
ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে দেশজুড়ে বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও লুটপাটের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ।
রোববার (১৮ অক্টোবর) রাত ৮টায় এই ভাষণ দেন তিনি।
শনিবারের বিক্ষোভে প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। একই সাথে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক উদ্বেগের সমাধানে আলোচনার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
ভাষণের আগে এলিসি প্রাসাদে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সাথে বৈঠক করেন ম্যাক্রোঁ। নিরাপত্তা পরিস্থিতি, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সহায়তা এবং জনজীবনে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়গুলো আলোচনায় গুরুত্ব পায়।
শনিবারের বিক্ষোভে শিক্ষার্থী, শ্রমিক সংগঠন, ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সমর্থক ও অভিভাবকেরা অংশ নেন। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষার পরিবেশ ও বিভিন্ন সামাজিক দাবিতে তাঁরা রাস্তায় নামেন। তবে একপর্যায়ে বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শুধু প্যারিসেই প্রায় এক লাখ ১০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। পুলিশ প্রিফেকচারের হিসাবে, রাজধানীতে ৮৫৫ জনকে আটক করা হয়েছে। প্যারিসের সরকারি কৌঁসুলির দফতরের তথ্য অনুযায়ী, তাদের মধ্যে ৫৫৭ জনকে পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়েছে, যাদের ১৫১ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক।
মার্সেই, লিয়োঁ, বোর্দো, রেন, স্ত্রাসবুর্গ, গ্রেনোবল, নিস ও লিমোজসহ বিভিন্ন শহরেও সহিংসতার খবর পাওয়া যায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে দুই হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। সংঘর্ষে ৬০০ জনের বেশি পুলিশ, জেন্ডারমেরি সদস্য ও অগ্নিনির্বাপণকর্মী আহত হয়েছেন বলে প্রাথমিক হিসাবে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা নিয়েও মতপার্থক্য রয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, সারাদেশে প্রায় পাঁচ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। অন্যদিকে, আয়োজকদের দাবি, এ সংখ্যা প্রায় আট লাখ।
সহিংসতার প্রভাব পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যেও। ফরাসি বাণিজ্য ও বিতরণ খাতের একটি সংগঠনের হিসাবে, প্রায় এক হাজার ৫০০ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংগঠনটির সভাপতি আলেকজান্দ্র বোম্বার আশঙ্কা, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েক শ মিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছাতে পারে।
ভাষণে ম্যাক্রোঁ দোকানপাটে লুটপাট, সরকারি ভবনে হামলা ও ভাঙচুরের নিন্দা জানান। লিমোজের পৌরসভায় অগ্নিসংযোগ, লিয়োঁর পর্যটন দফতরে হামলা, মার্সেইয়ের পৌরসভায় অনুপ্রবেশ এবং বোর্দোতে প্রিফেক্টের বাসভবনে হামলার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। আহত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন প্রেসিডেন্ট।
সহিংসতার কারণ, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং নিরাপত্তা প্রস্তুতিতে কোনো ঘাটতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার কথা বলেন। পরিস্থিতি অনুযায়ী, প্রিফেক্টরা মেয়রদের সাথে সমন্বয় করে নিরাপত্তা জোরদার করতে পারবেন এবং প্রয়োজনে নির্দিষ্ট সমাবেশ নিষিদ্ধ করার ব্যবস্থাও বিবেচনা করা হতে পারে।
অন্যদিকে, জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির দাম, পড়াশোনার খরচ ও কর্মসংস্থান নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগের বিষয়টিও ভাষণে উঠে আসে। ম্যাক্রোঁর বক্তব্যে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের দাবি এবং সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ডের মধ্যে পার্থক্য করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শ্রমিক সংগঠন, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসনের সাথে আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবসম্মত সমাধান খোঁজার উদ্যোগের কথাও তুলে ধরা হয়।
তবে বিক্ষোভ মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। পরিবেশবাদী নেত্রী মারিন তোন্দেলিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজের পদত্যাগ দাবি করেছেন। তার অভিযোগ, সহিংসতা প্রতিরোধে সরকার যথাযথ প্রস্তুতি নিতে পারেনি। অন্যদিকে, ফরাসি সিনেটে সমাজতান্ত্রিক দলের নেতা পাত্রিক কানার জনশৃঙ্খলা রক্ষায় গৃহীত ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্কের আহ্বান জানিয়েছেন।
পরিস্থিতি পর্যালোচনায় সোমবার সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নুর নেতৃত্বে আন্তমন্ত্রণালয় সঙ্কট ব্যবস্থাপনা বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এদিকে, সোমবার থেকে বুধবার পর্যন্ত উপসাগরীয় অঞ্চলের চারটি দেশ সফরের কর্মসূচী বজায় রেখেছেন ম্যাক্রোঁ। অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির কারণে সফরসূচীতে পরিবর্তন আসে কি না, তা নিয়ে নজর রয়েছে রাজনৈতিক মহলের।
এদিকে, আগামী ৫ নভেম্বর দেশব্যাপী আন্তখাত ধর্মঘট ও বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে সিএফডিটি, সিজিটি, এফও, ইউএনএসএ ও এফএসইউসহ কয়েকটি শ্রমিক সংগঠন। মজুরি বৃদ্ধি, সরকারি পরিষেবা, কর্মসংস্থান ও শিল্প খাতের সুরক্ষার দাবিতে এ কর্মসূচী ঘোষণা করা হয়েছে। সিজিটি আন্দোলন শান্তিপূর্ণভাবে চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
সব মিলিয়ে ফ্রান্সের সামনে এখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ প্রশমনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ম্যাক্রোঁর ভাষণ ও সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ চলমান সামাজিক অস্থিরতা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








