গুমবিরোধী আইন থেকে কেন পিছু হটা

গুম আইন বাতিল একটি সাধারণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। এটি একটি রাজনৈতিক বার্তা। এই বার্তা যদি হয়-‘রাষ্ট্র নিজের জবাবদিহি কমাতে চায়’ তাহলে তার প্রতিক্রিয়াও রাজনৈতিক হবে। সরকারের সামনে এখনো সময় আছে। পথ পরিবর্তনের সুযোগ আছে। না হলে এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি আইনের পতন হবে না-এটি আস্থার পতন ডেকে আনবে। আর আস্থা হারালে রাষ্ট্র টিকে থাকে না

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘গুম’ শব্দটি নতুন নয়; কিন্তু আইনের ভাষায় এটি দীর্ঘ দিন ছিল অদৃশ্য। বহু বছর ধরে অভিযোগ ছিল, মানুষ হঠাৎ করে হারিয়ে যাচ্ছে। পরিবার খুঁজে পাচ্ছে না। রাষ্ট্র বলছে- তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। এই শূন্যতার ভেতরেই জন্ম নিয়েছিল ভয়, অবিশ্বাস এবং ক্ষোভ। অবশেষে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ’ সেই শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করে। প্রথমবারের মতো গুমকে একটি স্পষ্ট ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়; কিন্তু এখন সেই অধ্যাদেশই বাতিলের পথে। প্রশ্ন উঠছে- কেন?

প্রশ্নটি শুধু আইনের নয়; এটি রাজনীতির। এটি নৈতিকতার। এটি রাষ্ট্রের চরিত্রের প্রশ্ন। বাংলাদেশে ২০২৪ সালের আগে কোনো আইনে ‘গুম’ শব্দটি ছিল না। অথচ বাস্তবে গুমের অভিযোগ ছিল বহু। এই অধ্যাদেশ প্রথমবার বলেছে- রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে কাউকে আটক করে পরে অস্বীকার করা হলে সেটিই গুম। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা। কারণ এখানে শুধু অপহরণ নয়, রাষ্ট্রীয় দায় স্বীকার করা হয়েছে।

অধ্যাদেশ আরো বলেছে- গুম একটি চলমান অপরাধ। ভুক্তভোগীকে আইনগত সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হলে শাস্তি হবে। সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দায়ও নির্ধারিত হবে। এই বিধানগুলো আন্তর্জাতিক কনভেনশনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাহলে আপত্তি কোথায়?

সরকার বলছে- এই অধ্যাদেশে কিছু ‘সমস্যা’ আছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, এই আইনে ‘হুকুমদাতা’ শনাক্ত করা কঠিন। আইনমন্ত্রী বলেছেন, শাস্তির মাত্রা নিয়ে পুনর্বিবেচনা দরকার। আবার কেউ কেউ বলছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিদ্যমান আইনেই বিচার সম্ভব। কিন্তু এই যুক্তিগুলো কতটা বাস্তবসম্মত? প্রথমত, ধরে নিলাম গুমের মতো অপরাধে ‘হুকুমদাতা’ শনাক্ত করা কঠিন; কিন্তু কঠিন বলে আইন বাতিল করা যায় না; বরং কঠিন বলেই আইন দরকার।

দ্বিতীয়ত, শাস্তির প্রশ্নে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। আইনমন্ত্রী বলছেন ১০ বছর, অথচ অধ্যাদেশে স্পষ্টভাবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে। এতে একটি প্রশ্ন ওঠে- নীতিনির্ধারকরা কি আইনটি ঠিকভাবে পড়েছেন?

বিএনপি নিজেই গুমের অভিযোগ তুলে দীর্ঘ দিন আন্দোলন করেছে। তাদের নেতাকর্মীরাই ভুক্তভোগী হিসেবে সামনে এসেছেন। তাহলে এখন কেন তারা এই আইন থেকে সরে আসছে? এখানে রাজনৈতিক বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ।

এই অধ্যাদেশের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো- ঊর্ধ্বতনদের দায় নির্ধারণ। অর্থাৎ, শুধু মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা নয়, নির্দেশদাতা, অনুমোদনদাতা- সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যাবে। এটি রাষ্ট্রক্ষমতার জন্য অস্বস্তিকর। কারণ এতে নির্বাহী বিভাগের ওপর সরাসরি চাপ তৈরি হয়।

