সার ডিলার নিয়োগ
পীরগাছায় সার ডিলার নিয়োগে বিএনপি নেতার সুপারিশের সাথে মন্ত্রণালয়ের তালিকার মিল। নয়া দিগন্ত

দৈনিক নয়া দিগন্তে প্রকাশিত দলীয় প্যাডে সিলমোহরযুক্ত রংপুরের পীরগাছা উপজেলা বিএনপি সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গা স্বাক্ষরিত জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে দেয়া তালিকা থেকেই সারের ডিলার নিয়োগ দিলো কৃষি মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে ৮টি ইউনিয়নে তালিকার এক নম্বর এবং একটি ইউনিয়নে ২ নম্বর ব্যক্তিকে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে সুপারিশের ১ নম্বর ক্রম হিসেবে সারের ডিলারের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। 

Advertisement

এদের মধ্যে রয়েছেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গা ও সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেসের স্ত্রী, এক ইউনিয়ন সভাপতির অনার্স পড়ুয়া মেয়ে, এক ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের শ্বশুর, সিনিয়র সহ-সভাপতির ছেলে, একজন সাবেক সভাপতি, দুজন সাধারণ সম্পাদক এবং একজন সহ-কোষাধ্যক্ষ। 

গত ৬ অক্টোবর ‘পীরগাছায় সভাপতির স্বাক্ষরে দলীয় প্যাডে সার ডিলারের জন্য ১৯ জনের নাম’ শিরোনামে সংবাদ প্রচার করে দৈনিক নয়া দিগন্ত।

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত কৃষি অর্থনীতিবিদ শাহনাজ আখতার স্বাক্ষরিত তালিকায় বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। 

কৃষি মন্ত্রণালয়ের ১২.০০.০০০০.০৩১.০০০০.০০৬.২৬-১৪৬ নং স্মারকে এই অনুমোদন দেয়া হয়। এতে বলা হয়, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, রংপুর-এর গত ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের ০৫.৫৫.৮৫০০.০০০.০০৬.০২.০০০৯.২৬.৭৮৫ নং স্মারকের পরিপ্রেক্ষিতে ‘জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি’ কর্তৃক সুপারিশকৃত এবং ‘সার ডিলার সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটি’ কর্তৃক অনুমোদিত আবেদনকারীদের অনুকূলে অস্থায়ীভিত্তিতে শর্তাবলী প্রতিপালন সাপেক্ষে সার ডিলার নিয়োগের পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।

গত ১৭ আগস্ট পীরগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গা স্বাক্ষরিত ৯টি ওয়ার্ডের জন্য ১৯ জনের একটি তালিকা জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও কৃষি অফিসারের কাছে জমা দিয়েছিলেন। এ নিয়ে তালিকাসহ গত ৬ অক্টোবর প্রতিবেদন প্রকাশ করে নয়া দিগন্ত। 

প্রতিবেদকের হাতে থাকা পীরগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি স্বাক্ষরিত তালিকার মধ্যে ৮টি ওয়ার্ডে ১ নম্বর এবং ১টি ওয়ার্ডে ২ নম্বর সুপারিশ করা নামের হুবহু মিল পাওয়া গেছে।

দুটি তালিকা ঘেঁটে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গার স্বাক্ষরিত দলীয় প্যাডে তাম্বুলপুর ইউনিয়নের জন্য ৩ জনের নামের ১ নম্বর ক্রমিকে দেয়া হয়েছিল ওই ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের নুরুল আমীনের মেয়ে মোছা: সুইটি বেগমকে। তিনি উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেসের স্ত্রী। কৃষি মন্ত্রণালয় তালিকায় তাকেই সুপারিশের ১ নম্বর ক্রমে জেলা কমিটির সুপারিশ হিসেবে উল্লেখ করে সার ডিলার হিসেবে অনুমোদন দিয়েছে। তার প্রতিষ্ঠানের নাম মেসার্স শামান্তা অ্যান্ড সিফা ট্রেডার্স।

