ফ্লাভিও বলসোনারো ও লুলা দা সিলভা
ফ্লাভিও বলসোনারো ও লুলা দা সিলভা। সংগৃহীত ছবি

ব্রাজিলের বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা ও ডানপন্থী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো আজ প্রথমবারের মতো সরাসরি টেলিভিশন বিতর্কে মুখোমুখি হচ্ছেন।

Advertisement

আগামী সপ্তাহে অনুষ্ঠেয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় ও চূড়ান্ত দফার ভোটের আগে এই বিতর্ককে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। এবারের নির্বাচনী প্রচার ইতোমধ্যেই তীব্র রাজনৈতিক বিরোধ, কাদা ছোড়াছুড়ি ও বিভাজনের রূপ নিয়েছে।

৪৫ বছর বয়সী ফ্লাভিও বলসোনারো দেশটির সাবেক উগ্র ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর ছেলে। চলতি মাসের শুরুর দিকে প্রথম দফার ভোটে তিনি অপ্রত্যাশিতভাবে লুলার চেয়ে এগিয়ে যান। জনমত জরিপের পূর্বাভাসকে ভুল প্রমাণ করে তার এই এগিয়ে যাওয়া ব্রাজিলের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।

রোববার (১৮ অক্টোবর) সন্ধ্যায় টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত এই বিতর্ক নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এর আগে, প্রথম দফার নির্বাচনের সময় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত একটি বিতর্কে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন লুলা।

বিতর্কের আগে ফ্লাভিও বলসোনারো সাও পাওলোর বিখ্যাত পাউলিস্তা অ্যাভিনিউতে একটি নির্বাচনী সমাবেশে নেতৃত্ব দেবেন।

অন্যদিকে, রিও ডি জেনেইরোর কোপাকাবানা সমুদ্রসৈকতে জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী কায়েতানো ভেলোসোসহ কয়েক ডজন শিল্পী ‘গণতন্ত্রের পক্ষে সমাবেশ’-এ অংশ নেবেন।

প্রথম দফার নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর ব্রাজিলের বিভিন্ন বড় শহরে ধারাবাহিক বিক্ষোভ হয়েছে। এসব কর্মসূচি দেশটির বামপন্থী শিবিরের নির্বাচনী প্রচারে নতুন গতি এনেছে।

শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের কর্মীরা রাস্তায় নেমে সম্ভাব্য আরেকটি উগ্র ডানপন্থী সরকারের বিরোধিতা করছেন। তাদের আন্দোলনের প্রধান স্লোগান—‘আবার কখনোই বলসোনারো নয়’।

প্রথম দফার ভোটের পর থেকে জনমত জরিপে ফ্লাভিও বলসোনারো এগিয়ে থাকলেও চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত দু’টি জরিপে তার ব্যবধান কিছুটা কমেছে।

ওই জরিপ অনুযায়ী, ভোটারদের মধ্যে ৫১ শতাংশ ফ্লাভিও বলসোনারোকে এবং ৪৯ শতাংশ লুলাকে সমর্থন করছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের লড়াই
৮১ বছরে পা দিতে যাওয়া লুলা দ্বিতীয় দফার প্রচারে নতুন কৌশল নিয়েছেন। কয়েক দশকের রাজনৈতিক জীবনে এবারের প্রচারকে তিনি নিজের অংশ নেয়া সবচেয়ে ‘অগোছালো’ প্রচারগুলোর একটি বলে স্বীকার করেছিলেন।

ভোটারদের সাথে যোগাযোগ বাড়াতে লুলা তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারকৌশল নির্ধারণে তরুণ বামপন্থী ইনফ্লুয়েন্সারদের পরামর্শ নেয়া শুরু করেছেন। পাশাপাশি ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে তিনি নিজেই মোবাইল ফোনে ভিডিও সেলফি ধারণ করে প্রচার চালাচ্ছেন।

চলতি সপ্তাহে লুলা অভিযোগ করেছেন, প্রযুক্তি জায়ান্ট মেটা ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপে তার প্রচারসামগ্রী প্রকাশ ও প্রচারের পরিধি সীমিত করে ব্রাজিলের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করছে। 

