
ইরানের ওপর আবারো হামলা চালানো হবে নাকি শান্তিচুক্তির পথে যাওয়া—এ নিয়ে তাকে ‘বড় সিদ্ধান্ত’ নিতে হবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেয়া ভাষণে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, সংঘাতের অবসান না হলে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানকে তিনি ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দিতে পারেন। একই দিন সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকও হয়েছে।
বিবিসি বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) জানায়, ট্রাম্পের ভাষণের সময় ইরানি প্রতিনিধিদলের একজন সদস্য সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ঠাসা দর্শকভর্তি সভাকক্ষে দেয়া ভাষণে ট্রাম্প ইরানের সাথে চলমান সংঘাত নিয়ে এমন কঠোর হুমকি দেন। একই ভাষণে তিনি ‘বিশ্ব সরকার’-এর ধারণা প্রত্যাখ্যান করেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রকে জয়ী করার অঙ্গীকার করেন।
ট্রাম্পের এসব বক্তব্য আসে এক ব্যস্ত কূটনৈতিক দিনের মধ্যে। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনের যুদ্ধ তার পররাষ্ট্রনীতির ওপর চাপ তৈরি করলেও তিনি জাতিসংঘে একে একে এক ডজনের বেশি বিশ্বনেতার সাথে বৈঠক করেন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেয়া ভাষণের শুরুতেই ট্রাম্প অর্থনীতি, অভিবাসন, সীমান্ত এবং সহিংস অপরাধ দমনে নিজের সাফল্যের কথা তুলে ধরেন। তার বক্তব্যের ওই অংশে কূটনীতিকদের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের ভোটারদের উদ্দেশে দেয়া প্রচারণামূলক বক্তব্যের সুরই বেশি ছিল।
এরপর ভাষণের বড় একটি অংশজুড়ে তিনি ইরানের সাথে যুদ্ধের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে এবং ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও কমেছে।
ট্রাম্পের বক্তব্যের সুর এর আগে দেয়া জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের বক্তব্যের সাথে ছিল স্পষ্টতই ভিন্ন। গুতেরেস সতর্ক করে বলেন, বিশ্বে বিভাজন আরো গভীর হচ্ছে। একই সাথে তিনি বিশ্বের মানুষের পারস্পরিক ‘নির্ভরশীলতার’ ওপর জোর দেন।
জাতিসংঘে দেয়া ভাষণে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ তেহরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রেখেছে। তিনি এটিকে ‘শক্তির মাধ্যমে শান্তি’ প্রতিষ্ঠার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। তার মতে, এ ক্ষেত্রে সমঝোতা বা আপসের চেয়ে চূড়ান্ত হুমকিই বেশি কার্যকর।
ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানের সাথে এমন কোনো চুক্তি হবে কি, যাতে তারা আবারো গড়ে উঠতে পারে এবং আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরো শক্তিশালী দেশ হতে পারে?’
এরপরই তিনি বলেন, ‘ আমি ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে নিশ্চিহ্ন করে দেবো কি এবং দ্রুতই তা করবো, যাতে তারা আর কখনো মানুষ ও দেশ ধ্বংস করার সুযোগ না পায়? আমি কি তাদের নরকে পাঠিয়ে দেবো?’
ইরানের সাথে যে চুক্তির চেষ্টা এখনো সফল হয়নি, নভেম্বরের নির্বাচনের পর সেটি হবে বলে ট্রাম্প মনে করেন। তার বক্তব্যে এমন এক পররাষ্ট্রনীতি স্পষ্ট হয়েছে, যেখানে আলোচনার দরজা খোলা রাখার পাশাপাশি বিপুল সামরিক শক্তি প্রয়োগের হুমকি দেয়া হয়।
পরে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ফাঁকে মার্কিন কর্মকর্তারা ইরানি প্রতিনিধিদলের সাথে তিন ঘণ্টা ‘খুবই ফলপ্রসূ’ বৈঠক করেছেন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনও নিশ্চিত করেছে, দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সাথে বৈঠক করেছেন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরএনএ-কে দেয়া বক্তব্যে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকেই পরে জানান, কাতারের মধ্যস্থতায় আলোচনা হয়েছে। কাতারি মধ্যস্থতাকারীরা তেহরানের শর্তগুলো মার্কিন পক্ষের কাছে পৌঁছে দেন। এসব শর্তের মধ্যে ছিল সব ফ্রন্টে যুদ্ধের অবসান এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘আগ্রাসী কর্মকাণ্ড’ বন্ধ করা।
জাতিসংঘ ভবন থেকে বের হওয়ার সময় বিবিসি উইটকফের কাছে জানতে চায়, বৈঠক কেমন হয়েছে। জবাবে তিনি বৃদ্ধাঙ্গুলি তুলে ইতিবাচক ইঙ্গিত দেন। পরে এক্স-এ দেয়া পোস্টে উইটকফ নিশ্চিত করেন, ‘মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে’ দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়েছে এবং তারা সারা দিন দুই পক্ষের মধ্যে যাতায়াত করেছেন।
উইটকফ বলেন, ‘তারা সফলভাবে এক দফা আলোচনা শেষ করেছেন। আমরা আশা করছি, এটি গঠনমূলক ও আশাব্যঞ্জক প্রমাণিত হবে। মধ্যস্থতাকারীরা তাদের কাজ চালিয়ে যাবেন।’
এদিকে জাতিসংঘে দেয়া ভাষণে ট্রাম্প আবারো দাবি করেন, তার কূটনৈতিক উদ্যোগ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটাবে। তবে দুই দেশ পরস্পরের ভূখণ্ডের গভীরে পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাওয়ায় যুদ্ধ থামার তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা রাশিয়া ও ইউক্রেনের নেতাদের সাথে খুব ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছি এবং আমরা এটিও শেষ করবো। আমার মনে হয়, মানুষ যতটা বুঝতে পারছে, তার চেয়েও দ্রুত এটি ঘটবে।’
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, বুধবার নিউইয়র্কে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সাথে বৈঠক করবেন।