পীরগাছা সদর ইউনিয়নের জন্য উপজেলা বিএনপি সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গার তালিকায় তিনজনের নামের মধ্যে ১ নম্বর ক্রমিকে দেয়া হয়েছিল ৯ নম্বর ওয়ার্ডের অনন্তরাম গ্রামের মোছা: সুলতানা ফেরদৌসিকে। তিনি উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গার স্ত্রী। এখানে স্বামী নিজেই স্ত্রীকে সুপারিশ করেছিলেন ১ নম্বর ক্রম হিসেবে। কৃষি মন্ত্রণালয়ও তাকেই জেলা কমিটির ১ নম্বর সুপারিশ হিসেবে ওই ইউনিয়নের জন্য সারের ডিলার অনুমোদন দিয়েছে। তার প্রতিষ্ঠানের নাম রিয়া এন্টারপ্রাইজ।

কল্যাণী ইউনিয়নের জন্য উপজেলা বিএনপি সভাপতি স্বাক্ষরিত তালিকায় দুজনের নামের মধ্যে ১ নম্বর ক্রমিকে দেয়া ছিল ইউনিয়নটির ৪ নম্বর ওয়ার্ডের স্ব-চাষ গ্রামের মরহুম আরমান আলীর ছেলে জিকরুল আমিনকে। তিনি ওই ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি। কৃষি মন্ত্রণালয়ও তাকে সুপারিশের ১ নম্বর ক্রম হিসেবে সারের ডিলার অনুমোদন দিয়েছে। তার প্রতিষ্ঠানের নাম বেলি ফার্টিলাইজার।

কান্দি ইউনিয়ন থেকে উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলামের স্বাক্ষরিত তালিকায় ছিল একজনের নাম। তিনি ওই ইউনিয়নের ৫ নংম্বর ওয়ার্ডের তালুক কান্দি নিজপাড়া গ্রামের আব্দুল জলিলের ছেলে আতাউর রহমান। তিনি ওই ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। তার বড় ভাই আনিছুর রহমান ভুট্টু ওই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি। তাকেই কৃষি মন্ত্রণালয়ও সারের ডিলার হিসেবে সুপারিশের ১ নম্বর ক্রম হিসেবে অনুমোদন দিয়েছে। তার প্রতিষ্ঠানের নাম মেসার্স সান ট্রেডার্স।

উপজেলা বিএনপির সভাপতি স্বাক্ষরিত তালিকায় পারুল ইউনিয়ন থেকে দুজনের মধ্যে ১ নম্বর ক্রমিকে দেয়া হয়েছিল ৪ নম্বর ওয়ার্ডের তালুক পারুল গ্রামের তাহারত উল্লাহর ছেলে আব্দুল মতিন সরকারেক। তিনি ওই ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। কৃষি মন্ত্রণালয় তাকেই সুপারিশের ১ নম্বর ক্রম হিসেবে সারের ডিলার অনুমোদন দিয়েছে। তার প্রতিষ্ঠানের নাম নুহা ট্রেডার্স।

কৈকুড়ী ইউনিয়ন থেকেও উপজেলা বিএনপি স্বাক্ষরিত তালিকায় দুজনের মধ্যে ১ নম্বর ক্রমিকে দেয়া হয়েছিল ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চৌধুরী রানী গ্রামের মীর তৌফিক হাসানকে। তিনি ওই ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি মীর আফসার আলীর ছেলে। কৃষি মন্ত্রণালয়ও সুপারিশের ১ নম্বর ক্রম হিসেবে তাকে সারের ডিলার হিসেবে অনুমোদন দিয়েছে। তার প্রতিষ্ঠানের নাম মীর তৌফিক ট্রেডার্স।

ছাওলা ইউনিয়ন থেকেও আমিনুল ইসলাম রাঙ্গা স্বাক্ষরিত তালিকায় দুজনের মধ্যে ১ নম্বর ক্রমিকে দেয়া হয়েছিল ৮ নম্বর ওয়ার্ডের আদম চাড়ালপাড়া গ্রামের আবু তাহেরের ছেলে মো: জাকির হোসেনকে। তিনি ওই ইউনিয়ন বিএনপির সহ-কোষাধ্যক্ষ। কৃষি মন্ত্রণালয় তাকেও সুপারিশের ১ নম্বর ক্রম উল্লেখ করে সারের ডিলারের অনুমোদন দিয়েছে। তার প্রতিষ্ঠানের নাম মেসার্স আয়মান ট্রেডার্স।

