
স্বপ্ন ছিল বিচারকের আসনে বসার। সেই স্বপ্ন পূরণে দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাসকে সঙ্গী করে এগিয়ে গেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী আরিফুল হক সিয়াম। নানা চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় এবার প্রথম স্থান অর্জন করেছেন তিনি।
সিয়ামের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নিয়মিত পড়াশোনা, নিজের দুর্বলতা চিহ্নিত করে তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা এবং পরিবারের অনুপ্রেরণা। জজ নিয়োগ পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার অনুভূতি, প্রস্তুতির কঠিন সময়, সফলতার পেছনের অনুপ্রেরণা ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য নিয়ে মুখোমুখি হয়েছেন তিনি।
বিজেএস পরীক্ষায় প্রথম হওয়া সিয়ামের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নয়া দিগন্তের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ফজলে রাব্বি পরশ।
প্রশ্ন: বিচারক হওয়ার স্বপ্ন কখন এবং কিভাবে তৈরি হয়েছিল?
আরিফুল হক সিয়াম: জজ হওয়ার ইচ্ছাটা হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। আইন পড়তে শুরু করার পর থেকেই বিচার বিভাগ আমাকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করত। একজন বিচারক একইসাথে আইন, যুক্তি, ন্যায়বোধ ও মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ ধারণ করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বিভিন্ন মামলার রায়, বিচারিক সিদ্ধান্ত ও বিচারকদের ভূমিকা নিয়ে পড়তে গিয়ে ধীরে ধীরে মনে হয়েছে, বিচারক হিসেবে নিরপেক্ষভাবে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দায়িত্বটি আমার চিন্তা ও ব্যক্তিত্বের সাথে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
প্রশ্ন: প্রথম হওয়ার অনুভূতি কেমন ছিল?
সিয়াম: যখন জানতে পারলাম যে আমি দেশব্যাপী প্রথম হয়েছি, প্রথমে কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন বিশ্বাসই হচ্ছিল না। এরপর আনন্দের পাশাপাশি আল্লাহর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা অনুভব করেছি। মনে হয়েছে, এই ফল শুধু আমার একার নয়; আমার পরিবার, শিক্ষক, শুভাকাঙ্ক্ষী ও পুরো যাত্রায় যারা আমাকে সহযোগিতা করেছেন, সবার সম্মিলিত অবদান এর সাথে জড়িয়ে আছে।
প্রশ্ন: প্রথম হওয়ার খবরটি সবার আগে কাকে জানিয়েছিলেন?
সিয়াম: পাশের রুমে মা ছিলেন। সবার আগে তাকেই জানিয়েছি। বাবা বাইরে কাজে ছিলেন। মাকে জানানোর পর বাবাকে ফোন করে বিষয়টি জানিয়েছি। সাফল্যের খবর প্রিয় মানুষগুলোর সাথে ভাগ করে নেয়ার মুহূর্তটি আমার কাছে খুবই আনন্দের ছিল।
প্রশ্ন: প্রস্তুতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে কঠিন সময় কোনটি ছিল?
সিয়াম: আমার কাছে সবচেয়ে কঠিন ছিল দীর্ঘ সময় ধরে একই লক্ষ্য ধরে রাখা। একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি কয়েক মাসের বিষয় নয়। দীর্ঘ সময় নিয়মিত পড়াশোনা করা, নিজের দুর্বলতা নিয়ে কাজ করা এবং বারবার নিজেকে যাচাই করার বিষয়।
কখনো পড়াশোনা করেও মনে হয়েছে, হয়তো যথেষ্ট হচ্ছে না। আবার কোনো বিষয় প্রত্যাশামতো ভালো হয়নি। তখন হতাশ না হয়ে কোথায় ঘাটতি আছে, সেটা চিহ্নিত করে আবার শুরু করতে হয়েছে। আমার কাছে প্রস্তুতির সবচেয়ে কঠিন অংশ ছিল শুধু পড়াশোনা নয়; বরং নিজের ওপর বিশ্বাস ধরে রাখা।
প্রশ্ন: এই সাফল্যের জন্য কাকে বিশেষ কৃতিত্ব দিতে চান?
সিয়াম: একজনকে আলাদা করে কৃতিত্ব দেয়া আমার জন্য কঠিন। কারণ এই সাফল্যের পেছনে পরিবারের দোয়া, শিক্ষকদের দিকনির্দেশনা এবং বিভিন্ন সময়ে পাওয়া অনেক মানুষের সহযোগিতা রয়েছে। তবে সবশেষে কৃতিত্ব অবশ্যই আল্লাহর। আল্লাহ চেয়েছেন বলেই তিনি আমাকে এই সম্মান দিয়েছেন।
প্রশ্ন: যারা জজ নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করবেন, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
সিয়াম: প্রথমেই বলব, এটাকে শুধু একটি চাকরির পরীক্ষা হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি হিসেবে নিতে হবে। আইনের মৌলিক বিষয়গুলো খুব ভালোভাবে বুঝতে হবে। শুধু ধারা মুখস্থ করলে হবে না; ধারাটির উদ্দেশ্য, প্রয়োগ, আদালতের সিদ্ধান্ত এবং একটি বিধানের সাথে অন্য বিধানের সম্পর্ক বুঝতে হবে।
দ্বিতীয়ত, লিখিত পরীক্ষার জন্য লেখার অনুশীলন করতে হবে। ভালো জানা আর পরীক্ষার খাতায় ভালোভাবে উপস্থাপন করা এক বিষয় নয়।
তৃতীয়ত, পড়াশোনায় ধারাবাহিকতা রাখতে হবে। প্রতিদিন ১২-১৪ ঘণ্টা পড়ার লক্ষ্য করে তিন দিন পর থেমে যাওয়ার চেয়ে প্রতিদিন অল্প হলেও নিয়মিত পড়া বেশি কার্যকর।
চতুর্থত, নিজের ভুলকে ভয় পাওয়া যাবে না। মডেল টেস্ট, লিখিত পরীক্ষা বা মক ভাইভায় কোথায় ভুল হচ্ছে, তা চিহ্নিত করে সংশোধন করতে হবে।
সবশেষে বলব, অন্যের প্রস্তুতির সাথে নিজের প্রস্তুতির তুলনা না করে নিজের গতিটা ধরে রাখতে হবে। এই পরীক্ষায় মেধার পাশাপাশি ধৈর্য, ধারাবাহিকতা ও আত্মবিশ্বাসও গুরুত্বপূর্ণ। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সৃষ্টিকর্তার কাছে চাওয়া। নিয়মিত তার কাছে চাইতে হবে।
প্রশ্ন: ভবিষ্যতে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আপনার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য কী?
সিয়াম: আমার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হবে একজন ন্যায়পরায়ণ, নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীল বিচারক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। আমি মনে করি, ন্যায়বিচার শুধু সঠিক রায় দেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সময়মতো বিচার দেয়া, পক্ষপাতমুক্ত থাকা, আইন সঠিকভাবে প্রয়োগ করা এবং বিচারপ্রার্থী মানুষের প্রতি মানবিক থাকা— সবই বিচারিক দায়িত্বের অংশ।
আমি বিশ্বাস করি, একজন বিচারকের হাতের কলম একজন যোদ্ধার হাতের তরবারির চেয়েও বেশি ভারী। আল্লাহ যেন আমাকে সেই দায়িত্ব ও ভার বহন করার শক্তি দেন— সবার কাছে এই দোয়া চাই।
প্রশ্ন: সময় দেয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। ভবিষ্যতের জন্য আপনার প্রতি শুভকামনা।
সিয়াম: আপনাকেও ধন্যবাদ। পাঠকদের প্রতিও আন্তরিক শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।








