কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। সংগৃহীত ছবি

গণভোটে বড় ব্যবধানে পরাজিত হলেও কানাডার আলবার্টা প্রদেশকে স্বাধীন করার আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতারা। তাদের এই অবস্থানের ফলে দেশটির অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তেলসমৃদ্ধ প্রদেশটিতে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

Advertisement

গত সোমবার (১৯ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত গণভোটে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার কানাডার অংশ হিসেবেই থাকার পক্ষে মত দিয়েছেন। বাধ্যতামূলক স্বাধীনতা গণভোটের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন ৭৫ দশমিক ৫ শতাংশ ভোটার।

মঙ্গলবার পার্লামেন্টে প্রবেশের সময় কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেন, ‘আলবার্টার জনগণ দেশের ঐক্যের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেয়ায় আমি অত্যন্ত আনন্দিত।’

বিচ্ছিন্নতাবাদীদের উদ্দেশে কী বার্তা দিতে চান— এমন প্রশ্নের জবাবে আলবার্টায় বেড়ে ওঠা কার্নি বলেন, ‘ফলাফল একেবারেই স্পষ্ট। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কানাডার পক্ষে রায় দিয়েছেন। এখন একসাথে কাজ করার সময়।’

তবে গণভোটের ফল প্রকাশের পর বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতারা সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেছেন।

আলবার্টা প্রস্পেরিটি প্রজেক্টের শীর্ষ কর্মকর্তা জেফরি র‌্যাথ বলেন, স্বাধীনতার আন্দোলন ‘নিশ্চিতভাবেই’ অব্যাহত থাকবে। চলতি বছরের শুরুর দিকে বিচ্ছিন্নতার উদ্যোগে সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেছিলেন।

র‌্যাথ বলেন, ‘আমরা এই প্রদেশে একটি বিশাল আন্দোলন গড়ে তুলেছি। আমরা সামনে এগিয়ে যেতে থাকব।’

সাংবাদিকদের তিনি আরো বলেন, আলবার্টার নেতৃত্বে এমন কেউ থাকলে স্বাধীনতার গণভোটে জয় পাওয়া অসম্ভব, যিনি কানাডার ঐক্যের পক্ষে অবস্থান নেন।

প্রদেশটির মুখ্যমন্ত্রী ড্যানিয়েল স্মিথের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকারও করেন র‌্যাথ। স্মিথ প্রধানমন্ত্রী কার্নির সাথে একই অবস্থানে থেকে কানাডার ঐক্যের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন। 

র‌্যাথ বলেন, তিনি আলবার্টার রক্ষণশীল রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ আবার নিজেদের হাতে নিতে চান।

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা সরকার গঠন করবই।’

‘গভীর অসন্তোষের শিকড়’
আলবার্টার স্বাধীনতাপন্থী আন্দোলন বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত। স্বাধীনতার পক্ষে প্রচার চালাতে ‘লেটস টক আলবার্টা’ প্রতিষ্ঠা করা ক্রিস স্কটও মঙ্গলবার বার্তাসংস্থা এএফপিকে জানিয়েছেন, তিনি এই আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।

তবে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা অবিলম্বে প্রাদেশিক সরকারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে গণভোট আয়োজন করতে চাইলে সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হবে বলেও মনে করেন তিনি।

স্কট বলেন, ‘আলবার্টার ৭৫ শতাংশ মানুষ সরাসরি এমন ধারণা প্রত্যাখ্যান করবেন। মানুষকে বুঝতে হবে, ফেসবুকে নানা ধরনের মিম ছড়িয়ে কোনো ধারণা বা আন্দোলনের পক্ষে কিছু সমর্থন পাওয়া যায়। কিন্তু একটা পর্যায়ে এসে প্রকৃত কাজ— মানুষকে বিষয়টি সম্পর্কে শিক্ষিত ও সচেতন করার দিকে মনোযোগ দিতে হয়।’

প্রধানমন্ত্রী কার্নির জন্য আলবার্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কানাডার অর্থনীতিকে আরো শক্তিশালী করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এই প্রদেশের ভূমিকা বড়।

কার্নি ও আলবার্টার মুখ্যমন্ত্রী ড্যানিয়েল স্মিথ প্রদেশটি থেকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল পর্যন্ত নতুন একটি পাইপলাইন নির্মাণের বিষয়ে একসাথে কাজ করছেন। এর মাধ্যমে আলবার্টার বিটুমিন এশিয়ার বাজারে রফতানি করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে ঐক্যের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান সত্ত্বেও সামনে রাজনৈতিক সঙ্কট তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জেনেভিয়েভ তেলিয়ে এএফপিকে বলেন, গণভোটের ফল কানাডা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিতর্ক পুরোপুরি বন্ধ করার জন্য যথেষ্ট নয়।

তিনি আরো বলেন, ‘এই আন্দোলনকে আর তুচ্ছ করে দেখার সুযোগ নেই।’

তেলিয়ের মতে, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আন্দোলন মোকাবেলায় কার্নি যথাযথভাবে পরিস্থিতি সামলেছেন। আলবার্টার জন্য বড় পাইপলাইন প্রকল্পে কেন্দ্রীয় সরকারের বিপুল আর্থিক সহায়তাও বিচ্ছিন্নতার পক্ষে তৈরি হওয়া গতি কমানোর কার্যকর ওপায় হয়েছে।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, আলবার্টার বড় প্রকল্পগুলোতে কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থায়ন বন্ধ হয়ে গেলে কার্নির জন্য সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মঙ্গলবার কানাডার সংবাদপত্র দ্য গ্লোব অ্যান্ড মেইলে প্রকাশিত এক নিবন্ধে আলবার্টাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ টাইলার ডসনও প্রদেশটির দীর্ঘদিনের অসন্তোষের বিষয়টি তুলে ধরেছেন।

তিনি লিখেছেন, ‘এই প্রদেশে গভীর অসন্তোষ রয়েছে। কানাডার সাথে থাকার পক্ষে গণভোটের রায় সেই সমস্যাগুলো দূর করে দেয় না।’

পরিবেশবিষয়ক বিধি-নিষেধের কারণে প্রদেশটির তেলশিল্পকে দমিয়ে রাখা হচ্ছে— এমন ধারণাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে অসন্তোষ এখনো রয়েছে।

ডসন বলেন, ‘আলবার্টার প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ কানাডা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়ে আরেকটি গণভোট আয়োজনের পক্ষে মত দিয়েছেন। কার্নির বিষয়টি অবহেলা করা উচিত হবে না।’

সূত্র : বাসস