
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) হোয়াইট হাউসে জাঁকজমকপূর্ণ রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে স্বাগত জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দিনভর নানা আনুষ্ঠানিকতা ও জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের পর এই নৈশভোজ হয়। তবে এসব আয়োজনের আড়ালেই বিশ্বের দুই পরাশক্তির মধ্যে গভীর উত্তেজনা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নৈশভোজে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের বেশ কয়েকজন শীর্ষ ব্যক্তিত্ব উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন টেসলার ইলন মাস্ক, অ্যাপলের টিম কুক, এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং এবং ওপেনএআইয়ের স্যাম অল্টম্যান। এতে স্পষ্ট হয়, শির সফরে বাণিজ্য ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্প ও তার স্ত্রী মেলানিয়া যখন শি ও তার স্ত্রী পেং লিয়ুয়ানকে নৈশভোজে স্বাগত জানান, তখন হোয়াইট হাউসের বাইরে বিক্ষোভ করেন প্রতিবাদকারীরা।
বার্তাসংস্থা এএফপির সাংবাদিকরা জানান, বিক্ষোভকারীদের কেউ কেউ ‘শি জিনপিং এখানে স্বাগত নন’ এবং ‘হংকংকে স্বাধীন করো’—এমন স্লোগান দেন।
এর আগে বৃহস্পতিবার দিনভর নানা জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন করেন ট্রাম্প। সামরিক কুচকাওয়াজ, যুদ্ধবিমানের ফ্লাইপাস্ট এবং হোয়াইট হাউসে নির্মিত নতুন হেলিপ্যাড পরিদর্শনসহ বিভিন্ন আয়োজনের মধ্য দিয়ে তিনি শিকে স্বাগত জানান।
ট্রাম্প বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট শি এবং আমি দু’জনেই বুঝি যে আমরা ভিন্ন ভিন্ন ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করি। তবে আমাদের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক টিকে আছে।’
তবে শি তুলনামূলকভাবে সংযত সুরে বক্তব্য দেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে ‘শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান’ করার আহ্বান জানান। একইসাথে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তাইওয়ান ও ইরান যুদ্ধ নিয়ে বেইজিংয়ের অবস্থানও স্পষ্ট করেন।
নৈশভোজে দেয়া বক্তব্যেও তিনি একই বার্তা দেন। শি বলেন, ‘চীন ও যুক্তরাষ্ট্রকে দায়িত্বশীল বৃহৎ দেশ হিসেবে কাজ করতে হবে।’
উপহার হিসেবে বাল্ড ঈগলের মূর্তি
নৈশভোজে ট্রাম্প শিকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় প্রতীক বাল্ড ঈগলের একটি বিশেষভাবে তৈরি মূর্তি উপহার দেন।
নৈশভোজের মেনুতে ছিল হলুদ স্কোয়াশ ভেলুতে, তিলের আবরণ দেয়া সি-বাস এবং ভ্যানিলা ক্রেম্যুর সাথে হোয়াইট হাউসের মধু দিয়ে তৈরি আইসক্রিম।
৮০ বছর বয়সী মার্কিন প্রেসিডেন্ট নৈশভোজের পর অতিথিদের হোয়াইট হাউসের নতুন ৪০ কোটি ডলারের বলরুম নির্মাণস্থল ঘুরিয়ে দেখান। সেখানে তিনি বলেন, ‘আপনাদের সম্মানে, আপনারাই প্রথম এখানে পা রাখবেন।’
তবে নৈশভোজের টেবিলে বাণিজ্য থাকলেও শির সফর থেকে বড় ধরনের কোনো অগ্রগতি অর্জনের প্রত্যাশা কম।
দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যবিরতি আরো দুই মাস বাড়িয়ে জানুয়ারি পর্যন্ত নেয়া হয়েছে—এটি একটি ছোটখাটো সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে চীন যে দুই বছরের জন্য এই বিরতি বাড়ানোর আশা করেছিল, দুই মাসের সিদ্ধান্ত তার তুলনায় অনেক কম।
