ইন্দোনেশিয়ায় দাবানল
ইন্দোনেশিয়ায় দাবানল। সংগৃহীত

ইন্দোনেশিয়ায় কয়েক মাস ধরে চলা দাবানলে আঞ্চলিকভাবে ঘন ধোঁয়াশা ছড়িয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে দাবানল ও এর ফলে সৃষ্ট বায়ুদূষণের জন্য কোম্পানিগুলোকে দায়ী করা যায় কি না, তা নিয়ে আলোচনা জোরালো হচ্ছে।

Advertisement

ইন্দোনেশিয়ায় সাধারণত শুষ্ক মৌসুমে নিয়মিত দাবানল দেখা দেয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বছরের পর বছর বন উজাড় ও চাষাবাদের জন্য পিটভূমি বা পিটযুক্ত জলাভূমি শুকিয়ে ফেলার কারণে আগে আগুনের ঝুঁকি কম ছিল, এমন এলাকাও এখন দাবানলের ঝুঁকিতে পড়েছে।

ব্যাংকক থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।

অনেকেই এই দূষণ বৃদ্ধির জন্য কোম্পানিগুলোকে দায়ী করার দাবি জানিয়েছেন।

এ বছর এল নিনোর তীব্র প্রভাব ও এর ফলে সৃষ্ট খরার কারণে দাবানল ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বন উজাড় পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা নুসানতারা অ্যাটলাসের তথ্য অনুযায়ী, আগুনে প্রায় ২০ লাখ হেক্টর জমি পুড়ে গেছে।

বন ও পিটভূমির পাশাপাশি বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সরবরাহব্যবস্থার সাথে যুক্ত পাম তেল ও কাঠের বাগানেও আগুন ছড়িয়ে পড়েছে।

নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠন নিয়মিতভাবে এসব দাবানলের জন্য কোম্পানিগুলোকে দায়ী করে আসছে। এ ক্ষেত্রে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বাগানে শনাক্ত হওয়া তথাকথিত ‘হটস্পট’ বা আগুনের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর কথা তুলে ধরা হচ্ছে। 

এসব বাগানকে কখনো কখনো ‘কনসেশন’ বা নির্দিষ্ট মেয়াদে বরাদ্দ দেয়া জমি বলা হয়।

পরিবেশবাদী সংগঠন ওয়ালহি (ডব্লিউএএলএইচআই) জানায়, নাসার অগ্নিকাণ্ডবিষয়ক তথ্য ব্যবহার করে তারা ইন্দোনেশিয়াজুড়ে উচ্চমাত্রার নির্ভরযোগ্যতার সাথে শনাক্ত করা হটস্পটগুলোর মানচিত্র তৈরি করেছে। এতে দেখা গেছে, প্রায় ৫০ শতাংশ হটস্পট বিভিন্ন কোম্পানির বরাদ্দ পাওয়া জমির ভেতরে অবস্থিত।

চলতি মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংগঠনটি শনাক্ত হওয়া হটস্পটের সংখ্যার ভিত্তিতে কাঠ ও পাম তেল উৎপাদনের সাথে যুক্ত ৪০টি বরাদ্দপ্রাপ্ত জমির তালিকা প্রকাশ করেছে।

ওয়ালহির বন ও বাগানবিষয়ক প্রচারাভিযানের কর্মী উমি মারুফাহ বলেন, ‘এটি একটি কাঠামোগত সমস্যা। এসব কোম্পানির কর্মকাণ্ড ও চর্চার কারণেই এমন ঘটনা ঘটে।’

সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশের সরকার থেকেও চাপ বাড়ছে। সিঙ্গাপুর আন্তঃসীমান্ত ধোঁয়াশা দূষণ আইনের আওতায় ১০টি কোম্পানিকে ‘প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নোটিশ’ দিয়েছে।

