
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) প্রধান প্রকৌশলী মো: জয়নাল আহমেদ চৌধুরীর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। একইসাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ সড়ক সংস্কারে ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ের বিষয়টি তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এর আগে, প্রায় হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই প্রকৌশলীকে ঘিরে এর আগে সড়ক সংস্কার, ভবন নির্মাণের মান, রুদ্র সেন লেক ভরাট ও টিলা কাটার অভিযোগও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল।
গত ১৬ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৪৩তম সিন্ডিকেট সভায় প্রধান প্রকৌশলীসহ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া তিন কর্মকর্তার নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। অন্য দু’জন হলেন– রেজিস্ট্রার সৈয়দ সেলিম মোহাম্মদ আব্দুল কাদির ও প্রকৌশলী বিকাশ চন্দ্র দাস।
সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে পুর ও পরিবেশ প্রকৌশল বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. শহিদুর রহমানকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো: খায়রুল ইসলাম বলেন, ‘সিন্ডিকেটের সব সদস্যের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রধান প্রকৌশলীসহ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে থাকা সকলের নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে।’
প্রধান প্রকৌশলীর নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি সড়ক সংস্কারের ব্যয় নিয়ে তদন্ত শুরু হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নকাজের তদারকি ও আর্থিক স্বচ্ছতার বিষয়টি আবার আলোচনায় এসেছে।
৮৭ লাখ টাকার সড়ক সংস্কার, কয়েক মাসেই ফের মেরামত
গত জুনে শাবিপ্রবির প্রধান ফটক থেকে শাহপরান হল পর্যন্ত প্রায় এক হাজার ৩০০ মিটার সড়ক সংস্কারে ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এ কাজের উপকরণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগ প্রকাশিত হয় সংবাদ মাধ্যমে।
একটি প্রতিবেদনে সড়কের বিভিন্ন অংশে ইট ও ভাঙা ইটের খোয়া ব্যবহারের কথা বলা হয়। একই প্রতিবেদনে আনুষ্ঠানিক ঠিকাদারি চুক্তি ছাড়া কাজ সম্পন্ন হওয়ার অভিযোগও তোলা হয়।
এর কয়েক মাসের মধ্যেই সড়কটির বিভিন্ন অংশ আবার মেরামতের প্রয়োজন দেখা দেয় বলে ২৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। জুনে ভারী বৃষ্টির পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান সড়কে জলাবদ্ধতা ও পানি জমে থাকার ঘটনাও সামনে আসে।
সড়ক সংস্কারের ব্যয় নিয়ে ভিসি অধ্যাপক ড. মো: খায়রুল ইসলাম বলেন, ‘এই কাজে ৮৭ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। অথচ এর চেয়ে বেশি কাজ সাড়ে পাঁচ লাখ টাকায় করা হয়েছে। এ নিয়ে শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন পক্ষ থেকে তদন্তের চাপ ছিল। তাই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে কমিটি গঠন করা হয়েছে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক দফা সড়ক মেরামতের বিবরণে প্রধান ফটক থেকে গোলচত্বর হয়ে শাহপরান হলের ফটক, সেখান থেকে সৈয়দ মুজতবা আলী হল ও গোলচত্বর থেকে ফাতেমাতুজ জোহরা হল পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার ২৮৩ মিটার সড়কের কাজের কথা উঠে এসেছে। এ কাজের মূল ব্যয় পাঁচ লাখ ৫০ হাজার টাকা, যন্ত্রপাতি কেনায় এক লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং অন্যান্য ব্যয় ও করসহ মোট বাজেট নয় লাখ ২২ হাজার টাকা বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক
শাবিপ্রবির ‘অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প-২’-এর ব্যয় প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকল্পটির পরিচালক হিসেবে জয়নাল আহমেদ চৌধুরীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়নে এ প্রকল্পের আওতায় একাধিক ভবন ও স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলছে।
প্রকল্পের অংশ হিসেবে ৫৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০ তলা প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এ ভবনে মেয়াদোত্তীর্ণ সিমেন্ট, তুলনামূলক কম মূল্যের রড ও নিম্নমানের পাথর-বালু ব্যবহারের অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। ঢালাই করা ছাদের কিছু স্থানে কংক্রিটের আচ্ছাদন কম থাকায় রড বেরিয়ে থাকার বিষয়টিও একটি প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হওয়া নিয়েও সংশয় প্রকাশ করা হয়েছিল।
৭৯ কোটি টাকার দুই ভবনেও অভিযোগ
অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প-২-এর আওতায় ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ক্লাব কমপ্লেক্স ও ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে বিদেশী শিক্ষার্থীদের আবাসিক হল নির্মাণের কাজ নিয়েও অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে।
গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দু’টি ভবনের নির্মাণকাজে মেয়াদোত্তীর্ণ সিমেন্ট, তুলনামূলক কম মূল্যের রড, মাটিমিশ্রিত বালু ও পাথরের সাথে মাটি-বালু মিশে থাকার অভিযোগ তোলা হয়। নির্মাণকাজে ব্যবহৃত রড ও বৈদ্যুতিক সংযোগের পাইপের মান নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করা হয়।
সামাজিক বিজ্ঞান ভবনে ফাটল, ইউসি ভবন নিয়েও উদ্বেগ
শাবিপ্রবির সামাজিক বিজ্ঞান ভবনে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর ফাটল দেখা দেয়ার বিষয়টি নিয়েও একাধিক সংবাদ মাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প-১-এর আওতায় প্রায় ২৩ কোটি ২৯ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত পাঁচতলা ভবনটির কাজ শুরু হয় ২০২০ সালের ১১ মার্চ। ২০২৪ সালের ৩০ জুন ভবনটি হস্তান্তর করা হয় বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনগুলোতে ভবনের সিঁড়ি, দেয়াল ও বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা দেয়ার কথা বলা হয়। ভবনটিতে সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি, সমাজকর্ম ও পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
এছাড়া ইউনিভার্সিটি সেন্টার (ইউসি) ভবন ও প্রথম ছাত্রী হলের বিভিন্ন অংশে ফাটল ও কাঠামোগত দুর্বলতার চিহ্ন থাকার অভিযোগও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
শহীদ রুদ্র সেন লেক ভরাট করে গ্যারেজ
শাবিপ্রবির শহীদ রুদ্র সেন লেকের একাংশ ভরাট করে গাড়ি রাখার গ্যারেজ নির্মাণের বিষয়টিও বিতর্ক তৈরি করেছে। প্রায় সাড়ে সাত কোটি টাকা ব্যয়ে খনন করা লেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জলাধার ও ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যের অংশ হিসেবে পরিচিত ছিল। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও চলতি বছরের জুনে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে লেকের অংশ ভরাট করে গ্যারেজ নির্মাণের বিষয়টি উঠে আসে।
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়, অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প-২-এর আওতায় পরিবহন বিভাগের জন্য দুইতলা গ্যারেজ নির্মাণ করা হচ্ছে। এ কাজে লেকের অংশ ভরাটের পাশাপাশি পাশের টিলার কিছু অংশ কাটার অভিযোগও ওঠে।
বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্টদের বরাতে একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্মাণাধীন গ্যারেজে প্রায় ২২টি গাড়ি রাখা যাবে, অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন পুলে গাড়ি ছিল ৪২টি। এ কারণে গ্যারেজের ধারণক্ষমতা ও প্রকল্পের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।
বিগত প্রশাসনে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ার অভিযোগ
সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. সরওয়ারউদ্দীন চৌধুরীর সময়ে সাবেক প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. সাজেদুল করিম ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো: জয়নাল আহমেদ চৌধুরীকে ঘিরে ক্যাম্পাসে একটি শক্তিশালী বলয় বা সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার আলোচনা ছিল।
অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষকবলয় ও বিভিন্ন মহলের সাথে সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম ও উন্নয়ন প্রকল্পে প্রভাব বিস্তার করতেন সাবেক প্রো-ভিসি সাজেদুল করিম ও প্রকল্পের সাবেক পরিচালক ও প্রধান প্রকৌশলী জয়নাল আহমেদ চৌধুরী। প্রকল্প পরিচালক হিসেবে জয়নাল আহমেদ চৌধুরী দায়িত্ব পালন করলেও প্রকল্পের বিভিন্ন বিষয়ে সাবেক প্রো-ভিসির পরোক্ষ নির্দেশনা ও প্রভাব ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় সদ্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল হওয়া বিকাশ চন্দ্র দাশের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনিও এই বলয়ের একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়া প্রকল্পের বিভিন্ন কাজের অর্থ বরাদ্দের সময় সাবেক প্রো-ভিসি সাজেদুল করিম সাবেক ভিসির কার্যালয়ে উপস্থিত থাকতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অর্থ বরাদ্দের সময় প্রধান প্রকৌশলীর সাথে তার এমন উপস্থিতিকে সাবেক ভিসি ভালো চোখে দেখতেন না বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।
