কারফিউ
নিরাপত্তা কর্মীরা। নয়া দিগন্ত

ফ্রান্সে সাম্প্রতিক সহিংসতা, সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনার পর জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশটির বিভিন্ন শহরে কারফিউ ও চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। 

Advertisement

সোমবার (১৯ অক্টোবর) থেকে রাজধানী প্যারিসসহ লিয়ঁ, নিস, লিল এবং কয়েকটি মাঝারি শহরে বিভিন্ন সময়সীমায় এসব বিধিনিষেধ কার্যকর হয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় আরো কয়েকটি এলাকায় নতুন করে কারফিউ জারির সম্ভাবনা রয়েছে।

গত সপ্তাহান্তে শহরাঞ্চলে সহিংসতা এবং ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পর প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের স্থানীয় পরিস্থিতি অনুযায়ী কারফিউ জারির ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন। সোমবার প্রধানমন্ত্রীর সরকারি কার্যালয় মাতিনিয়োঁতে জরুরি বৈঠকের পর এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি এলাকার নিরাপত্তাঝুঁকি বিবেচনা করে কারফিউয়ের সময়সীমা ও ভৌগোলিক সীমানা নির্ধারণ করা হবে।

রাজধানী প্যারিসে সোমবার রাত ১১টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত নির্দিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কারফিউ কার্যকরের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এর আওতায় চ্যাম্পস-এলিসে, রাষ্ট্রপতির বাসভবনসংলগ্ন এলাকা, জাতীয় পরিষদ, সিনেট, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, লে আল এলাকা, প্যারিসের সিটি হল, বিচারিক স্থাপনা, পুলিশ সদর দফতর এবং ইতালি, রিপাবলিক, বুর্স ও বাস্তিল চত্বরের আশপাশের এলাকা রয়েছে। শহরের প্রধান রেলস্টেশনগুলোর আশপাশেও বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হবে। বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের আশঙ্কায় নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে। অননুমোদিত মিছিল ও জনসমাবেশ নিষিদ্ধ রাখার পাশাপাশি সন্ধ্যায় গণপরিবহনের কিছু পরিষেবা আগেভাগে বন্ধ করার ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছে।

লিয়ঁ শহরে মঙ্গলবার রাত ৯টা থেকে বুধবার সকাল ৬টা পর্যন্ত শহরের কেন্দ্রের একটি অংশে কারফিউ কার্যকর হবে। এ সময় সংশ্লিষ্ট এলাকায় মানুষের চলাচল ও জনসাধারণের রাস্তায় অবস্থান নিষিদ্ধ থাকবে। সোমবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত বিক্ষোভ ও দাবিদাওয়াভিত্তিক সমাবেশেও নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বার, রেস্তোরাঁ, সিনেমা হল ও বিনোদনকেন্দ্র খোলা থাকবে এবং গণপরিবহন ও যানবাহন চলাচল করতে পারবে।

নিস শহরে সোমবার রাত ৯টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য কারফিউ জারি করা হয়েছে। শহরের কেন্দ্র থেকে ওল্ড নিস এবং রু ত্রাশেল থেকে গার দ্যু সুদ এলাকার মধ্যবর্তী অংশে এ বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হবে। আগামী ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত এ ব্যবস্থা বহাল রাখার কথা জানিয়েছেন শহরটির মেয়র এরিক সিওত্তি। অন্যদিকে, লিলে সোমবার রাত ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৬টা পর্যন্ত কারফিউ কার্যকর করা হয়েছে। উত্তর ফ্রান্সের দুয়াই, দেনাঁ ও ওয়াতিনিয়েও কয়েকটি নির্দিষ্ট এলাকায় একই ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

মার্সেইয়ে আপাতত রাতভর কারফিউয়ের পরিবর্তে শহরের কেন্দ্র ও বাণিজ্যিক এলাকায় দুপুর ১২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত প্রতিবাদমূলক সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গত ৪৮ ঘণ্টায় যেসব এলাকায় লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোতে বিশেষ নজরদারি চলছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে নির্দিষ্ট এলাকায় রাতের কারফিউ জারি করা হতে পারে। বোর্দো শহরের কেন্দ্রের কয়েকটি সড়কে অভিভাবক বা দায়িত্বশীল প্রাপ্তবয়স্কের সঙ্গ ছাড়া অপ্রাপ্তবয়স্কদের চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়ে ছয় দিন এ ব্যবস্থা কার্যকর থাকার কথা। নির্ধারিত সময় রাত ১০টা থেকে সকাল ৭টা।