ইটাকুমারী ইউনিয়ন থেকে উপজেলা বিএনপির সভাপতির স্বাক্ষরিত তালিকার দুজনের মধ্যে ২ নম্বর ক্রমিকে দেয়া হয়েছিল ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মধুরাম গ্রামের মরহুম ময়েন উদ্দিনের ছেলে মো: আলিমুদ্দিন ময়েন মোল্লার নাম। তার ছোট জামাতা মাসুদ রানা ওই ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। আলিম উদ্দিন জাতীয় পার্টির উপজেলা সভাপতি মাহবুবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ। কৃষি মন্ত্রণালয় তাকে জেলা কমিটির সুপারিশের ১ নম্বর ক্রম হিসেবে সার ডিলার অনুমোদন দিয়েছে।

অন্নদানগর ইউনিয়ন থেকেও উপজেলা বিএনপির সভাপতি স্বাক্ষরিত তালিকার দুজনের মধ্যে ১ নম্বর ক্রমিকে ৯ নম্বর ওয়ার্ডের জগজীবন এলাকার জয়িতা আক্তার জিনি। তিনি ওই ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জিল্লুর রহমানের প্রথম স্ত্রীর কন্যা এবং দিনাজপুর সরকারি কলেজের বাংলা চতুর্থ বর্ষের অনার্সের শিক্ষার্থী। তাকেও সুপারিশের ১ নম্বর ক্রম হিসেবে সার ডিলার হিসেবে অনুমোদন দিয়েছে সরকার। তার প্রতিষ্ঠানের নাম জয়িতা সার বিতান।

উপজেলা বিএনপির সভাপতি স্বাক্ষরিত নামের তালিকার সাথে কৃষি মন্ত্রণালয়ের তালিকার হুবহু মিলের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গা জানান, ‘সার ডিলার নিয়োগের জন্য আমি কোনো তালিকা কোথাও দেই নাই।’ 

প্রতিবেদকের কাছে থাকা তালিকাটি তার কাছে পাঠালে তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন।

দুটি তালিকার হুবহু মিলের বিষয়ে উপজেলা কৃষি অফিসার নিলুফা ইয়াছমিন জানান, ‘উপজেলা সার কমিটির চুলচেরা বিশ্লেষণ করে তিনটি করে নাম ডিসি অফিসে পাঠানো হয়েছিল। সেখান থেকে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি কৃষি মন্ত্রণালয়ের পাঠিয়েছে। এরপর নীতিমালা অনুযায়ী কৃষি মন্ত্রণালয় তা প্রকাশ করেছে।’

হুবহু তালিকার বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: জায়িদ ইমরুল মোজাক্কিন জানান, ‘তালিকা কীভাবে মিললো সেটা আমার জানা নেই। আমরা উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভায় আবেদিত তালিকা বিচার-বিশ্লেষণ করে তিনজনের নাম ডিসি অফিসে পাঠিয়েছি।’

এ ব্যাপারে জানতে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ডিসি মিজ ইসরাত জাহানের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। দুটি তালিকাই তার অফিসিয়াল হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে পাঠিয়ে মন্তব্য জানতে চাইলেও তিনি উত্তর দেননি।

উপজেলাটিতে প্রতিটি ইউনিয়নে সারের ডিলার নিয়োগের জন্য উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে একাধিক ব্যক্তির কাছে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা গ্রহণের অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চাউর হয়েছে। 

সার ডিলারের জন্য উপজেলা সভাপতির টাকা গ্রহণের বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করায় রংপুর জেলা মিডিয়া সেল সদস্য ও কান্দি ইউনিয়ন বিএনপির ৫ নম্বর ওয়ার্ডের প্রচার সম্পাদক জিয়াউর রহমানকে গত ২৩ সেপ্টেম্বর শোকজ নোটিশ দেন ওই ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম ও সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান। 

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ২৫ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওঠা সারের ডিলার নিয়োগে টাকা গ্রহণের বিষয়টি মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবি করে সংবাদ সম্মেলন করেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গা ও সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেস। 

এই উপজেলাটিতে সারের ডিলার নিয়োগে প্রতিটি ইউনিয়নে একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা গ্রহণের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন ভাইরাল।