একই সময়ে প্রধান প্রকৌশলী জয়নাল আহমেদ চৌধুরীর সাথে সম্পর্ক আরো দৃঢ় করার উদ্দেশ্যে মহান স্বাধীনতা দিবসের আলোচনা অনুষ্ঠানে তাকে ‘বিশেষ অতিথি’ করার অভিযোগও রয়েছে সাবেক প্রো-ভিসির বিরুদ্ধে। ওই অনুষ্ঠানে একজন কর্মকর্তাকে অতিথি করাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত শিষ্টাচার ও আনুষ্ঠানিকতার পরিপন্থী উল্লেখ করে বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের একাংশ অনুষ্ঠান বর্জন করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাবেক প্রো-ভিসির নির্দেশেই জয়নাল আহমেদ চৌধুরীকে অতিথি করা হয়েছিল, যাতে তিনি নিজের প্রশাসনিক অবস্থান সুসংহত করতে পারেন— এমন আলোচনাও ছিল ক্যাম্পাসে।
অভিযোগ রয়েছে, ভিসি হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে সাজেদুল করিম প্রধান প্রকৌশলী জয়নাল আহমেদ চৌধুরীকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে চলতেন। এর পেছনে কারণ হিসেবে ক্যাম্পাসে এমন কথাও প্রচারিত হতো যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের সাথে জয়নাল আহমেদ চৌধুরীর যোগাযোগ রয়েছে।
এছাড়া নিজের কার্যালয় রেখে সাবেক প্রো-ভিসির কার্যালয়ে প্রায় প্রতিদিন দীর্ঘ সময় অবস্থান করতেন জয়নাল আহমেদ চৌধুরী। বিপরীতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল ও বিভাগ থেকে প্রকৌশল দফতরে উন্নয়ন ও সংস্কারকাজের জন্য একাধিকবার আবেদন করা হলেও সেগুলো দীর্ঘদিন পড়ে থাকত বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ।
কাজের জন্য বারবার চিঠি দিয়েও অগ্রগতি সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যেত না। এমনকি প্রধান প্রকৌশলীকে ফোন করেও সাড়া পাওয়া যেত না বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের একটি অংশের মধ্যে প্রকৌশল দফতরের কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনেও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে জয়নাল আহমেদ চৌধুরীর প্রভাব ও আধিপত্যের বিষয়টি উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, তার এই প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে সাবেক প্রো-ভিসি সাজেদুল করিমের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রশাসনিক সমর্থন ছিল। এছাড়া বিএনপিপন্থী কর্মকর্তাদের একাংশ তাকে ‘চিফ স্যার’ বা ‘বস’ বলে সম্বোধন করতেন।
ক্যাম্পাসের বিভিন্ন মহলের সাথে সম্পর্ক ও প্রশাসনিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে জয়নাল আহমেদ চৌধুরী উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। একইভাবে প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে অবসরে যাওয়ার কথা থাকলেও সাবেক প্রো-ভিসির প্রশাসনিক প্রভাববলয়ের সহায়তায় তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ দুই বছর বাড়ানো হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করেছে।
আরো অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের কাজে জয়নাল আহমেদ চৌধুরী ঢাকায় গেলে সাবেক প্রো-ভিসি সাজেদুল করিমও প্রায় একই সময়ে ঢাকায় যেতেন। বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আলোচনা ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক ক্ষমতা ও উন্নয়ন প্রকল্পের দায়িত্ব কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত প্রভাবের অধীন হয়ে পড়া গ্রহণযোগ্য নয়।
তাদের মতে, বিগত প্রশাসনের সময়ে প্রকল্পের অর্থ ব্যয়, কাজের মান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও প্রভাব বিস্তারের যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা জরুরি। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ও সম্পদ নিয়ে কোনো ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
অভিযোগের বিষয়ে সাবেক প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. সাজেদুল করিম বলেন, ‘প্রধান প্রকৌশলী জয়নাল আহমেদ চৌধুরীর সাথে আমার যোগাযোগ ছিল উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেয়ার প্রয়োজনে। ২০২৫ সালের ৩০ জুনের মধ্যে প্রকল্পের নির্দিষ্ট অগ্রগতি অর্জন করতে না পারলে প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। এ কারণে মন্ত্রণালয় থেকে আমাকে প্রতিদিন প্রকল্পের অগ্রগতির সচিত্র প্রতিবেদন পাঠানোর দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। প্রতিবেদন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে জয়নাল আহমেদ চৌধুরী আমার কক্ষে আসতেন, আবার প্রয়োজন হলে আমিও তাকে ডাকতাম। এখানে অন্য কোনো বিষয় ছিল না।’
প্রকল্পের বিভিন্ন কাজের চেক স্বাক্ষর বা দরপত্র-সংক্রান্ত বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমার প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও সঠিক নয়। ২০২৫ সালের ৩০ জুনের পর প্রকল্পের কোনো কাজে আমি আর যুক্ত ছিলাম না। ওই সময়ের পর প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কোনো প্রকৌশলী বা দফতরপ্রধানও আমার কক্ষে আসেননি। দরপত্র-সংক্রান্ত বিষয়ে আমি কখনো সংশ্লিষ্ট কক্ষে যাইনি। কোন দরপত্র কখন দেয়া হয়েছে, সে বিষয়েও আমার প্রত্যক্ষ কোনো জ্ঞান নেই।’
