার সুযোগ থাকায় ভ্রমণ অনেকটা সহজ হচ্ছে।

নিরাপত্তার সাথে তথ্যসেবা
হাওরে পর্যটন বাড়ার সাথে নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে হাওরে কয়েকটি ডাকাতির ঘটনা ঘটলে বিষয়টি জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় ওঠে। পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ব্যবস্থা নেন।

ট্রলার মালিকদের বিকেল ৫টার পর নৌকা না চালানোর পরামর্শ দেয়া হয়। ওই সময় অভিযান চালিয়ে কয়েকজন ডাকাত সরদারকে গ্রেফতার করা হয়। এখন রাত ৮টা পর্যন্ত হাওরে নৌকা চলাচল করে।

পর্যটকরা যাতে নিরাপদে হাওর ঘুরে দেখতে পারেন, সে জন্য নেয়া হয় পর্যটনকেন্দ্রিক নানা উদ্যোগ। পর্যটক ছাউনি তারই অংশ।
ছাউনিতে রাখা হয়েছে হাওরের মানচিত্র। কোন জায়গা থেকে কোথায় কিভাবে যেতে হবে, তা সেখানে দেখানো হয়েছে। রয়েছে শত শত ট্রলার মাঝির ফোন নম্বর ও নৌকা ভাড়ার তালিকা।

হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও রেস্টুরেন্টের ফোন নম্বরও দেয়া পর্যটন ছাউনিতে আছে। হাওরে এসে রাত কাটাতে হলে কোন হোটেলে কত খরচ এবং রেস্তোরাঁর খাবারের স্বাভাবিক মূল্য তালিকাও টাঙানো রয়েছে।

ফলে পর্যটকেরা নৌকা ভাড়া, আবাসন কিংবা খাবারের ক্ষেত্রে আগে থেকেই খরচ সম্পর্কে ধারণা নিতে পারছেন।

বিপদে পাশে পুলিশ
পর্যটক ছাউনিতে রয়েছে প্রাথমিক চিকিৎসার কিটবক্স। হাওরে ঘুরতে এসে কোনো পর্যটক অসুস্থ হয়ে পড়লে কিংবা দুর্ঘটনায় পড়লে তাৎক্ষণিক সহযোগিতার ব্যবস্থা রয়েছে।

এছাড়া নৌ পুলিশ ও পর্যটন পুলিশের ফোন নম্বরও রাখা হয়েছে ছাউনিতে। কোনো পর্যটক সমস্যায় পড়লে সেখান থেকে পুলিশের সহযোগিতা নিতে পারেন।

ফলে হাওরের বিভিন্ন গন্তব্যে ঘুরতে যাওয়া পর্যটকদের কাছে নিরাপত্তার বিষয়টি একটি অতিরিক্ত ভরসার জায়গা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পরিবার নিয়ে আসা পর্যটকদের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে স্বস্তির বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শিক্ষার্থীদের জন্য হোটেলে কক্ষ
হাওরের পর্যটনকে শুধু বর্ষার কয়েক মাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না পুলিশ সুপার।

জেলা শহর থেকে হাওরের বিভিন্ন উপজেলার হোটেল ও রিসোর্টে শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিদিন একটি করে কক্ষ বরাদ্দ রাখার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শিক্ষার্থীরা কিশোরগঞ্জে এসে হাওর ভ্রমণ করতে পারেন, সেই সুযোগ তৈরি করাই এর উদ্দেশ।

পর্যটকদের সহযোগিতার জন্য স্থানীয় তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে পর্যটন গাইড হিসেবে তৈরি করার পরিকল্পনাও রয়েছে। এতে পর্যটকরা স্থানীয় গাইডের সহযোগিতা পাবেন, পাশাপাশি তরুণদেরও পর্যটন খাতে সম্পৃক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।

কবির চোখে হাওরের পর্যটন
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান লেখালেখির সাথেও যুক্ত। ‘রহমান শেলী’ নামে তিনি লেখালেখি করেন। কবিতা ও সাহিত্যের প্রতি আগ্রহের পাশাপাশি প্রকৃতির প্রতিও রয়েছে তার আকর্ষণ।

