
সপ্তাহের ৭দিন কর্মব্যস্ততার পর শুক্রবার ছুটির দিনে শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ায় নিত্যপণ্যের বাজারগুলোতে ভীড় দেখা যায় নিয়মিত। মাছ, সবজি ও নিত্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য পণ্যের সাথে গোশতও কিনে নিয়ে যেতে দেখা যায় শ্রমজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষকে।
পরিবারের সদস্যদের মুখে ভাল খাবার তুলে দিতেই কসাইয়ের দোকান থেকে কিনে নেন গরু, মহিষ কিংবা খাসির গোশত। কিন্তু পরিবারের জন্য যে গোশত রান্না হলো কতটুকু স্বাস্থ্যসম্মত তা নিশ্চিত নন কেউই। কারণ শিল্পাঞ্চলের কসাইয়ের দোকানগুলোতে যে গোশত বিক্রি হয় তা সুস্থ স্বাভাবিক কি না সেটা তদারকি করার মতো কেউ নেই। কোনো রকম পরীক্ষা ছাড়াই জবাই হচ্ছে পশু। তবে এটা তদারকির সরকারি দফতর থাকলেও লোকবলের অভাব দেখিয়েই দায় সারছেন তারা।
শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ায় ছোট বড় মিলিয়ে শতাধিক বাজার রয়েছে। আর অধিকাংশ বাজারেই বিক্রি হচ্ছে গরুর গোশত কিংবা রয়েছে কসাইয়ের দাওকান। নিয়ম অনুযায়ী পশু জবাইয়ের পূর্বে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কাছ থেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে সিলমোহর দেয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা পালন করা হচ্ছে না। পুরো ব্যবস্থাটিই যেন অভিভাবকহীন। সরকারি ভেটেরিনারি সার্জনদের নিয়মিত পরিদর্শন না থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীদের এমন প্রতারণা এখন স্থায়ী রূপ নিয়েছে।
যার ফলে আশুলিয়ার শত শত রেস্তোরাঁ ও সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে প্রতিনিয়ত পৌঁছে যাচ্ছে অনিরাপদ ও স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ গোশত। শুধু তাই নয়, রোগাক্রান্ত পশুর গোশতের মাধ্যমে অ্যানথ্রাক্সের মতো প্রাণঘাতী ব্যাকটেরিয়ার স্পোর বাসা বাড়িতে পৌঁছে যেতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
সরেজমিনে আশুলিয়ার জিরানী বাজার, ইকরা বাজার, বকিভদ্র বাজার, বাইপাইল, জামগড়াসহ বিভিন্ন ঘুরে দেখা গেছে, এসব বাজারে নির্দিষ্ট কোনো কসাইখানা নেই। যার ফলে খোলা জায়গায় কিংবা গোশতের দোকানের সামনে নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর স্থানেই পশু জবাই করে থাকে। পরে সেখানেই কাটাকাটির কাজটি করতে দেখা যায়। আর এতে করে সুস্থ্য পশু জবাই করা হয়েছে কি না কেউ নিশ্চিত নন।
এছাড়া আশুলিয়ার পাঁচটি ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, ইউনিয়ন পর্যায়ে কোনো ভবন বা পশু জবাইয়ের নির্দিষ্ট কোনো স্থান খুঁজে পাওয়া যায়নি। এমনকি সাভার উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে কবে পরীক্ষা হয়েছে তা জানেন না কেউ। এতে কোনো পরীক্ষা কিংবা যাচাই-বাছাই ছাড়া রাতের আঁধারে হচ্ছে পশু জবাই।
এছাড়া জবাইখানা ও কসাইখানার অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের কারণে ফিকেল ব্যাকটেরিয়াসহ বিভিন্ন প্যাথোজেনিক জীবাণু সরাসরি মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছে খাদ্য বিষক্রিয়া তৈরি করছে।
ইকরা বাজারে গরুর গোশত কিনতে আসা হাশেম রেজা জানান, মাসে অন্তত দুইবার পরিবারের সবাইকে নিয়ে গোশত খাওয়ার জন্য এখান থেকে গোশত নিয়ে থাকি। কিন্তু সুস্থ্য গরুর গোশত নিলাম, নাকি অসুস্থ্য গরুর নিলাম জানা থাকে না। এছাড়া ষাড় গরু বলে গাভীর গোশত ধরিয়ে দিল কি না সেটাও বোঝার কোনো উপায় নেই।
তিনি জানান, উপজেলা প্রাণি সম্পদ থেকে তদারকি বাড়ালে এধরণের বিরম্বনায় হয়তো পড়তে হবে না।
বলিভদ্র বাজারে খাসির গোশত কিনতে আসা এরশাদুল ইসলাম বলেন, ‘এখান থেকে কসাইরা খাসির গোশত বলে ভেড়ার গোশত দিল কিনা বোঝার কোনো উপায় নেই। কিন্তু বাধ্য হয়েই নিচ্ছি।’
আশুলিয়ার জিরানী বাজার এলাকার রেস্তোরাঁ মালিক আব্দুর রহমান জানান, আমাদের এলাকায় নির্দিষ্ট কোন কসাইখানা বা পশুতে সরকারি সিল মারার ব্যবস্থা না থাকায় তারা বাধ্য হয়ে কসাইদের কাছ থেকেই গোশতই কেনেন। গোশতের মান খারাপ না ভাল বোঝার উপায় নেই। খারাপ হলে দুর্নাম হয় তাদের, আর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে সাধারণ মানুষ।
এদিকে, বিভিন্ন গোশতের দোকানদার জানান, তারা পশু গোশতের দোকানের পাশেই জবাই করেন। পশু জবাইয়ের আগে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা জরুরি। তবে এ ব্যাপারে কোনো কর্মকর্তা কিংবা পশু দফতর থেকে কোনো লোক কখনো আসেনি।
সাভার উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা: মো: সেলিম জাহান জানান, সাভারের প্রায় ২০ লাখ জনসংখ্যার বিপরীতে সরকারি অর্গানোগ্রামে মাত্র একজন ভেটেরিনারি সার্জন রয়েছেন। এ বিশাল জনসংখ্যার জন্য প্রতিদিন যে পরিমাণ পশু জবাই করা হয়, তা এককভাবে পরীক্ষা করে সার্টিফিকেট দেয়া অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার। অবকাঠামোগত উন্নয়নে আধুনিক কসাইখানা স্থাপন, পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা ও ভেটেরিনারি সার্জনসহ প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগের ওপর জোর দেন তিনি।
ঢাকা জেলা কার্যালয়ের নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা মো: নাজমুল ইসলাম জানান, পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও জবাইয়ের পূর্বে তদারকির প্রাথমিক দায়িত্ব প্রাণিসম্পদ দফতরের। তবে জবাইকৃত পশু যখন প্রক্রিয়াজাত হয়ে খাদ্য বা গোশত হিসেবে বাজারে আসে, তখন নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে পারে। কোনো নির্দিষ্ট ও সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকলে তাৎক্ষণিক যৌথ অভিযান চালিয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: সাইফুল ইসলাম জানান, সাভারের বিশাল জনসংখ্যার চাহিদা বিবেচনায় ইউনিয়ন পর্যায়েও ছোট ছোট ‘স্লটার হাউস’ (কসাইখানা) তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। একই সাথে খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে টাস্কফোর্সের মাধ্যমে গোশতের বাজারগুলোতে নিয়মিত নজরদারি জোরদার করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য ও ইনফরম্যাটিক্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আয়েশা আহমেদ বলেন, ‘আমাদের স্থানীয় খোলা বাজারগুলোতে যে কাঁচা গোশত আসছে তার কোনো স্বাস্থ্যগত নিশ্চয়তা নেই। সুস্থ পশু জবাই করা হচ্ছে কি না বা এর কোনো বৈজ্ঞানিক সার্টিফিকেশন হচ্ছে কি না, তা জানার কোনো উপায় নেই। অ্যানথ্রাক্স একটি অত্যন্ত মারাত্মক স্পোর-ফর্মিং ব্যাকটেরিয়া। এই স্পোর সহজে ধ্বংস হয় না ও এগুলো দূর করতে উচ্চ তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়। কোনো খামারে অ্যানথ্রাক্স দেখা দিলে পুরো খামার জীবাণুমুক্ত বা স্টেরিলাইজ করতে হয়। ফলে পরীক্ষা ছাড়া আসা গোশত স্পোর-মুক্ত কি না তা ভোক্তারা জানতে পারছেন না।’
পরীক্ষা করাটা অত্যন্ত জরুরি বলেও তিনি জানান।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








