তুলার সাথে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত কাশফুলের আঁশ মিশিয়ে ব্যবহারযোগ্য সুতা তৈরি এবং এতে উৎপাদন ব্যয় ১১.৭ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর সম্ভাবনা পেয়েছেন ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডুয়েট) গবেষকরা। একইসাথে লবণ ও ক্ষার ছাড়াই গরম পানি ব্যবহার করে তুলা রং করার প্রযুক্তিতে পানির অপচয় ৬৬ শতাংশ এবং দূষিত বর্জ্যপানি ৭৩ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর সম্ভাবনা দেখিয়েছেন তারা। জৈব বর্জ্যকে জ্বালানির উপযোগী কয়লায় রূপান্তরের জন্যও তৈরি করা হয়েছে বিশেষ ব্রিকুয়েট মেশিন।
বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬-এ ডুয়েটের পক্ষ থেকে উপস্থাপিত তিনটি গবেষণাভিত্তিক উদ্ভাবনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ‘ইনোভেট টু মার্কেট’ প্রতিপাদ্যে ১২-১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার নভোথিয়েটারে তিন দিনব্যাপী এ মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহজালাল খন্দকারের তত্ত্বাবধানে পিএইচডি গবেষক ইয়াসিন আরাফাত এ গবেষণা করেন। গ্রামবাংলায় সহজলভ্য কাশফুলের আঁশকে শিল্প পর্যায়ে তুলার আংশিক বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা যাচাই করা হয় এতে।
ওপেন-এন্ড রোটর স্পিনিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন অনুপাতে সুতা তৈরি করে সুতার শক্তি, প্রসারণ, সমতা, হেইরিনেস ও ত্রুটিসহ একাধিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা হয়।
পরীক্ষায় দেখা যায়, তুলার সাথে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত কাশফুল মিশিয়ে তৈরি সুতা কাপড় তৈরির জন্য উপযোগী, এমনকি ৪০ শতাংশ মিশ্রণেও বাণিজ্যিকভাবে গ্রহণযোগ্য মানের সুতা পাওয়া গেছে। পরিসংখ্যানভিত্তিক বিশ্লেষণে ২৭.৭ শতাংশ কাশফুল ও ৭২.৩ শতাংশ তুলার মিশ্রণকে সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ অনুপাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা মান ও খরচ- উভয়দিক থেকেই উপযোগী। এতে সুতার উৎপাদন খরচ প্রায় ১১.৭ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে প্রতি কেজিতে প্রায় ২.৯৮ ডলার থেকে ২.৬৩ ডলারে নামিয়ে আনা সম্ভব বলে গবেষকরা জানান।
সেচ, সার বা কীটনাশক ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে জন্মানো কাশফুল পানিনির্ভর তুলা চাষের ওপর চাপ কমিয়ে পরিবেশবান্ধব কাঁচামালের নতুন উৎস হতে পারে বলে মত দেন তারা।
দ্বিতীয় প্রজেক্টটি কাপড় ডাইং প্রক্রিয়া নিয়ে। টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো: আব্দুল হান্নানের তত্ত্বাবধানে নুসরাত জাহান খানম প্রচলিত পদ্ধতিতে ব্যবহৃত লবণ ও ক্ষারের বিকল্প হিসেবে একটি কেমিক্যালহীন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেন, যেখানে শুধু গরম পানি দিয়েই তুলা রঙ করা সম্ভব। এতে কেমিক্যাল খরচ সম্পূর্ণ বেঁচে যাওয়ার পাশাপাশি ৬৬ শতাংশ পানির অপচয় রোধ হয় এবং ৭৩ শতাংশ পর্যন্ত দূষিত বর্জ্য পানি কমে। একই রঙের পানি টানা ১০ বার পর্যন্ত পুনঃব্যবহার করা সম্ভব বলে জানান গবেষকরা, যা দেশের টেক্সটাইল শিল্পে উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় বয়ে আনতে পারে।
তৃতীয় প্রজেক্টটি খোলা জায়গায় ফেলে রাখা ময়লা-আবর্জনার পরিবেশগত সমস্যা সমাধান নিয়ে। ইনস্টিটিউট অব এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহবুবুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে শেখ রেজওয়ানুল হক তৈরি করেন ‘ব্রিকুয়েট মেশিন’, যা পচনশীল ও দাহ্য আবর্জনাকে সহজ তিনটি ধাপে জ্বালানির উপযোগী কয়লায় রূপান্তরিত করে। মেশিনটি শহরের বায়ুদূষণ ও বর্জ্য কমানোর পাশাপাশি স্বল্পমূল্যে এনার্জি সরবরাহ করে গ্রামীণ ও ক্ষুদ্র শিল্পে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে মত দেন গবেষকরা।
ডুয়েটের ভিসি অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইকবাল মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডুয়েটের স্টল পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন, এসব গবেষণা দেশীয় সমস্যার পরিবেশবান্ধব ও ব্যবহারিক সমাধানের সক্ষমতা তুলে ধরছে এবং একাডেমিক গবেষণাকে বাস্তব প্রয়োগ ও বাণিজ্যিকীকরণের দিকে এগিয়ে নেয়ার সুযোগ তৈরি করছে।