পুলিশি দায়িত্বের পাশাপাশি হাওরের পর্যটন সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পরিকল্পনাতেও সেই আগ্রহের ছাপ রয়েছে। নিরাপত্তা, তথ্যসেবা, স্থানীয় তরুণদের সম্পৃক্ততা এবং পর্যটকদের স্বাচ্ছন্দ্য—সবকিছুকে একসাথে নিয়ে এগোতে চান তিনি।

জেলা পুলিশের দাবি, এসব উদ্যোগের ফলে চলতি বছর কিশোরগঞ্জের হাওরে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ পর্যটকের সমাগম হয়েছে।

পানির মৌসুম শেষের পথে
হাওরে নৌকায় ভ্রমণের সবচেয়ে আকর্ষণীয় সময় বর্ষা। সাধারণত বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ থেকে পানি বাড়তে শুরু করে ও আশ্বিন-কার্তিক পর্যন্ত হাওর পানিতে পূর্ণ থাকে। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের পর পানি ধীরে ধীরে নামতে থাকে।

এখন সেপ্টেম্বরের শেষ সময়। ফলে নৌকায় হাওর ভ্রমণের সুযোগ রয়েছে আর অল্প কিছুদিন। পানি আরো কমে গেলে নৌকায় করে বিস্তীর্ণ জলরাশির মধ্যে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগও কমে আসবে।

তাই এখনো দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা ছুটে আসছেন। নিকলী ও বালিখোলা হয়ে তারা ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছেন। কেউ অল-ওয়েদার সড়ক ঘুরে দেখছেন, কেউ মিঠামইনের দিল্লির আখড়া, কেউবা হাওরের গ্রাম ও জলমগ্ন প্রকৃতি উপভোগ করছেন।

বর্ষার পরও হাওর থাকবে পর্যটনের ঠিকানা
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের পরিকল্পনা শুধু বর্ষার হাওরকে ঘিরে নয়। শুকনো মৌসুমেও পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে দিগন্তজোড়া হাওরের বিভিন্ন স্থানে জেলা পুলিশের উদ্যোগে অস্থায়ী তাবু স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। নয়া দিগন্তকে এসব বিষয় জানান মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। 

তিনি বলেন, ‘স্থানীয় তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে পর্যটন গাইড হিসেবে তৈরি করার উদ্যোগও রয়েছে। ফলে হাওরের ইতিহাস, প্রকৃতি, স্থানীয় জীবনযাত্রা ও দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে পর্যটকরা স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন।’

অর্থাৎ বর্ষায় নৌকা আর শুকনো মৌসুমে হাওরের বিস্তীর্ণ প্রান্তর—দুই রূপকেই পর্যটনের অংশ করতে চায় জেলা পুলিশ।

জনপ্রতিনিধিদের প্রশংসা
কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান জানান, বর্ষায় হাওরে পানি আসার শুরুতে কয়েকটি ডাকাতির ঘটনা তাকে উদ্বিগ্ন করেছিল। তিনি বিষয়টি পুলিশ সুপারকে জানান। পুলিশ সুপার গুরুত্বের সাথে নিয়ে ডাকাতদের গ্রেফতার করেন। এখন কিশোরগঞ্জের হাওর পর্যটকদের জন্য নিরাপদ।

কিশোরগঞ্জ-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও সরকারের বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো: শরীফুল আলম বলেন, ‘হাওরের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি পর্যটকদের সুবিধার জন্য পুলিশ সুপারের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। আমি আশা করব তিনি আরো কাজ করবেন। কোনো পর্যটক এসে যেন কিশোরগঞ্জকে খারাপ বলে যেতে না পারে। এ ব্যাপারে অবশ্য পুলিশ সুপার ভালো কিছু উদ্যোগ নিয়েছেন, আমরা এ ব্যাপারে তাকে আরো উৎসাহ দিতে চাই।’

কিশোরগঞ্জ জেলার আইন-শৃঙ্খলা ও উন্নয়নের দায়িত্বে থাকা তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী জানান, হাওরের পর্যটন প্রসারে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের পরিকল্পনার কথা জেনে তারও হাওর পর্যটনের প্রতি আলাদা আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সবাই সম্মিলিতভাবে কাজ করলে কিশোরগঞ্জের হাওর একসময় শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বের অন্যতম পর্যটন এলাকায় পরিণত হতে পারে।