মহান স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে জয়নাল আহমেদ চৌধুরীকে বিশেষ অতিথি করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ সিদ্ধান্ত আমার ছিল না। অনুষ্ঠানে কে প্রধান অতিথি বা বিশেষ অতিথি হবেন, সেটি নির্ধারণের দায়িত্ব ছিল সংশ্লিষ্ট উদযাপন কমিটির। ওই সময় আমি একটি সরকারি কাজে ঢাকায় ছিলাম। পরে তার নাম অতিথি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি জানতে পেরে আয়োজকদের বলেছিলাম, পরিবর্তনের সুযোগ থাকলে তা পরিবর্তন করতে, যাতে অযথা বিতর্ক তৈরি না হয়। এ ঘটনায় আমার তিল পরিমাণও সংশ্লিষ্টতা ছিল না।’
জয়নাল আহমেদ চৌধুরীর সাথে একই সময়ে ঢাকায় যাতায়াতের বিষয়টি নিয়ে তিনি বলেন, ‘দাফতরিক কাজের সাথে সম্পর্কিত। মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সভায় ভিসি ও প্রকল্প পরিচালকের অংশগ্রহণের নির্দেশনা থাকত। অনেক সময় ভিসি নিজে সভায় যেতে না পারায় আমাকে পাঠাতেন। সে কারণে আমাকে ঢাকায় যেতে হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সভায় অংশ নেয়া আর ব্যক্তিগত কাজে কারো সাথে ঢাকা যাওয়া এক বিষয় নয়। আমি ব্যক্তিগত কারণে জয়নাল আহমেদ চৌধুরীর সাথে ঢাকা যেতাম— এমন অভিযোগ সঠিক নয়।’
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিলের বিষয়ে অধ্যাপক সাজেদুল করিম বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার আপত্তি কোনো ব্যক্তির পক্ষে বা বিপক্ষে নয়। বিশ্ববিদ্যালয় যখন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তখন এর পেছনে একটি নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক উন্নয়ন প্রকল্প চলমান ছিল। সেগুলো এগিয়ে নেয়ার জন্য অভিজ্ঞ প্রকৌশলীর প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করেই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এ ধরনের নিয়োগ সর্বোচ্চ দুই বছরের জন্য হতে পারত এবং প্রতি বছর তা নবায়নের ব্যবস্থা ছিল।’
তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চাইলে চুক্তি বাতিল করতে পারে। তবে যে প্রয়োজন ও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে সিন্ডিকেট চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সেই প্রয়োজন এখনো বহাল রয়েছে কি-না, তা পর্যালোচনা করা প্রত্যাশিত ছিল। সম্মানিত সিন্ডিকেট সদস্যদের মধ্যে যেকোনো একজন অন্তত সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর প্রেক্ষাপট ও বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গভাবে ওয়াকিবহাল হওয়ার পরেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন— সেটাই কাঙ্ক্ষিত ছিল।’
তিনি আরো বলেন, ‘সিন্ডিকেট একটি প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃপক্ষ। এর ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভূমিকা কোনোভাবেই খর্ব করা উচিত নয়। সিন্ডিকেটের ক্ষমতা খর্ব হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই সিন্ডিকেটের ক্ষমতা ও মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখা এবং এর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করাই প্রত্যাশিত। এর ব্যত্যয় ঘটলে বিশ্ববিদ্যালয় নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’
সড়ক সংস্কারের ব্যয় তদন্তে কমিটি
বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ সড়ক সংস্কারে ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ের বিষয়টি তদন্তে চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সভাপতি প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. রবিউল ইসলাম। সদস্যসচিব ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার কালাম আহমেদ চৌধুরী। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন— সিন্ডিকেট সদস্য আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী ও সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. শহিদুর রহমান।
কমিটির তদন্তে সড়ক সংস্কারের প্রকৃত ব্যয়, কাজের পরিমাণ, উপকরণের মান, দরপত্র প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাইয়ের সুযোগ রয়েছে। তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করা হলে ব্যয় নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া যেতে পারে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রধান প্রকৌশলী জয়নাল ইসলাম চৌধুরীর মোবাইলফোনে একাধিকবার ফোন দিলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। পরে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তার কোনো সাড়া মেলেনি।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








