কৃষ্ণসাগরে জাহাজ চলাচল
কৃষ্ণসাগরে জাহাজ চলাচল সংগৃহীত ছবি

সকালের নাশতা সবে শেষ করেছেন তারা। হঠাৎ বিকট বিস্ফোরণের শব্দে তুরস্কের মাছ ধরার নৌযানটির কর্মীরা দৌড়ে ডেকে উঠে আসেন। সেখানেই দ্বিতীয় দফা হামলার শিকার হন তারা।

৪০ বছর বয়সী আহমেত ওজলু বলেন, ‘আগুন আর ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। বিস্ফোরণের ধাক্কায় আমরা শূন্যে উঠে গিয়ে এদিক-ওদিক ছিটকে পড়ি। বিস্ফোরণটি ছিল ভয়াবহ শক্তিশালী।’ 

গত ৫ জুন ক্রিমিয়ার কাছে ড্রোন হামলায় তুরস্কের পতাকাবাহী ‘দুরু ৬৭’ নৌযানটি আক্রান্ত হওয়ার সময় তিনি ছিলেন এর পাঁচ জেলের একজন।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কৃষ্ণসাগরে ছড়িয়ে পড়ার পর সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাণিজ্যিক জাহাজে এ ধরনের হামলা বেড়েছে। এতে তুরস্কের জাহাজগুলোও ক্রমেই হামলার ঝুঁকিতে পড়ছে।

হামলার পর নৌযানটিতে আগুন ধরে যায় এবং পানি ঢুকতে শুরু করে। জেলেরা ছুটে যান ব্রিজে। সেখানে তারা দেখতে পান, তাদের ক্যাপ্টেন ও শৈশবের বন্ধু ৪৫ বছর বয়সী জুনেইত ভারলিক রক্তের মধ্যে পড়ে আছেন। বিস্ফোরণের ছররায় তার ধমনি কেটে গিয়েছিল।

তারা জরুরি সাহায্যের সঙ্কেত পাঠিয়ে রক্তাক্ত ও আতঙ্কিত অবস্থায় অপেক্ষা করতে থাকেন। ততক্ষণে নৌযানটি আরো ডুবে যাচ্ছিল। প্রায় এক ঘণ্টা পর তাদের উদ্ধার করা হয়।

ওজলু বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম মারা যাব। আবার হামলা হতে পারে- এ নিয়েও আমরা ভীষণ আতঙ্কিত ছিলাম।’

হামলায় তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছররার গুরুতর আঘাত লাগে।

হামলার দায় কেউ স্বীকার করেনি। তবে তুরস্কের কোস্টগার্ড তাদের জানায়, ইউক্রেনের একটি ড্রোন ‘ভুল করে’ তাদের আঘাত করেছে।

তার বড় ভাই ৫৩ বছর বয়সী মেহমেত ওজলু বলেন, ‘আমরা কখনো ভাবিনি ইউক্রেন আমাদের ওপর হামলা করবে। কারণ, আমাদের নৌযানে তুরস্কের পতাকা ওড়ানো ছিল। আমরা বেসামরিক মানুষ। আমাদের নৌযানে কোনো অস্ত্র ছিল না।’ 

হামলায় তার শরীরের ভেতরে ও বাইরে গুরুতর আঘাত লাগে।

দুই ভাইই এ ঘটনায় গভীরভাবে মানসিক বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। আঘাতের কারণে কেউই আর সাগরে ফিরতে পারেননি। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বন্দর ত্রাবজনে জাল মেরামতের সময় মেহমেত এ কথা জানান।

তিনি বলেন, ‘আমি এখনো নিজেকে প্রশ্ন করি, ইউক্রেন কেন আমাদের মতো তুরস্কের বেসামরিক মানুষকে আঘাত করল? রাষ্ট্র হিসেবে তাদের আমাদের কাছে জবাব দিতে হবে এবং ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কারণ এতে আমার ও আমার সন্তানদের ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে গেছে।’

‘কাজ করা অসম্ভব’
রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় দেশের সাথেই তুরস্কের সম্পর্ক রয়েছে। তবে কৃষ্ণসাগরে সহিংসতায় ক্ষুব্ধ দেশটি। তুরস্ক অভিযোগ করেছে, যুদ্ধে জড়িত উভয় পক্ষই ‘কোনো বাছবিচার ছাড়াই সব বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালাচ্ছে’।

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়ব এরদোগান বলেন, ‘কৃষ্ণসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে সাম্প্রতিক হামলার জন্য যেই দায়ী হোক না কেন, তা অগ্রহণযোগ্য।’

তুরস্কের চেম্বার অব মেরিটাইম কমার্স (আইএমইএকে)-এর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কৃষ্ণসাগরে ২২৬টি বেসামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। এর বেশিভাগই চলতি বছরে।

আইএমইএকের চেয়ারম্যান তামের কিরান ২৭ আগস্ট বলেন, ‘২০২৬ সালের প্রথম আট মাসেই ১৬৩টি জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, যা মোট সংখ্যার ৭০ শতাংশেরও বেশি। এতে পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।’

তিনি আরো বলেন, এর মধ্যে আগের দুই মাসে ২২টি তুরস্কের মালিকানাধীন জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, এরপর আরো চারটি তুর্কি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে।

