জুলাই অভ্যুত্থান দমাতে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার বাহিনী প্রণাঘাতী মারণাস্ত্র নিয়ে নেমেছিল। অন্য দিকে আন্দোলনকারী তরুণেরাও বুলেট ও বোমার সামনে অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন। জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোতে তারা সামান্য দুর্বলতা দেখালে হাসিনার পেটোয়া বাহিনী সবাইকে দমন করত। কথা বলার যে সামান্য অধিকারটুকু অবিশিষ্ট ছিল তা-ও কেড়ে নিত। নিশ্চিতভাবে দেশ অন্ধকারের চোরাবালিতে তলিয়ে যেত। সে কারণে জুলাইয়ে চালানো গণহত্যার যথাসময়ে সুষ্ঠু বিচার প্রয়োজন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জুলাইয়ে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার সাধারণ গতিতে চলেছিল। ড. ইউনূস সরকারের মেয়াদকালে তার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কয়েকটি মামলা ফয়সালা হয়েছে। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ও তার কসাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালের মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হয়েছে। কিন্তু জুলাইয়ের ৩৬ দিনে সংঘটিত দেড় হাজার লড়াকু বিপ্লবীর হত্যা ও ৩০ হাজার পঙ্গু ও গুরুতর আহত হওয়াসহ যেসব বড় বড় অপরাধ হয়েছে সেগুলোর বিচার ধীরগতিতে এগোচ্ছে। এর মধ্যে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর এসব মামলা যেভাবে বেগবান হওয়ার কথা তা হচ্ছে না।
ওই সময়ে সারা দেশে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডসহ হাসিনার পেটোয়া বাহিনীর করা বিভিন্ন অপরাধে এক হাজার ৮৪১টি মামলা হয়। সহযোগী একটি দৈনিকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ১৪৭টি মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। বাকি এক হাজার ৬৯৪টি মামলা তদন্তাধীন। তবে এসব মামলার অভিযোগপত্র কখন দাখিল হবে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। এরপরে আছে মামলার দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া।
জুলাই একটি বিপ্লব না অভ্যুত্থান- এ নিয়ে বিভিন্নমুখী বক্তব্য আছে। তবে এটি বাংলাদেশে সংঘটিত আগের যেকোনো অভ্যুত্থানের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। বিশেষ করে মানুষের ব্যাপক মাত্রায় বিক্ষোভে অংশগ্রহণ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর নিষ্ঠুরতার দিক দিয়ে। পুলিশ আন্দোলনরত ছাত্র-জনতাকে সরাসরি গুলি করে হত্যা করেছে। নিজের দেশের মানুষের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয় সব নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রাণঘাতী অস্ত্রসজ্জিত করে নামিয়ে দেয়। এমনকি আন্দোলন দমাতে গিয়ে ১৩৫ শিশু হত্যা করা হয়। এর আগে আন্দোলন দমাতে গিয়ে এমন নৃশংসতার নজির নেই। এর এক-দশমাংশ রক্তপাতও এর আগের কোনো গণ-আন্দোলনে বাংলাদেশে হয়নি।
একটি ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র কায়েম করতে হলে এ নির্মমতার বিচার করতে হবে। দুর্ভাগ্য হলো- শুরু থেকে মামলা ও তদন্ত নিয়ে গাফিলতি এবং ধীরগতি দৃশ্যমান। মামলা করার ক্ষেত্রে একটি গোষ্ঠী রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থে পরিচালিত হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে মামলা বাণিজ্যের অপচেষ্টা হয়েছে। এতে করে প্রকৃত অপরাধীদের বেঁচে যাওয়ার পথও সৃষ্টি হয়েছে। বিপুল রক্তপাতের পর এই ধরনের সঙ্কীর্ণ স্বার্থে জুলাইয়ের ব্যবহার হতাশাজনক।
পতিত ফ্যাসিবাদী শাসনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী রাজনৈতিক দল বিএনপি এখন রাষ্ট্রক্ষমতায়। দলটির ওপর অন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা ও দেশের মানুষের প্রত্যাশা অনেক। সরকার জুলাইয়ে সংঘটিত বড় অপরাধগুলোর ন্যায্য বিচারে আন্তরিক হবে। দলটি সরকার গঠনের পর বিচারব্যবস্থায় বিভিন্ন পদে পরিবর্তন এনেছে। জুলাইয়ের অপরাধীদের বিচারের পুরো ভার এখন তাদের ওপর। বিচারে ধীরগতি ও গাফিলতির যে অভিযোগ উঠেছে, বিএনপি সরকারকে তা আমলে নিতে হবে।