এসব নোটিশে কোম্পানিগুলোকে তাদের জমিতে আগুন নিয়ন্ত্রণ, অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ ও এ বিষয়ে কর্মপরিকল্পনা জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নির্দেশনা না মানলে জরিমানাসহ আইনি পদক্ষেপের মুখে পড়তে পারে প্রতিষ্ঠানগুলো।

সিঙ্গাপুরের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী কে শানমুগাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে দায় কার, তা নিয়েও আমাদের স্পষ্ট থাকতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘এটি নিছক প্রাকৃতিক ঘটনা নয়; বরং মুনাফা অর্জনে কোম্পানিগুলোর কর্মকাণ্ডের কারণেই এ সমস্যা তৈরি হয়েছে।’

আইনি দায়বদ্ধতা

এদিকে, আগুনের ঘটনায় অভিযুক্ত কয়েকটি কোম্পানি নিজেদের দায় অস্বীকার করেছে।

সিঙ্গাপুরের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত পাম তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ফার্স্ট রিসোর্সেসের একটি বরাদ্দপ্রাপ্ত জমির নাম ওয়ালহির প্রতিবেদনে আসার পর কোম্পানিটি জানায়, ‘আমাদের সীমানার বাইরে শুরু হওয়া আগুন পরে গ্রুপের ব্যবস্থাপনাধীন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।’

সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান এশিয়া পাল্প অ্যান্ড পেপারও দাবি করেছে, সরবরাহকারীদের বরাদ্দপ্রাপ্ত জমিতে আগুন লাগার অর্থ এই নয় যে, পরিকল্পিতভাবে জমিতে আগুন দেয়া হয়েছে কিংবা জমির বরাদ্দপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানই আগুন লাগিয়েছে।

নুসানতারা অ্যাটলাসের প্রতিষ্ঠাতা ডেভিড গাভো বলেন, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে কখনো কখনো আগুনের সূত্রপাত কোথায় হয়েছে, তা শনাক্ত করা সম্ভব।

তিনি বলেন, ‘কিছু ক্ষেত্রে স্যাটেলাইটের ছবিতে স্পষ্ট দেখা যায়, বরাদ্দপ্রাপ্ত জমির ভেতরেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। তবে এটি পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছে, নাকি দুর্ঘটনাবশত, তা আমরা বলতে পারি না।’

তিনি আরো বলেন, ‘আবার কিছু ক্ষেত্রে স্পষ্ট দেখা যায়, আগুন বাইরে শুরু হয়ে বরাদ্দপ্রাপ্ত জমির ভেতরে ছড়িয়ে পড়েছে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীতে অবৈধভাবে চাষাবাদের জমি তৈরির জন্য আগুন ব্যবহার করা হয়েছে। বড় বড় বরাদ্দপ্রাপ্ত জমির পাশাপাশি স্থানীয় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরাও এ পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন।

ইন্দোনেশিয়ার কিছু এলাকায় আগে ক্ষুদ্র কৃষকদের জমি পরিষ্কারের জন্য আগুন ব্যবহারের অনুমতি ছিল। তবে এ বছর সরকার সেই চর্চার বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে।

পরিবেশবিষয়ক আইনগত সহায়তা প্রদানকারী বেসরকারি সংস্থা ক্লায়েন্টআর্থের আইনজীবী আজাম হাওয়ারি বলেন, আগুন দুর্ঘটনাবশত লাগলেও কিংবা বরাদ্দপ্রাপ্ত জমির বাইরে থেকে ছড়িয়ে পড়লেও কোম্পানিগুলোর আইনি দায় থাকতে পারে।

তিনি আরো বলেন, ‘আগুনের সূত্রপাত বাইরে থেকে হওয়া কিংবা চরম আবহাওয়ার পরিস্থিতি কোনো কোম্পানিকে দেওয়ানি দায় থেকে অব্যাহতি দেয় না।’

হাওয়ারি বলেন, পিটভূমি শুকিয়ে ফেলার মতো পরিবেশের জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করে—এমন কর্মকাণ্ডের জন্যও কোম্পানিগুলো দায়ী হতে পারে। বাসস