
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের পঞ্চম অ্যারোঁদিসমাঁয় জার্দ্যাঁ দে প্লান্তের কাছে অবস্থিত ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড মসজিদ অব প্যারিস শতবর্ষে পদার্পণ করেছে। এই মসজিদটি মূলত প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ফ্রান্সের হয়ে যুদ্ধ করে নিহত মুসলিম সৈনিকদের স্মৃতিতে গড়ে ওঠা এক ঐতিহাসিক স্থাপত্য।
১৯২৬ সালের ১৫ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় গ্র্যান্ড মসজিদ দ্য প্যারিস। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন ফরাসি প্রেসিডেন্ট গাস্তোঁ দোমের্গসহ ফ্রান্সের রাজনৈতিক, সামাজিক ও মুসলিম সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। উত্তর আফ্রিকার স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই মসজিদ এক শতাব্দী ধরে শুধু মুসলিমদের ধর্মীয় উপাসনালয় হিসেবেই নয়, বরং ফ্রান্সের ইতিহাসে মুসলিম সম্প্রদায়ের উপস্থিতি, অবদান ও স্মৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
এই মসজিদ নির্মাণের পেছনে রয়েছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের এক বেদনাময় অধ্যায়। ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত চলা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ফ্রান্সের হয়ে বিপুলসংখ্যক মুসলিম সৈনিক যুদ্ধ করেছিলেন। উত্তর আফ্রিকা, সাব-সাহারান আফ্রিকা, গ্রেটার সিরিয়া ও মাদাগাস্কারসহ তৎকালীন ফরাসি উপনিবেশগুলো থেকে আসা বহু মুসলিম সেনা ফরাসি বাহিনীতে যোগ দেন। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধে প্রায় এক লাখ মুসলিম নিহত হয়েছিল।
তাদের স্মৃতিকে সম্মান জানানো এবং ফ্রান্সে বসবাসরত মুসলিমদের জন্য একটি মর্যাদাপূর্ণ উপাসনালয় প্রতিষ্ঠার ধারণা থেকেই প্যারিসে একটি বড় মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ জোরালো হয়। তবে এই ধারণা এক দিনে বাস্তবায়িত হয়নি। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকেই প্যারিসে মুসলিমদের জন্য একটি মসজিদ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা চলছিল। দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রচেষ্টার পর অবশেষে প্রকল্পটি বাস্তব রূপ পায়।
মসজিদ নির্মাণের অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন ফরাসি সাংবাদিক ও অভিযাত্রী পল বুরদারি। ঔপনিবেশিক বিষয় নিয়ে লেখালেখির পাশাপাশি তিনি প্যারিসে একটি মসজিদ নির্মাণের পক্ষে দীর্ঘদিন প্রচার চালান। এই প্রকল্পের পক্ষে রাজনৈতিক সমর্থন গড়ে তুলতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীতে ফরাসি সিনেটর ও বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এই উদ্যোগের সাথে যুক্ত হন এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রকল্পটির অনুমোদনের পথ সুগম হয়।
গ্র্যান্ড মসজিদ দ্য প্যারিসের নির্মাণকালও ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯০৫ সালে ফ্রান্সে গির্জা ও রাষ্ট্রের বিচ্ছেদসংক্রান্ত ঐতিহাসিক আইন কার্যকর হওয়ার পর দেশটির রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় ধর্ম ও সরকারের সম্পর্ক নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হয়। এর পরও রাষ্ট্রের উদ্যোগে প্যারিসে একটি মসজিদ নির্মাণ এবং এর জন্য সরকারি সহায়তা প্রদান ছিল সে সময়ের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
১৯২২ সালে প্যারিসের লাতিন কোয়ার্টারে মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। পরবর্তী চার বছর ধরে নির্মাণকাজ চলে। মসজিদের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, উত্তর আফ্রিকার মাগরেব অঞ্চল থেকে আসা প্রায় ৪৫০ জন শ্রমিক ও কারিগর এই স্থাপনা নির্মাণে অংশ নেন। তাদের দক্ষতা ও ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পের মাধ্যমে গড়ে ওঠে এমন একটি স্থাপত্য, যেখানে ফরাসি রাজধানীর কেন্দ্রেই উত্তর আফ্রিকার সাংস্কৃতিক ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
