ডোনাল্ড ট্রাম্প-মিথ্যা-অতিরঞ্জিত-জাতিসঙ্ঘ-সাধারণ পরিষদ-ফ্যাক্টচেক-ইরান
জাতিসঙ্ঘে ডোনাল্ড ট্রাম্প ভাষণ দিচ্ছেন সংগৃহীত

জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদে মঙ্গলবারের ভাষণে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য তুলে ধরেন। এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের তেল মজুত, গাজা যুদ্ধ, মাদক পাচার, বিদেশি বিনিয়োগ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়ে ট্রাম্প বেশ কয়েকটি মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত দাবি করেন।

নিউ ইয়র্ক টাইমস জানায়, ট্রাম্পের বক্তব্যের এসব দাবি যাচাই করে দেখা হয়েছে। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলার তেল, গাজা যুদ্ধ এবং সমুদ্রপথে মাদক পাচার বন্ধের দাবি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

প্রতিবেদনটি লিখেছেন লিন্ডা কিউ। নিউ ইয়র্ক টাইমসের এই সাংবাদিক রাজনীতিক ও জনপরিচিত ব্যক্তিদের বক্তব্য তথ্য যাচাই করেন। প্রায় এক দশক ধরে তিনি এ ধরনের প্রতিবেদন ও তথ্য যাচাইয়ের কাজ করছেন।

ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার তেল মজুত যোগ করলে বিশ্বের ৬০ শতাংশের বেশি তেল তাদের হাতে। এটি অতিরঞ্জিত। ভেনেজুয়েলার প্রমাণিত তেল মজুত প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪৬ বিলিয়ন ব্যারেল। দুই দেশ মিলে প্রায় ৩৪৯ বিলিয়ন ব্যারেল। বিশ্বের মোট প্রমাণিত মজুত প্রায় ১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ব্যারেল। অর্থাৎ দুই দেশের মজুত মিলে বিশ্বের প্রায় ২২ শতাংশ। ট্রাম্প বলেছেন, ভেনেজুয়েলা ভূতাত্ত্বিক ও প্রকৌশলগত তথ্যের ভিত্তিতে তার ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি প্রমাণিত তেল মজুত যুক্তরাষ্ট্রকে দেবে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন প্রায় ২৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন ব্যারেল এবং ভেনেজুয়েলা প্রায় ১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন করে। দুই দেশের উৎপাদন বিশ্ব উৎপাদনের প্রায় ২৩ শতাংশ।

গাজা নিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘কয়েক সপ্তাহ পর আমরা যুদ্ধ শেষ করেছি, অসংখ্য হাজার মানুষের জীবন বাঁচিয়েছি।’ এটিও অতিরঞ্জিত। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ইসরাইল-হামাস যুদ্ধের যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় ট্রাম্প ভূমিকা রাখেন। বড় আকারের লড়াই অনেকটাই বন্ধ হলেও গাজায় ইসরাইলি সামরিক অভিযান ও হামলা এখনো নিয়মিত চলছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, অক্টোবরের পর ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে হামাসের কর্মকর্তা ও বেসামরিক মানুষ উভয়েই রয়েছেন।

ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার কিছু অংশও এখনো আটকে আছে। আগস্টে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু হামাসকে নিরস্ত্র করার বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসন-সমর্থিত ১৫ দফা পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেন। ওই মাসের শেষ দিকে ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’-এর এক কর্মকর্তা ইসরাইলি সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি বিপন্ন করার অভিযোগ করেন। তার মতে, গাজায় চলমান হামলা পরিকল্পনাটিকেই দুর্বল করছে।

মাদক পাচার নিয়েও ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কয়েক ডজন মাদকবাহী নৌযানে হামলা চালিয়ে সমুদ্রপথে আসা ৯৭ শতাংশ মাদক ধ্বংস করেছে। এ দাবির পক্ষে প্রমাণ নেই। গত সেপ্টেম্বর থেকে মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলীয় জলসীমায় অনুমোদনহীন নৌযানে হামলা চালিয়ে আসার পর ট্রাম্প বারবার সমুদ্রপথের মাদক পাচার প্রায় ধ্বংস করার দাবি করছেন। কিন্তু দাবিটি তার নিজের প্রশাসনের তথ্যের সাথেও সাংঘর্ষিক।

হোয়াইট হাউজ জুলাই ২০২৫-এ রেকর্ড পরিমাণ মাদক জব্দ এবং কাস্টমস ও বর্ডার প্রোটেকশনের একটি শাখার ডিসেম্বরে কম পরিমাণ মাদক জব্দের তথ্যকে ট্রাম্পের দাবির পক্ষে ব্যবহার করেছিল। কিন্তু জব্দ করা মাদকের বড় অংশ ছিল গাঁজা। ভেনেজুয়েলা কোকেনের একটি ট্রানজিট কেন্দ্র। এসব মাদক কোথায় জব্দ করা হয়েছে, সেটিও স্পষ্ট নয়। অপরাধবিজ্ঞানীদের মতে, হামলায় কিছু মাদকপথ ব্যাহত হয়েছে, কিন্তু পাচার বন্ধ হয়নি। পাচারকারীরা নতুন পথ বেছে নিয়েছে। জুলাইয়ে ওয়াশিংটন পোস্টও জানায়, মাদক নিয়ন্ত্রণ প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে দেখা গেছে, এসব হামলা যুক্তরাষ্ট্রে কোকেনের সরবরাহ বা দামে প্রভাব ফেলেনি।

আরো কয়েকটি পুরনো দাবিও পুনরাবৃত্তি করেন ট্রাম্প। তিনি দাবি করেন, ২১ ট্রিলিয়ন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ এনেছেন। অথচ হোয়াইট হাউজের নিজস্ব হিসাব এর প্রায় অর্ধেক। সেই হিসাবে বিস্তৃত প্রতিশ্রুতি ও আগে ঘোষণা করা বিনিয়োগও রয়েছে।

ট্রাম্প বলেন, তিনি মার্কিন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কর কমিয়েছেন। বাস্তবে গত গ্রীষ্মে আইনে পরিণত হওয়া কর কমানোর প্যাকেজটি ইতিহাসে ষষ্ঠ বৃহত্তম।

তিনি আরো বলেন, বর্তমানে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি মার্কিন নাগরিক কাজ করছেন। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে এ পরিসংখ্যান অর্থবহ নয়। আগস্টে বেকারত্বের হার ছিল ৪ দশমিক ১ শতাংশ। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তিনি দায়িত্ব নেয়ার সময়ের তুলনায় এটি সামান্য বেশি।

ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ব্যবহারের প্রয়োজনের চেয়েও বেশি গোলাবারুদ রয়েছে এবং নজিরবিহীন হারে সেগুলো তৈরি হচ্ছে। কিন্তু ইরানের সাথে যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের মজুত কমিয়ে দিয়েছে।

এ ছাড়া আটটি যুদ্ধ মীমাংসার কৃতিত্বও তিনি নিজের বলে দাবি করেন। নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতে, কয়েকটি সংঘাতকে ‘যুদ্ধ’ বলাই অতিরঞ্জিত। আবার কয়েকটি দেশের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ভূমিকার দাবিও সংশ্লিষ্ট দেশগুলো মেনে নেয়নি।