একইসাথে প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোর নির্বাচনী প্রচারশিবিরকে অন্যায্য সুবিধা দেয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

শনিবার লুলার নির্বাচনী জোট এক বিবৃতিতে জানায়, মেটার কাছ থেকে বলসোনারোর প্রচার শিবির কোনো আর্থিক সুবিধা পেয়েছে কি না, তা তদন্ত করতে তারা নির্বাচনী কৌঁসুলি ও পুলিশের কাছে আবেদন করেছে। 

এমন সুবিধা দেয়া হয়ে থাকলে, তা নির্বাচনী অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে জোটটি দাবি করেছে।

অভিযোগগুলো জাতিসঙ্ঘের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদকের কাছেও পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে, নির্বাচনে কোনো পক্ষ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে মেটা।

তবে প্রতিষ্ঠানটি স্বীকার করেছে, তাদের সেবায় কয়েকটি প্রযুক্তিগত ত্রুটি দেখা দিয়েছিল। এর মধ্যে জালিয়াতিবিরোধী পর্যালোচনার সময় ভুলবশত লুলার প্রচার শিবিরের বিজ্ঞাপন অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয়ার ঘটনাও রয়েছে।

ভোট টানতে নানা প্রতিশ্রুতি
ভোটারদের সমর্থন পেতে লুলা একের পর এক নতুন কর্মসূচি ও পদক্ষেপ ঘোষণা করছেন।

বুধবার ব্রাজিলের কংগ্রেস একটি সাংবিধানিক সংশোধনী অনুমোদন করে। এর ফলে সপ্তাহে এক দিনের পরিবর্তে দুই দিনের বেতনসহ সাপ্তাহিক ছুটির ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে।

লুলার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে এই উদ্যোগ অন্যতম, যা দেশটির লাখ লাখ শ্রমিকের উপকারে আসবে।

এই প্রস্তাবের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন ফ্লাভিও বলসোনারো। তবে শেষ মুহূর্তে অবস্থান পরিবর্তন করে তিনিও সংশোধনীর পক্ষে ভোট দেন।

লুলা বলেন, ‘সে নির্বাচনী সুবিধা পাওয়ার আশায় এই পদক্ষেপকে সমর্থন করেছে।’

প্রতিদ্বন্দ্বীকে আক্রমণ করে তিনি আরো বলেছেন, ফ্লাভিও একটি পাড়ার সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালনেরও যোগ্য নন।

এদিকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ মওকুফ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি ও জ্বালানি তেল থেকে কর প্রত্যাহারের ঘোষণাও দিয়েছেন লুলা।

তবে ফ্লাভিও বলসোনারোর অভিযোগ, ‘ভোট পাওয়ার জন্য লুলা মানুষকে প্রতারিত করছেন।’

নির্বাচনে ভোটারদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ এখন জননিরাপত্তা। এই পরিস্থিতিতে অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থানের ওপর আরো জোর দিয়েছেন ফ্লাভিও বলসোনারো।

তিনি এ সপ্তাহে বলেন, ‘জননিরাপত্তার প্রশ্নে যারা আমাকে কঠোর মনে করেন, তারা এখনো আমার কঠোর অবস্থানের কিছুই দেখেননি।’

ফ্লাভিও আরো বলেন, অপরাধী চক্রের সদস্যদের ব্যাপক হারে কারাগারে পাঠানোর ক্ষেত্রে এল সালভাদরের বিতর্কিত মডেলটিকেও তার কাছে ‘অত্যন্ত নমনীয়’ বলে মনে হয়।

এই সপ্তাহে পোর্তো আলেগ্রেতে বোলসোনারোর এক সমাবেশে ৬০ বছর বয়সী লুইস হেনরিক ভিলাবা বলেন, ‘লুলার ওয়ার্কার্স পার্টির শাসন করার আর কোনো বৈধতা নেই। এখানে অনেক বেশি মিথ্যা, অনেক বেশি চুরি ও অনেক বেশি কেলেঙ্কারি রয়েছে।’

সূত্র : বাসস