শীত, কুয়াশা, শিশিরবিন্দু
দূর্বাঘাসের ডগায় জমে আছে শিশিরবিন্দু। নয়া দিগন্ত

ভোরের আলো তখনো ফোটেনি। দূর্বাঘাসের ডগায় জমে আছে শিশিরবিন্দু। সূর্যের প্রথম কিরণ পড়তেই ঝিলমিল করে উঠছে মুক্তোর মতো। ধান ক্ষেতে উড়ে যাচ্ছে ঘাস ফড়িং, কোথাও আবার শিশির ভেজা ঘাসে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে। নদীর বুক থেকে ভেসে আসছে হালকা কুয়াশা। ‎প্রকৃতির এই নীরব আয়োজন যেন কোনো শব্দ ছাড়াই বলে দিচ্ছে শীতের আগমনী বার্তা দিচ্ছে!
‎
‎উত্তরের জনপদ গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার গ্রামগঞ্জে এখন এমনই বদলে যাওয়া সকাল। বাঙালি নদীর তীর, ধান ক্ষেতের আইল কিংবা গ্রামের মেঠো পথ সবখানেই শীতের আগমনী আবহাওয়া। ভোরের বাতাসে হালকা ঠাণ্ডা, ঘাসের ডগায় শিশির আর দূরের কুয়াশা মিলিয়ে প্রকৃতি যেন নতুন সাজে সেজেছে।
‎
‎শীত গাইবান্ধার মানুষের কাছে শুধু একটি ঋতুর নাম নয়। এর সাথে জড়িয়ে আছে কৃষকের মাঠ, খেজুরের রস, পিঠা-পায়েস, মায়ের হাতের রান্না, উঠানে বসে গল্প আর নরম রোদের উষ্ণতায় হারিয়ে যাওয়া শৈশব।
‎
‎

কৃষক সালাম মিয়া বলেন, আমার কাছে শীতের খবর আসে শরীরের অনুভূতিতে। ভোর রাতে এখন হালকা শীত লাগে। খেতা-কম্বল গায়ে দিতে হচ্ছে। আগের মতো সবসময় ফ্যানও চালাতে হয় না। মনে হচ্ছে শীত পড়তে শুরু করেছে।
‎
‎বোনারপাড়া ইউনিয়নের আব্দুল মান্নান বলেন, ভোরের আলো আর সূর্যের কিরণে এখন প্রকৃতিটা খুব সুন্দর লাগে। ঠাণ্ডা বাতাসও বয়ে যায়। মনে হচ্ছে, শীত চলে এসেছে। পর্যাপ্ত বৃষ্টি হওয়ায় এবার কৃষকের জন্যও সময়টা ভালো যাচ্ছে।
‎
‎গাছাবাড়ী গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য ফরমান আলী বলেন, আগে প্রায় সারাদিন ফ্যান চালাতে হতো। এখন আর তেমন লাগে না। ভোরের দিকে ঠাণ্ডা অনুভূত হচ্ছে, এটাই শীত আসার লক্ষণ।
‎
‎সাঘাটা ইউনিয়নের খেয়া ঘাটের নৌকা চালক ফয়জার রহমান বলেন, শীতের আগমন ধরা পড়ে নদীর বুকে। ভোরে নৌকা চালাতে বের হলে একটু শীত শীত লাগে। নদীর ওপর হালকা কুয়াশাও দেখা যায়। তখনই বোঝা যায় শীত আসছে।
‎
‎

শীতের এই আগমনী হাওয়া শুধু প্রকৃতিকে বদলায় না, মানুষের স্মৃতিকেও নাড়া দেয়। তরুণ কবি ও লেখক জাহাঙ্গীর আলম আজাদের কাছে শীত প্রকৃতির সৌন্দর্যের পাশাপাশি অনুভূতিরও ঋতু।
‎
‎তার ভাষায়, শীতের সকাল ফটো সাংবাদিকের ক্যামেরায় যেমন গল্প হয়ে ধরা দেয়, তেমনি কবির কলমে হয়ে ওঠে কবিতা।
‎
‎কবি ও সাংবাদিক প্রতীক ওমর বলেন, শীত এলেই চারপাশটা যেন একটু অন্যরকম হয়ে যায়। ভোরের কুয়াশায় ঢাকা পথ, ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশির, জানালার ফাঁক দিয়ে আসা মিষ্টি রোদ সব কিছুতেই অন্যরকম ভালো লাগা থাকে। গরম চায়ের কাপে ধোঁয়া ওঠে, গায়ে জড়ানো থাকে প্রিয় চাদর। বিকেলের নরম রোদে বসে থাকতে ইচ্ছে করে অনেকক্ষণ। 
‎
‎তিনি বলেন, শীতের রাতগুলো একটু বেশি নীরব, একটু বেশি আবেগী। পুরোনো স্মৃতি মনে পড়ে, প্রিয় মানুষগুলোর কথা মনে পড়ে। শীত শুধু ঠাণ্ডা নিয়ে আসে না। কুয়াশার ভেতর হারিয়ে যাওয়া সকাল, রোদের উষ্ণতা আর আপনজনদের আরো কাছে পাওয়ার অজুহাতও নিয়ে আসে।
‎
‎জাতীয় কৃষি পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষি গবেষক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলামের বলেন, স্মৃতিতে শীত মানেই ছিল গ্রামীণ উৎসব। স্বাধীনতার আগে ও পরে শীত ছিল আমাদের গ্রামীণ দাওয়াত ও আনন্দের সময়। মা, খালা, চাচিরা রাতে চাল ভিজিয়ে রাখতেন। ফজরের আজানের পর নামাজ পড়ে ঢেঁকিতে চাল কুড়ে আটা তৈরি করা হতো। সেই সময়ের শীতের আমেজই ছিল আলাদা।


‎
‎প্রবীণ সাংবাদিক, কবি ও কথাসাহিত্যিক গোবিন্দ লাল দাস বলেন, ধানের আবাদ যখন মাঠ জুড়ে পরিপূর্ণ হয়ে উঠত, তখন শীতের আগমন কৃষিনির্ভর মানুষের জন্য আশীর্বাদের মতো মনে হতো। ছোটবেলায় শীতের সকালে খেজুরের রস খেতাম, মায়ের হাতে পিঠা-পায়েস খেতাম। পুরো শীত কালটাই ছিল আদর-আপ্যায়নের সময়।
‎
‎তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আগে পিঠা তৈরির জন্য ঢেঁকিতে চাল কুড়াতে হতো। কোনো বাড়িতে পিঠা তৈরি হবে শুনলেই ঢেঁকির ঠকঠক শব্দে গ্রাম মুখর হয়ে উঠত। এখন আধুনিকতার ছোঁয়ায় সেই দৃশ্য অনেকটাই হারিয়ে গেছে।
‎
‎সাঘাটার বাঙালি নদীর তীরে এখনো সেই পুরোনো গল্পের কিছুটা দেখা যায়। ভোরের শিশিরে ভেজা দূর্বাঘাস, ধান খেতের ওপর ঘাস ফড়িংয়ের লাফালাফি, নদীর বুকের পাতলা কুয়াশা আর সূর্যের মায়াবী আলো সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন নিজের হাতেই লিখছে শীতের আগমনী কবিতা!