সরকার বলছে- জাতীয় নিরাপত্তার কারণে কিছু বিষয় গোপন রাখা দরকার; কিন্তু অধ্যাদেশে স্পষ্ট বলা আছে- জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে কাউকে গুম করা যাবে না। এটি একটি মৌলিক নীতি। কারণ ইতিহাস দেখায়, ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ শব্দটি বহুবার অপব্যবহার হয়েছে। দার্শনিক হান্না আরেন্ট বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্র যখন নিরাপত্তার নামে অসীম ক্ষমতা চায়, তখন স্বাধীনতা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ে।’ বাংলাদেশের বাস্তবতাও এর বাইরে নয়।

সরকারের প্রস্তাব- নিরাপত্তাবাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্ত করতে হলে সরকারের পূর্বানুমতি লাগবে। এই প্রস্তাব কার্যকর হলে আইনটি প্রায় অকার্যকর হয়ে যাবে। কারণ সরকার কি নিজের বিরুদ্ধে তদন্তের অনুমতি দেবে? রবার্ট ডাল গণতন্ত্রের একটি মূল শর্ত হিসেবে বলেছেন, accountability বা জবাবদিহি। যেখানে জবাবদিহি নেই, সেখানে গণতন্ত্র কাগজে থাকে, বাস্তবে নয়।

একটি মহল থেকে দাবি উঠেছিল- গুমের বিচার সামরিক আইনে হোক। এটি বাস্তবসম্মত নয়। কারণ সামরিক আইনে গুমের কোনো স্বতন্ত্র সংজ্ঞা নেই। এটি বরং বিচারকে আরো জটিল করবে। এখানে একটি বিপজ্জনক প্রবণতা দেখা যায়- আইন নয়, আবেগ দিয়ে বিচার চাওয়ার প্রবণতা।

এই অধ্যাদেশ আন্তর্জাতিক কনভেনশনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি। বিশেষ করে ‘Enforced Disappearance’ বিষয়ে জাতিসঙ্ঘের কনভেনশন। এই কনভেনশনের মূল নীতি- গুমকে কখনো বৈধ করা যাবে না। রাষ্ট্র দায় এড়াতে পারবে না। ভুক্তভোগীর অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ যদি এই পথ থেকে সরে আসে, তাহলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশ্ন উঠবে।

এই অধ্যাদেশ বাতিলের বিষয়টি আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। একই সাথে বাতিল বা স্থগিত হচ্ছে- মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, দুদক সংশোধনী, বিচার বিভাগ-সংক্রান্ত সংস্কার, তথ্য অধিকার সংশোধন। সরকারের কৌশলের একটি ধারাবাহিকতা হিসেবে অধ্যাদেশটি বাতিল হচ্ছে। যেখানে জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল করা হচ্ছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান কী বলে? জ্যঁ-জাক রুশো সামাজিক চুক্তির ধারণায় বলেছেন- রাষ্ট্রের ক্ষমতা জনগণের সম্মতি থেকে আসে। যদি সেই ক্ষমতা জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়, তাহলে চুক্তি ভেঙে যায়। আর মঁতেস্কিয়ে বলেছিলেন- ক্ষমতার বিভাজন না থাকলে স্বাধীনতা টেকে না। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে এই দুই ধারণাই প্রাসঙ্গিক।

গুমের শিকার মানুষের পরিবার একটি প্রশ্ন করছে- এই আইন না থাকলে বিচার কিভাবে হবে? যারা ফিরে এসেছে, তারা কি সুরক্ষা পাবে? যারা ফিরে আসেনি, তাদের কি রাষ্ট্র স্বীকার করবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

বিএনপি একটি বড় সুযোগ পেয়েছে। দীর্ঘ দিন পর জনগণ তাদের হাতে ক্ষমতা দিয়েছে। এই মুহূর্তে যদি তারা জবাবদিহিমূলক আইন থেকে সরে আসে, তাহলে তা রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী হতে পারে। কারণ ইতিহাস বলে- ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় নেয়া সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত বিচার হয়, যা তাদের নিজেদের বিরুদ্ধে চলে যায়।

সরকার চাইলে অধ্যাদেশ সংশোধন করতে পারে। বাতিল করে শূন্যতা তৈরি করা সমাধান নয়। প্রয়োজন- স্বচ্ছ আলোচনা, অংশীজনদের সম্পৃক্ততা ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা তদন্তের সুযোগ রাখা।