স্থাপত্যের দিক থেকেও গ্র্যান্ড মসজিদ দ্য প্যারিস বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। এর উঁচু মিনার, প্রার্থনাকক্ষ, খিলান, সবুজ টালির ছাদ এবং বিস্তৃত বাগান মসজিদটিকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে। দেয়াল ও অভ্যন্তরীণ অংশে উত্তর আফ্রিকার ঐতিহ্যবাহী জ্যামিতিক নকশা ও টাইলের ব্যবহার রয়েছে। মরক্কোসহ উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলের স্থাপত্যশৈলীর সাথে এর দৃশ্যমান মিল রয়েছে।
মসজিদের স্থাপত্য পরিকল্পনা ও নির্মাণে ফরাসি স্থপতি মরিস মানতু, মরিস ত্রঁশাঁ দ্য লুনেল, শার্ল হ্যুব ও রবার ফুরনে যুক্ত ছিলেন। তাদের পরিকল্পনায় এমন একটি স্থাপনা তৈরি করা হয়, যা একইসাথে ইসলামী স্থাপত্য ঐতিহ্যকে ধারণ করে এবং প্যারিসের নগর-পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্য রাখে। ফলে মসজিদটি কেবল একটি ধর্মীয় ভবন নয়, বরং পূর্ব ও পশ্চিমের স্থাপত্য ও সংস্কৃতির মিলনের একটি দৃশ্যমান নিদর্শন হয়ে ওঠে।
ইসলামি স্থাপত্য বিষয়ে লেখক এরিক ব্রুগের মতে, মসজিদটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো উত্তর আফ্রিকার স্থাপত্য ঐতিহ্যের প্রতি এর দৃঢ় আনুগত্য। তার পর্যবেক্ষণে, মসজিদে প্রবেশ করলে দর্শনার্থীদের কাছে উত্তর আফ্রিকার কোনো স্থানে পৌঁছে যাওয়ার মতো অনুভূতি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে অমুসলিম পর্যটকদের জন্য মসজিদের অভ্যন্তরীণ স্থাপত্য ইসলামি সংস্কৃতি ও কারুশিল্প সম্পর্কে জানার একটি সুযোগ তৈরি করে।
তবে গ্র্যান্ড মসজিদ দ্য প্যারিসের গুরুত্ব শুধু এর স্থাপত্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি দীর্ঘদিন ধরে ফ্রান্সের মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। বর্তমানে এখানে প্রার্থনার পাশাপাশি রয়েছে একটি গ্রন্থাগার, সভা ও সম্মেলনের জন্য বিভিন্ন কক্ষ, হাম্মাম ও ক্যাফে। ফলে মসজিদটি ধর্মীয় কার্যক্রমের পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগেরও একটি কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
সময়ের সাথে সাথে এটি পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা দর্শনার্থীরা মসজিদের স্থাপত্য, বাগান, অলংকরণ ও ঐতিহ্য দেখতে এখানে আসেন। বিভিন্ন সময় আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ব্যক্তিরাও মসজিদটি পরিদর্শন করেছেন।
ফ্রান্সের মুসলিম ইতিহাসের সাথে মসজিদটির সম্পর্কও এর গুরুত্বকে আরো বাড়িয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মুসলিম সৈনিকদের অংশগ্রহণ ও আত্মত্যাগের স্মৃতি বহন করে নির্মিত এই স্থাপনা পরবর্তী এক শতাব্দীতে ফ্রান্সের পরিবর্তিত সামাজিক বাস্তবতারও সাক্ষী হয়েছে। ঔপনিবেশিক যুগ থেকে আধুনিক ফ্রান্স, ইউরোপে মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিকাশ এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের পরিবর্তন—সবকিছুর মধ্যেই মসজিদটি তার অস্তিত্ব ধরে রেখেছে।
এক শতাব্দী পর আজ গ্র্যান্ড মসজিদ দ্য প্যারিস তাই শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়। এটি ইতিহাস, স্মৃতি, স্থাপত্য, অভিবাসন, মুসলিম সৈনিকদের আত্মত্যাগ এবং ফ্রান্সের বহুসাংস্কৃতিক সমাজের সাথে জড়িয়ে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন। প্যারিসের ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই মসজিদ একইসাথে অতীতের স্মৃতি বহন করছে এবং বিভিন্ন সংস্কৃতি ও মানুষের মধ্যে পরিচিতি ও সংযোগ তৈরির একটি স্থান হিসেবে তার ভূমিকা অব্যাহত রেখেছে।
১৯২৬ সালে যে স্থাপনা মুসলিম সৈনিকদের স্মরণ এবং ফ্রান্সে মুসলিমদের জন্য একটি মর্যাদাপূর্ণ ধর্মীয় পরিসর তৈরির উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিল, ১০০ বছর পর সেটিই প্যারিসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি স্থাপত্য নিদর্শনে পরিণত হয়েছে। শতবর্ষে গ্র্যান্ড মসজিদ দ্য প্যারিস তাই শুধু তার বয়সের কারণে নয়, বরং এর সাথে জড়িয়ে থাকা ইতিহাস ও স্মৃতির কারণেও বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
_GDN_970x90px_English.gif&w=2048&q=75)