ফ্রান্সের মূল ভূখণ্ডের বাইরেও নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। ক্যারিবীয় অঞ্চলের গুয়াদেলুপে পয়েন্ত-আ-পিত্র ও লে আবিম শহরে অভিভাবক বা দায়িত্বশীল প্রাপ্তবয়স্কের সঙ্গ ছাড়া ১৮ বছরের কম বয়সীদের রাত ৮টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এ ছাড়া লিমোজ, কুলেন ও উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি শহরে অপ্রাপ্তবয়স্কদের চলাচল নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। তবে সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, লিমোজ ও তুলুজে তখনও নতুন কোনো কারফিউ ঘোষণার খবর পাওয়া যায়নি। লিমোজের ঐতিহাসিক সিটি হল ১৭ অক্টোবরের সহিংসতার সময় আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নুর শুক্রবার শহরটি পরিদর্শনে যাওয়ার কথা রয়েছে।

কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী, কারফিউ চলাকালে জরুরি চিকিৎসা, অপরিহার্য পারিবারিক প্রয়োজন, অসহায় ব্যক্তিকে সহায়তা এবং যথাযথ প্রমাণসহ জরুরি পেশাগত কাজে যাতায়াতের মতো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ছাড় দেয়া হতে পারে। বিধিনিষেধ অমান্য করলে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী জরিমানা বা অন্যান্য আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে। একই সঙ্গে সহিংসতা প্রতিরোধে আতশবাজি ও বিনোদনমূলক বিস্ফোরকসামগ্রী, পেট্রল বহন এবং খুচরা পর্যায়ে দাহ্য পদার্থ বিক্রির ওপরও বিভিন্ন এলাকায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। পুলিশ ও জেন্ডারমেরির অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চলছে।

ফরাসি সরকারের এসব পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো রাতের বেলায় সহিংসতা, লুটপাট ও সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি প্রতিরোধ করা। তবে সব শহরে একই ধরনের কারফিউ কার্যকর করা হয়নি। কোথাও নির্দিষ্ট এলাকায় সবার চলাচল সীমিত করা হয়েছে, আবার কোথাও কেবল অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্কদের চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের মূল্যায়নের ভিত্তিতে আগামী দিনগুলোতে নতুন এলাকায় বিধিনিষেধ আরোপ কিংবা বিদ্যমান ব্যবস্থা পরিবর্তন করা হতে পারে।

এদিকে, ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সহিংসতার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর কাছে পদত্যাগের প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে প্রেসিডেন্ট তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন উঠেছে, আইনগতভাবে কোনো মন্ত্রীকে পদে বহাল থাকতে বাধ্য করতে পারেন কি না রাষ্ট্রপ্রধান।

সোমবার, ১৯ অক্টোবর, জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে আয়োজিত বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে সপ্তাহান্তে বিভিন্ন শহরে সংঘটিত সহিংসতা ও লুটপাটের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতির ঘাটতি এবং কয়েকটি শহরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ হারানোর বিষয়টি স্বীকার করেন। ঘটনার জন্য নিজেকে ‘যা কিছু ঘটছে, তার সবকিছুর জন্য দায়ী’ বলে উল্লেখ করে তিনি প্রেসিডেন্টের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নেতৃত্ব ও কমান্ডব্যবস্থায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ তার পদত্যাগের প্রস্তাব গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান।

ফ্রান্সের বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্বাভাবিক জনজীবন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখা। কারফিউ ও অন্যান্য বিধিনিষেধ কত দিন বহাল থাকবে, তা নির্ভর করবে সহিংসতার পরিস্থিতি এবং স্থানীয় প্রশাসনের পরবর্তী মূল্যায়নের ওপর।