বিপজ্জনক পথে রাষ্ট্র?
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ বাতিল হলে একটি আইনি শূন্যতা তৈরি হবে। গুম আবার আইনের অন্ধকারে ঢুকে পড়বে। সাধারণ মানুষ কি এটি মেনে নেবে? সম্ভবত না। কারণ মানুষ এখন আগের মতো নেই। তারা জানে। বোঝে। বিচার চায়।

জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর মানুষ একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে- জবাবদিহি চাই। আইনের শাসন চাই। এই প্রেক্ষাপটে ৭০ শতাংশ মানুষ যখন জুলাই সনদের পক্ষে, তখন ৫০ শতাংশ ভোট পাওয়া একটি সরকার যদি সেই মতামত অগ্রাহ্য করে, তাহলে সঙ্কট তৈরি হবেই। এটি শুধু রাজনৈতিক সঙ্কট নয়। এটি বৈধতার সঙ্কট।

গুমবিরোধী আইন থেকে সরে আসা, মানবাধিকার কাঠামো দুর্বল করা, জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা- সবমিলিয়ে একটি স্পষ্ট প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এটি গণতন্ত্রের ভাষা নয়। এটি ক্ষমতার ভাষা।

সরকার কেন এত বেপরোয়া? এ প্রশ্ন এখন সর্বত্র। বাংলাদেশের ক্ষমতার বিভিন্ন শক্তিকেন্দ্র সক্রিয়। রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরেও টানাপড়েন আছে। কোন কেন্দ্র সবচেয়ে শক্তিশালী সেটি নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এটি ভালো লক্ষণ নয়। এটি অশনি সঙ্কেত।

আরেকটি বিষয় মানুষ অনুভব করছে- বহিরাগত প্রভাব। ভারতীয় আধিপত্য নিয়ে যে বিরোধিতা তৈরি হয়েছিল, তা এখনো বিদ্যমান। একটুও কমেনি। ভারতীয় আধিপত্য এ দেশের মানুষ বিশেষ করে তরুণরা আর মানবে না। এখন অনেকের কাছে মনে হচ্ছে- সেই প্রভাব আবার সক্রিয় হচ্ছে। এর জন্য সরকারকে দায়ী করছে সাধারণ মানুষ। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ কোনো ধরনের আধিপত্য চায় না। না অভ্যন্তরীণ, না বহিরাগত।

গত ১৫ বছরে একটি সরকার সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রেখেও টিকে থাকতে পারেনি। কারণ মানুষ শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেয়। এখন যদি নতুন সরকার একই পথে হাঁটে- তাহলে ফলও ভিন্ন হবে না। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়- স্বৈরতান্ত্রিক আইনি কাঠামো অক্ষত রাখা। যে আইনগুলো একসময় দমন-পীড়নের হাতিয়ার ছিল, সেগুলোই যদি বহাল থাকে- তাহলে পরিবর্তন কোথায়? মানুষ প্রশ্ন করছে।

গুম আইন বাতিল একটি সাধারণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। এটি একটি রাজনৈতিক বার্তা। এই বার্তা যদি হয়- ‘রাষ্ট্র নিজের জবাবদিহি কমাতে চায়’ তাহলে তার প্রতিক্রিয়াও রাজনৈতিক হবে। সরকারের সামনে এখনো সময় আছে। পথ পরিবর্তনের সুযোগ আছে। না হলে এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি আইনের পতন হবে না- এটি আস্থার পতন ডেকে আনবে। আর আস্থা হারালে, রাষ্ট্র টিকে থাকে না।

গুম শুধু একটি অপরাধ নয়। এটি রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার প্রশ্ন। এই আস্থা একবার ভেঙে গেলে তা পুনর্গঠন করা কঠিন। গুমবিরোধী আইন বাতিল করা মানে শুধু একটি আইন বাতিল করা নয়। এটি একটি বার্তা দেয়া- রাষ্ট্র কি জবাবদিহির পথে হাঁটবে, নাকি ক্ষমতার নিরাপদ বলয়ে থাকতে চায়? বাংলাদেশ এখন সেই মোড়ে দাঁড়িয়ে। সিদ্ধান্ত শুধু একটি অধ্যাদেশের নয়। সিদ্ধান্ত- রাষ্ট্র কোন পথে যাবে।

লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন।