এশিয়ার পুঁজিবাজারে আবারো বড় ধরনের দরপতন হয়েছে
এশিয়ার পুঁজিবাজারে আবারো বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। সংগৃহীত ছবি

প্রযুক্তি খাতের শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের বিক্রির চাপ অব্যাহত থাকায় শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) এশিয়ার পুঁজিবাজারে আবারো বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। এ খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যাওয়ায় বাজারে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। 

Advertisement

অন্যদিকে, ঝুঁকি এড়িয়ে নিরাপদ বিনিয়োগের প্রবণতা বাড়ায় জাপানি ইয়েন ও সরকারি বন্ডের চাহিদা বেড়েছে।

গত জুনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোর পর থেকেই এসব শেয়ারে দরপতন শুরু হয়। 

কোম্পানিগুলোর প্রকৃত মূল্যায়ন নিয়ে উদ্বেগ, অবকাঠামো ও হার্ডওয়্যারে বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে পর্যাপ্ত মুনাফা অর্জনের অনিশ্চয়তা এবং সাম্প্রতিক সময়ে ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা এসব শেয়ার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।

এর সাথে ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে ওঠায় মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়িয়েছে। একইসাথে বিভিন্ন দেশের সরকারের ঋণ নেয়ার ব্যয়ও কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

গত কয়েক প্রান্তিকে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শক্তিশালী আর্থিক ফলাফল এসব উদ্বেগ কিছুটা কমিয়েছিল। 

তবে বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগকারীরা এখন আগের চেয়ে আরো ভালো ফলাফল আশা করছেন। ফলে কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর ধরে রাখতে প্রত্যাশার চেয়েও শক্তিশালী আয় ও প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস প্রয়োজন হচ্ছে।

চলতি সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা এবং সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন সরঞ্জাম নির্মাতা ল্যাম রিসার্চ প্রত্যাশার চেয়ে ভালো আর্থিক ফলাফল প্রকাশ করেছে। কিন্তু এরপরও কোম্পানি দু’টির শেয়ারের দাম কমেছে।

ফরেক্স ডটকমের বিশ্লেষক ফাওয়াদ রাজাকজাদা বলেন, ‘ইতিবাচক খবরও এখন উপেক্ষা করা হচ্ছে। শেয়ারের মূল্যায়ন আগে থেকেই অনেক বেশি থাকলে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সেই প্রত্যাশার সাথে না মিললে শুধু ভালো আর্থিক ফলাফল যথেষ্ট নয়। বিনিয়োগকারীরা এখন অনেক কম ছাড় দিচ্ছেন।’

প্রযুক্তি খাত থেকে বিনিয়োগকারীদের অর্থ সরিয়ে নেয়ার ফলে শিল্প খাতের কিছু কোম্পানি লাভবান হচ্ছে। 

এআইকেন্দ্রিক বিনিয়োগের উত্থানের সময় যেসব কোম্পানি তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত ছিল, সেগুলোর শেয়ারে এখন আগ্রহ বাড়ছে। এ কারণে চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ডাও জোন্স সূচক ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও নাসডাক ও এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক কমেছে।

নিউইয়র্কের বাজারে দরপতনের প্রভাব এশিয়ার বাজারগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে।

এআই বিনিয়োগের উত্থানে সামনের সারিতে থাকা দক্ষিণ কোরিয়ার পুঁজিবাজারে এবার সবচেয়ে বেশি চাপ দেখা গেছে। শুক্রবার দেশটির শেয়ারবাজারের প্রধান সূচক কসপি ২ শতাংশের বেশি কমেছে। কঠিন একটি সপ্তাহের শেষে এ দরপতন বাজারের দুর্বলতা আরো স্পষ্ট করেছে।

চিপ নির্মাতা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারের অন্যতম বড় কোম্পানি এসকে হাইনিক্সের যুক্তরাষ্ট্রে লেনদেন হওয়া শেয়ারের দাম ৮ শতাংশের বেশি কমেছে। 

কোম্পানিটি জানিয়েছে, ‘বাজার পরিস্থিতি ও শেয়ারদরের প্রবণতা’ বিবেচনায় তাদের মার্কিন সহযোগী প্রতিষ্ঠান সলিডাইমের প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) পরিকল্পনা বাতিল করা হয়েছে।

প্রযুক্তি খাতের শেয়ারের আধিক্য থাকায় টোকিওর নিক্কেই ২২৫ সূচকেও উল্লেখযোগ্য পতন হয়েছে। একইসাথে হংকং, সাংহাই, সিডনি, সিঙ্গাপুর, ওয়েলিংটন, জাকার্তা ও ম্যানিলার শেয়ারবাজারেও দরপতন দেখা গেছে। টাইফুন চ্যাম্পি এগিয়ে আসায় তাইপের পুঁজিবাজার শুক্রবার বন্ধ ছিল।

শেয়ারবাজারে দরপতনের বিপরীতে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত সম্পদের চাহিদা বেড়েছে। জাপানে মূল্যস্ফীতির হার বাড়ার সরকারি তথ্য প্রকাশের পর দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবারো সুদের হার বাড়াতে পারে—এমন প্রত্যাশায় ডলারের বিপরীতে ইয়েনের দাম বেড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সুদের হারের বড় ব্যবধান এবং জাপানের সরকারি আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডলারের বিপরীতে ইয়েন দুর্বল ছিল।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ডের চাহিদাও বেড়েছে। ফলে এসব বন্ডের মুনাফার হার (ইল্ড) ২ দশকের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে নেমে এসেছে।

ন্যাশনাল অস্ট্রেলিয়া ব্যাংকের বিশ্লেষক গ্যাভিন ফ্রেন্ড বলেন, ‘এআই ও প্রযুক্তি খাত নিয়ে পরিচিত উদ্বেগের পাশাপাশি তেল ও জ্বালানির ক্রমবর্ধমান দাম বিনিয়োগকারীদের আবারো বন্ডের দিকে ঝুঁকতে উৎসাহিত করছে।’

তিনি আরো বলেন, তেলের দাম বাড়তে থাকলেও বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদের সন্ধান করছেন। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ডের মুনাফার হার কমে আসার প্রবণতা এতে আরো গতি পেয়েছে। 

তার ভাষ্য অনুযায়ী, দুই বছর ও ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড এক মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।

অস্ট্রেলিয়ার কমনওয়েলথ ব্যাংকের বিশ্লেষক ক্যারল কং বলেন, প্রযুক্তি খাতের শেয়ারে দরপতন অব্যাহত থাকলে জাপানি ইয়েন আরো শক্তিশালী হতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের নতুন করে সৃষ্ট উদ্বেগ বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। মে মাসের পর প্রথমবারের মতো ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৫ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে।

হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী নিরাপত্তা দিতে থাকলে ওই অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলার হুমকি দিয়েছে ইরান। এ হুমকির পর তেলের বাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

সূত্র : বাসস