ফলে শির সফরটি মূলত বিষয়বস্তুর চেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। এই আনুষ্ঠানিকতা বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে থাকা উত্তেজনা কিছুটা আড়াল করতে সহায়তা করেছে।
সামরিক কুচকাওয়াজ ও যুদ্ধবিমানের মহড়া
বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসের দক্ষিণ লনে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনার মধ্য দিয়ে দিনের কর্মসূচি শুরু হয়। এরপর ট্রাম্প ও শি সদ্য সংস্কার করা রোজ গার্ডেনে সামরিক কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করেন।
এরপর মার্কিন সামরিক বাহিনীর কয়েকটি যুদ্ধবিমান আকাশে উড়ে যায়। এর মধ্যে ছিল বি-২ বোমারু বিমান, যে ধরনের বিমান গত বছর ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলায় ব্যবহৃত হয়েছিল। এ সময় হোয়াইট হাউসের পশ্চিম অংশের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পতাকা উড়ছিল।
ওভাল অফিসে দুই নেতা বৈঠকে বসার পর ট্রাম্প রসিকতা করে বলেন, চীনের সাংবাদিকরা সবচেয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ।
এর কয়েক দিন আগে তিনি সিএনএন, এমএস নাও ও পলিটিকোকে হোয়াইট হাউস থেকে নিষিদ্ধ করেছিলেন। তবে আদালতের আদেশের পর বৃহস্পতিবার এসব সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকরা আবার হোয়াইট হাউসে প্রবেশের সুযোগ পান।
‘দারুণ বৈঠক’
পরে ট্রাম্প শিকে হোয়াইট হাউসের নতুন হেলিপ্যাড দেখাতে নিয়ে যান এবং তাকে নিজের মেরিন ওয়ান হেলিকপ্টারেও ওঠান।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের দারুণ বৈঠক হয়েছে।’
এ সময় ইরান, তাইওয়ান, ফেন্টানিল পাচার এবং হংকংয়ের কারাবন্দী গণতন্ত্রপন্থী সংবাদমাধ্যমের উদ্যোক্তা জিমি লাইসহ বিভিন্ন বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্ন এড়িয়ে যান দুই নেতা।
তবে শির বক্তব্যে বেশ কিছু বিষয়ে কঠোর অবস্থান স্পষ্ট ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পর দেয়া বক্তব্যে শি বলেন, দুই দেশকে নিশ্চিত করতে হবে যেন ‘কোনো সংঘাত ও কোনো মুখোমুখি অবস্থান’ তৈরি না হয়।
তিনি আরো বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে ‘সবসময় মানুষের নিয়ন্ত্রণে’ থাকতে হবে।
অন্যদিকে, ট্রাম্প কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানবজাতির জন্য হুমকি হতে পারে এমন সতর্কবার্তাগুলোকে গুরুত্ব দেননি।
পরে ওভাল অফিসে বৈঠকের সময় শি ট্রাম্পকে ‘বিচক্ষণতা’ প্রদর্শনের আহ্বান জানান এবং তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার পরামর্শ দেন।
উল্লেখ্য, তাইওয়ান একটি স্বশাসিত দ্বীপ। তবে বেইজিং এটিকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে।
ইরানের সাথে চীন গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে শি ট্রাম্পকে আলোচনার মাধ্যমে যত দ্রুত সম্ভব ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটানোর আহ্বান জানান।
শির যুক্তরাষ্ট্র সফর শুক্রবার শেষ হবে। এদিন দুই দেশের প্রেসিডেন্ট সস্ত্রীক ইউএস ন্যাশনাল আর্কাইভস পরিদর্শনের কথা রয়েছে। সেখানেই যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র সংরক্ষিত আছে। এ বছর দেশটির স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ২৫০ বছর পূর্তি পালিত হচ্ছে।
সূত্র : বাসস








