হরমুজ সঙ্কট : আতঙ্কে জ্বালানিতে বাড়ছে চাপ

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি ও হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্নের কারণে বাংলাদেশে অপরিশোধিত তেল আমদানিতে সাময়িক জটিলতা তৈরি হলেও দেশে জ্বালানি সরবরাহে কোনো বড় ধরনের প্রভাব পড়েনি বলে দাবি করেছে জ্বালানি বিভাগ। সরকারের ভাষ্য, একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) বর্তমানে সীমিত সক্ষমতায় বা ‘লো-ফিডে’ চললেও বাজারে ডিজেল, অকটেন, পেট্রল ও ফার্নেস অয়েলের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি ও হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বিঘেœর কারণে বাংলাদেশে অপরিশোধিত তেল আমদানিতে সাময়িক জটিলতা তৈরি হলেও দেশে জ্বালানি সরবরাহে কোনো বড় ধরনের প্রভাব পড়েনি বলে দাবি করেছে জ্বালানি বিভাগ। সরকারের ভাষ্য, একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) বর্তমানে সীমিত সক্ষমতায় বা ‘লো-ফিডে’ চললেও বাজারে ডিজেল, অকটেন, পেট্রল ও ফার্নেস অয়েলের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে।

গতকাল বুধবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি বিভাগের যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, দেশে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই; বরং বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে মূলত মানুষের ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত কেনাকাটার কারণে। তিনি বলেন, ‘২৮ ফেব্রুয়ারির আগে আমরা যে পরিমাণ তেল সরবরাহ করতাম, এখনো একই পরিমাণ সরবরাহ করছি। কিন্তু ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের মনে শঙ্কা তৈরি হওয়ায় চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।’ সরকারি হিসাবে বর্তমানে দেশে ডিজেলের মজুদ রয়েছে এক লাখ এক হাজার ৩৮৫ মেট্রিকটন, অকটেন ৩১ হাজার ৮২১ মেট্রিকটন, পেট্রল ১৮ হাজার ২১১ মেট্রিকটন, ফার্নেস অয়েল ৭৭ হাজার ৫৪৬ মেট্রিকটন এবং জেট ফুয়েল ১৮ হাজার ২২৩ মেট্রিকটন। কর্মকর্তাদের দাবি, এই মজুদ দিয়ে অন্তত এপ্রিল ও মে মাস পর্যন্ত বড় কোনো সঙ্কটের আশঙ্কা নেই।

হরমুজে জট, আটকে পড়েছে ক্রুড অয়েল

জ্বালানি বিভাগের তথ্যানুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালী কার্যত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় মার্চ ও এপ্রিল মাসে নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী অপরিশোধিত তেল দেশে পৌঁছাতে পারেনি। মার্চে দুই লাখ টন এবং এপ্রিলে এক লাখ টন ক্রুড অয়েল আমদানি ব্যাহত হয়েছে। সৌদি আরব থেকে এক লাখ টন তেলবাহী জাহাজ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আরেকটি জাহাজ নিরাপত্তাজনিত কারণে যাত্রা স্থগিত রেখেছে। এ পরিস্থিতিতে ইআরএলকে সীমিত ফিডে চালাতে হচ্ছে। চারটি ইউনিটের মধ্যে বর্তমানে দু’টি ইউনিট চালু রয়েছে। তবু আগের মজুদ এবং আমদানিকৃত পরিশোধিত জ্বালানি ব্যবহার করে সরবরাহ চেইন সচল রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০ এপ্রিল সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে এক লাখ টন অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড অয়েলবাহী জাহাজ রওনা হওয়ার কথা রয়েছে, যা মে মাসের শুরুতে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে পারে। পাশাপাশি মে মাসে আরো এক লাখ টন সরবরাহের জন্য সৌদি কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। জরুরি চাহিদা মোকাবেলায় সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে অতিরিক্ত আরো এক লাখ টন ক্রুড অয়েল আমদানির অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

দেশের চাহিদার ২০ শতাংশ দেয় ইআরএল

জ্বালানি বিভাগের হিসাবে, ইআরএল বছরে প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিকটন অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে, যা দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ পূরণ করে। বাকি ৮০ শতাংশ চাহিদা পূরণ হয় সরাসরি পরিশোধিত তেল আমদানির মাধ্যমে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট ব্যবহৃত ডিজেলের প্রায় ১৫ শতাংশ, পেট্রলের ১২ শতাংশ ইআরএল থেকে এসেছে। এ ছাড়া ফার্নেস অয়েল, কেরোসিন ও বিটুমিনেরও উল্লেখযোগ্য অংশ এই রিফাইনারি সরবরাহ করে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়- ইআরএল সীমিত গতিতে চললেও পুরো বাজার অচল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আপাতত নেই, কারণ বাংলাদেশ অনেকাংশেই পরিশোধিত জ্বালানি আমদানিনির্ভর।

আতঙ্কে পাম্পে ভিড়, শুরু হয়েছে অভিযান

সরবরাহে ঘাটতি না থাকলেও দেশের বিভিন্ন স্থানে ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। সরকারি কর্মকর্তারা এটিকে মনস্তাত্ত্বিক চাপের ফল বলে মনে করছেন। একটি উদাহরণ দিয়ে মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, আগে একটি পাম্পে দৈনিক ৫০ থেকে ৫৪ হাজার লিটার অকটেন লাগলেও এখন সেখানে ৮০ হাজার লিটারের বেশি সরবরাহ দিয়েও চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে অবৈধ মজুদ ও কালোবাজারি ঠেকাতে গত ৩ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে ৯ হাজার ১১৬টি মোবাইল কোর্ট অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এতে তিন হাজার ৫১০টি মামলা, এক কোটি ৫৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা জরিমানা এবং ৪৫ জনকে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এ সময় মোট পাঁচ লাখ চার হাজার ২৩৬ লিটার অবৈধ জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ডিজেল তিন লাখ ৬৬ হাজার লিটার, পেট্রল ৮৭ হাজার ৯৫৯ লিটার ও অকটেন প্রায় ৪০ হাজার লিটার।

মূল্য সমন্বয় নিয়ে নতুন শঙ্কা

জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও বাজারে এখন বড় প্রশ্ন- দাম কি বাড়বে? জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতি মাসে আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় মূল্য সমন্বয় করা হয়। এপ্রিল মাসের দাম ইতোমধ্যে নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে মে মাসে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থায় সরকার জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে ডিজিটাল ট্র্যাকিং, ফুয়েল পাস ও ডিলার ডাটাবেজ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। সব মিলিয়ে সরবরাহ চেইন এখনো সচল থাকলেও জনমনে তৈরি হওয়া আতঙ্কই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। হরমুজ সঙ্কট দীর্ঘায়িত হলে এই চাপ আরো বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।