এর মধ্যে একটি ছিল ‘এমভি রেহান সারি’। ২২ জুলাই রাশিয়ার কয়লার চালান সংগ্রহের পর জাহাজটিতে হামলা হয়। এতে একজন নিহত ও তিনজন আহত হন।

২১ বছর বয়সী এনেস তোরুন বলেন, ‘কৃষ্ণসাগরে কাজ করা অসম্ভব। বিশেষ করে এখন।’

তিনি ক্যাপ্টেন হওয়ার প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। প্রথম ড্রোনটি আঘাত হানার সময় তিনি ঘুমাচ্ছিলেন। হামলায় ছররা তার শরীরে ঢুকে যায়।

তোরুন বলেন, ‘কর্মজীবনের এত শুরুতেই এটি আমার জন্য খুব খারাপ অভিজ্ঞতা।’

শারীরিকভাবে সুস্থ হয়ে উঠলেও তিনি পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারে (পিটিএসডি) ভুগছেন এবং আর সাগরে ফেরেননি।

তিনি বলেন, ‘গত বছর যুদ্ধ এতটা তীব্র হওয়ার আগে আমি ইউক্রেনে গিয়েছিলাম। কিন্তু এখন কৃষ্ণসাগরে থাকা মানেই মৃত্যুর আশঙ্কা মেনে নেয়া।’

চলতি মাসের শুরুতে তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, আগস্টে ‘প্রায় ৯০টি জাহাজ’ হামলার শিকার হয়েছে। 

গত সপ্তাহে এক তুর্কি কূটনীতিক বার্তাসংস্থা এএফপিকে জানান, আঙ্কারা নতুন একটি প্রস্তাব নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সাথে যোগাযোগ করেছে।

প্রস্তাবের বিষয়টি নিশ্চিত করে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো ‘এমন কিছু দাবি ও অবস্থান নিয়ে ফিরে এসেছে, যেগুলোর মধ্যে সমঝোতা করা কঠিন’।

তুরস্কের মেরিটাইম ওয়ার্কার্স প্ল্যাটফর্ম রাশিয়া ও ইউক্রেনকে বেসামরিক মানুষের জীবনের প্রতি প্রকাশ্য অবহেলার জন্য অভিযুক্ত করেছে।

প্ল্যাটফর্মের মুখপাত্র আহমেত বারান জান এএফপিকে বলেন, ‘দুই দেশই পরস্পরের অর্থনৈতিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত করতে গিয়ে শুধু নাবিকদের জীবনকে উপেক্ষা করছে।’

তোরুন বলেন, অনেক নাবিকই কৃষ্ণসাগরে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন।

তিনি আরো বলেন, ‘জাহাজে হামলা হলে জাহাজের মালিক বীমার টাকা পান। আর হামলা না হলে ইউরোপে যা আয় করা যায়, তার ১০ গুণ আয় করেন। কিন্তু হামলার শিকার হই আমরা, যারা জাহাজে থাকি।’ 

গভীর উদ্বেগ
পর্যবেক্ষকরা বলেছেন, কৃষ্ণসাগর সংঘাত ‘খুবই তীব্র পর্যায়ে’ প্রবেশ করায় তুরস্কের হাতে বিকল্প খুবই সীমিত।

কাদির হাস বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ সেরহাত গুভেনচ বলেন, ‘রাশিয়া ও ইউক্রেন- দুই দেশই পরস্পরের জাহাজের জন্য কৃষ্ণসাগরকে অচল করে দিতে চাইছে। অন্য পক্ষ যাতে তুরস্কের জাহাজ ব্যবহার করে কোনো সুবিধা নিতে না পারে, সে জন্য তারা নিরপেক্ষ জাহাজকেও হামলার লক্ষ্যবস্তু করতে প্রস্তুত।’

তিনি আরো বলেন, ‘তথাকথিত ‘ঘোস্ট ফ্লিট’-এর জাহাজ চলাচল বন্ধ করতে তুরস্কের অনীহায় ইউক্রেন সন্তুষ্ট নয়। তাই নিষ্ক্রিয়তার মূল্য তাদের বোঝাতে ইউক্রেন সম্ভবত এ ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে।’

তবে বিপদ থাকা সত্ত্বেও কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলের অনেক বাসিন্দার কাজ চালিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। কারণ মাছ ধরা ওই অঞ্চলের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। স্থানীয় নেতা মুস্তাফা ইলমাজ এ কথা বলেন। তিনি ‘দুরু ৬৭’-এর জেলেদের বসবাসের এলাকার স্থানীয় নেতা।

তিনি বলেন, সাগরে বের হলেই তাদের মনে আতঙ্ক থাকে- হামলার শিকার হতে পারেন, অথবা ভুল করে বিপজ্জনক কোনো যুদ্ধাবশেষ জালে উঠে আসতে পারে। এর মধ্যে থাকতে পারে ড্রোন, বোমা বা গ্রেনেড, যেগুলোর অনেকগুলোতেই সক্রিয় বিস্ফোরক থাকতে পারে।

মুস্তাফা ইলমাজ বলেন, ‘রাতে সাগরে বের হলে মনে হয়, কখন কিসের সাথে জাল আটকে যায়। সত্যিই খুব কঠিন।’

সূত্র : বাসস