হোসেইন মো: সারোয়ার সানি, জাপান, প্রবাস, প্রবাসী
হোসেইন মো: সারোয়ার সানি। নয়া দিগন্ত

হোসেইন মো: সারোয়ার সানি। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে জাপান প্রবাসী। সফল ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার এবং জাপান রেমিট ফাইন্যান্স (জেআরএফ) গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি মনে করেন বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করতে এবং প্রবাসীদের বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রয়োজন নীতিগত সংস্কার ও দূরদর্শী পরিকল্পনা। বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও ডিজিটাল ব্যাংকিং নিয়ে তার সুদূরপ্রসারী ভাবনাগুলো নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। আলাপকালে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রবাসী রেমিট্যান্সের পূর্ণ সদ্ব্যবহার এবং জাপান-বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের অপার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন সারোয়ার সানি। কানাডার খ্যাতনামা ব্যাংক অব নোভা স্কোশিয়ায় দীর্ঘ ১২ বছরের বেশি সময় ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকিংয়ের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এই বাংলাদেশী উদ্যোক্তা জাপান, কোরিয়া, কানাডা, মালয়েশিয়া, ইতালি ও ফিলিপাইনে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফর ঘিরে তার রয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। স্থানীয় সময় সোমবার বিকেলে জাপানের রাজধানী টোকিওর ইম্পেরিয়াল হোটেলে তার দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা ও বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা হয়। তার বিশেষ চিন্তাভাবনা পাঠকদের জন্য নিচে তুলে ধরা হলো।

Advertisement

প্রবাসীদের বিশাল সম্পদ ও হুন্ডি রোধে ‘ডিজিটাল ব্যাংকিং’ মডেল
বর্তমানে প্রায় ১ কোটি প্রবাসী বিশ্বজুড়ে বসবাস করছেন এবং তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সের মাধ্যমেই দেশের অর্থনীতি সচল রয়েছে। তবে প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার নানা জটিলতার কারণে এখনো বড় একটি অংশ হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাঠাতে বাধ্য হচ্ছেন।

এ বিষয়ে সারোয়ার হোসেন সানি বলেন, বর্তমানে আমরা প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাচ্ছি। কিন্তু সঠিক ও ডিজিটাল চ্যানেল তৈরি করা গেলে এটি সহজেই ৬০ থেকে ৭০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হতে পারে। তখন আমাদের ট্রেড সারপ্লাস হবে এবং টাকার মান অনেক শক্তিশালী হবে।

প্রথাগত ব্যাংকিং ব্যবস্থার ত্রুটি তুলে ধরে তিনি বলেন, ব্যাংকে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে টাকা তোলার চেয়ে ডিজিটাল ওয়ালেট এবং ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের মধ্যে অ্যাপ কানেক্টিভিটি থাকা জরুরি। আমার প্রস্তাবিত ‘জাপান বাংলা ডিজিটাল ব্যাংক’ বা ওয়ালেট ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রবাসী ১০ হাজার টাকা পাঠালে প্রাপকের ওয়ালেটে মাত্র ৫ মিনিটের মধ্যে তা পৌঁছে যাবে। ২৪ ঘণ্টা যেকোনো সময় সেই টাকা অনলাইন শপিং বা যেকোনো প্রয়োজনে ব্যবহার করা যাবে। এতে হুন্ডি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যাবে।

জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ ও ব্র্যান্ডিংয়ের ঘাটতি দূর করা
বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অত্যন্ত চমৎকার হলেও জাপানি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের সঠিক চিত্র তুলে ধরার ক্ষেত্রে এখনো কিছু ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন এই অভিজ্ঞ ব্যাংকার।

তার মতে, জাপানি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত মালয়েশিয়া বা ভিয়েতনামে বেশি বিনিয়োগ করেন। কারণ, সেখানে তাদের প্রচার বা পিআর (পাবলিক রিলেশন) অনেক শক্তিশালী। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ বা গ্যাসের কিছু সঙ্কট থাকলেও যেকোনো সমস্যা সমাধান করা মানুষের কাজ। সুতরাং জাপানিদের কাছে বাংলাদেশকে সঠিকভাবে ব্র্যান্ডিং করতে হবে। জাপানে বসবাসরত বাংলাদেশীরাই এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সেতু হিসেবে কাজ করতে পারেন, কারণ প্রবাসীদের প্রতি তাদের আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, সরকারের উচিত আরো বেশি ইনভেস্টমেন্ট সেমিনার আয়োজন করা, দূতাবাসগুলোকে আরো সক্রিয় করা এবং জাপানি প্রযুক্তি—বিশেষ করে এআই-ভিত্তিক প্রযুক্তি ও আধুনিক জ্ঞান বাংলাদেশে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেয়া।

গাড়ি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ‘টিটি’ ব্যবসার সুযোগ
বাংলাদেশের অনেক ব্যবসায়ী জাপান থেকে গাড়ি আমদানি করতে চান, কিন্তু ব্যাংকের ক্রেডিট রেটিং কম থাকায় অনেক সময় এলসি গ্রহণ করতে সমস্যা হয়। এই সঙ্কট উত্তরণে সরকারের নীতিগত সহায়তার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। টিটির (টেলিগ্রাফিক ট্রান্সফার) মাধ্যমে অন্তত ২ লাখ ৫ হাজার ডলার পর্যন্ত লেনদেনের একটা লিমিট তৈরি করে দিলে আমাদের এক্সপোর্টাররা সুন্দরভাবে গাড়ি বা অন্যান্য পণ্য এক্সপোর্ট করতে পারবেন এবং সম্পূর্ণ বৈধ পথে হুন্ডি ছাড়া টাকা লেনদেন সম্ভব হবে।

আমদানিতে শুল্ক কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব
সানোয়ার সানি দেশের বর্তমান অর্থনীতি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, বাংলাদেশের ইনফ্লেশন বা মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য ইম্পোর্ট ট্যাক্সের উপরে হাত দিতে হবে। কারণ, অতিরিক্ত আমদানি শুল্কের বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ কনজ্যুমারের কাঁধেই পড়ে। ইম্পোর্ট ট্যাক্স কমিয়ে লোকাল রেভিনিউ তৈরি করতে পারলে দেশের ইনফ্লেশন ১০.৫% থেকে কমে ৫%-এর কোঠায় নেমে আসবে।

আগামী দিনের স্বপ্ন : ওয়ান ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি ও তারেক রহমানের জাপান সফর 
আগামী ১০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি ‘ওয়ান ট্রিলিয়ন ডলার’ অর্থনীতির দেশে রূপান্তর করার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সে বিষয়ে অত্যন্ত আশাবাদী এই অর্থনীতিবিদ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য জাপান সফরকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্ক আরো সুদৃঢ় হবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে অনেক ভালো পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ভালো কিছু করতে হলে কিছুটা সময় লাগবেই, তাই আমাদের ধৈর্য ধারণ করতে হবে।

তরুণ প্রজন্ম ও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি জানান, জাপান সরকার বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে আরো বেশি শিক্ষার্থী গ্রহণে আগ্রহী। জাপানে বাংলাদেশীদের জিরো ক্রাইম রেট এবং কঠোর পরিশ্রমী মানসিকতা জাপানি সমাজে অত্যন্ত প্রশংসিত। সঠিক প্রযুক্তিগত শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জন করে দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে আমাদের যুবসমাজ।