মানুষের ভেতরে একটি অদৃশ্য নদী বয়ে চলে- অনুভূতির, সহমর্মিতার, ভালোবাসার নদী। এই নদীই মানুষকে অন্য প্রাণী থেকে পৃথক করে, তাকে করে তোলে সামাজিক, সংবেদনশীল এবং দায়িত্বশীল এক সত্তা। মানুষ একা বাঁচতে পারে না; তার অস্তিত্ব জড়িয়ে থাকে অন্য মানুষের হাসি, কান্না, দুঃখ ও স্বপ্নের সাথে। আর এই আন্তঃসম্পর্কের সূক্ষ্ম সেতুবন্ধটির নামই মানবিকতা।
মানবিকতা কোনো বিমূর্ত দর্শন নয়; এটি জীবনের এক জীবন্ত স্পন্দন। এটি সেই আলো, যা মানুষের হৃদয়ের অন্ধকার দূর করে তাকে উদার করে তোলে। যখন একজন মানুষ অন্যের দুঃখ অনুভব করে, তার কষ্ট লাঘবে এগিয়ে আসে, তখনই মানবতার প্রকৃত রূপ উন্মোচিত হয়। এই রূপে নেই কোনো অহঙ্কার, নেই কোনো প্রচারের বাসনা; আছে শুধু নিঃস্বার্থ ভালোবাসার গভীরতা।
আজকের পৃথিবী এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। এক দিকে প্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতি, মহাকাশ জয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার; অন্য দিকে ক্ষুধার্ত মানুষের দীর্ঘশ্বাস, দারিদ্র্যের নির্মম বাস্তবতা, আর অবহেলিত মানুষের নিঃশব্দ কান্না। উন্নয়নের এই আলোকোজ্জ্বল পথে চলতে গিয়ে আমরা যেন কোথাও মানবিকতার প্রদীপটি ম্লান করে ফেলছি। অথচ সত্য হলো মানবিকতা ছাড়া কোনো উন্নয়নই পূর্ণতা পায় না।
‘জঠর জ্বালা’ এই দু’টি শব্দে লুকিয়ে আছে মানুষের অজানা যন্ত্রণা। যে মানুষ কখনো না খেয়ে রাত কাটিয়েছে, যে শিশু ক্ষুধার কারণে কান্না থামাতে পারেনি তাদের বেদনা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এই পৃথিবীতে যখন কেউ অপচয়ের উৎসবে মেতে ওঠে, তখন অন্য কোথাও কেউ একমুঠো খাবারের জন্য আকুল হয়ে থাকে। এই বৈষম্য আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করে আমরা কি সত্যিই মানুষ হতে পেরেছি?
মানবিকতার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়ানো। সমাজ তখনই আলোকিত হয়, যখন সেখানে মানুষ কেবল নিজের স্বার্থে নয়, অন্যের কল্যাণেও কাজ করে। পরোপকার, সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ এই তিনটি গুণ একটি সমাজকে দৃঢ় ও স্থিতিশীল করে তোলে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, যেখানে সামাজিক সংহতি দৃঢ়, সেখানে উন্নয়ন টেকসই হয় এবং মানুষ শান্তিতে বসবাস করতে পারে।
মানবতা, পরোপকার ও সমাজসেবা একটি সমাজকে আলোকিত ও সমৃদ্ধ করে। যে সমাজে মানুষ কেবল নিজের স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত না থেকে অন্যের কল্যাণে কাজ করে, সেই সমাজ দ্রুত উন্নতি ও স্থিতিশীলতার পথে এগিয়ে যায়। সমাজসেবা সামাজিক বৈষম্য কমায় এবং মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও বন্ধনকে শক্তিশালী করে। এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক অঞ্চলে দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও সামাজিক পশ্চাৎপদতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে নানা মানবিক উদ্যোগ গড়ে উঠেছে। এসব উদ্যোগ লাখ লাখ মানুষের জীবন পরিবর্তনে সহায়ক হয়েছে। একজন মানুষের আন্তরিক উদ্যোগও কখনো কখনো সমাজে বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
অনেকসময় ছোট ছোট উদ্যোগও বড় মানবিকতার প্রতীক হয়ে ওঠে। বিশ্বের অনেক দেশে একটি সুন্দর সামাজিক সংস্কৃতি প্রচলিত রয়েছে। সেখানে মানুষ যখন কোনো রেস্তোরাঁয় চা, কফি বা খাবারের বিল পরিশোধ করেন, তখন অতিরিক্ত এক বা দুই কাপ চা বা খাবারের মূল্য দিয়ে যান। পরে কোনো দরিদ্র বা অসহায় ব্যক্তি সেই খাবার গ্রহণ করতে পারেন। এই ধরনের উদ্যোগ খুব ছোট মনে হলেও এর সামাজিক ও মানবিক তাৎপর্য গভীর।
সমাজে এমন অনেক নারী আছেন, যারা স্বামীর দেয়া তালাকের পর কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন। সংসারের নিরাপত্তা ও আর্থিক সহায়তা হারিয়ে তাদের জীবনে নেমে আসে অনিশ্চয়তা ও সঙ্কট। বিশেষ করে যেসব নারীর সন্তান রয়েছে, তাদের জীবনসংগ্রাম আরো কঠিন হয়ে ওঠে। সন্তানদের লালনপালন, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে তারা চরম আর্থিক ও মানসিক সঙ্কটে পড়ে যান।
বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকসের তথ্য অনুযায়ী দেশে প্রায় ১৯ শতাংশ মানুষ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে জীবন যাপন করছে, যার একটি বড় অংশ গ্রামাঞ্চলে বসবাস করে। বিভিন্ন গবেষণা বলছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক চাপে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরো লাখ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়েছে। এমনকি কিছু সমীক্ষায় দারিদ্র্যের হার প্রায় ২৮ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছানোর আশঙ্কার কথাও বলা হয়েছে। এসব তথ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় দারিদ্র্যবিমোচন কেবল অর্থনৈতিক নীতির বিষয় নয়; বরং এটি মানবিক দায়িত্ব ও সামাজিক সংহতির সাথেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি অংশ অসহায় নারী। সমাজের দায়িত্বশীল মানুষ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত অসহায় নারীদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলার জন্য প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সহায়তার ব্যবস্থা করা।
দারিদ্র্যের নির্মম বাস্তবতা
দারিদ্র্য মানুষের জীবনে এক কঠিন বাস্তবতা সৃষ্টি করে। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের উদ্বেগ কিভাবে তাদের বড় করবেন, কিভাবে শিক্ষার ব্যবস্থা করবেন। অনেকসময় একটি ছোট সহায়তাই তাদের জীবনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়। এই ধরনের অনেক পরিবারকে এক মুঠো খাবারের জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়। কখনো কখনো না খেয়েই রাত কাটাতে হয়।
দরিদ্রতার কশাঘাত কত তীব্র তা বোঝাতে আমার জীবনের দু’টি ঘটনা উল্লেখ করতে চাই। আমি তখন চট্টগ্রামের ওমর গণি এমইএস কলেজের বিভাগীয় প্রধান। অফিস কক্ষে বসে আছি। স্নাতক পাস কোর্সের এক ছাত্রী অফিসে এসে বলে, স্যার আমাকে ডিগ্রির এক সেট বই কিনে দিন। আমার বাবা নেই। বই কিনতে পারিনি। আমি তাকে লাইব্রেরিতে নিয়ে এক সেট বই কিনে দিয়েছি। যখন তাকে বইটি তুলে দিয়েছিলাম, তার মুখে যে আনন্দের আলো ফুটে উঠেছিল তা যেন আমার নিজের হৃদয়কেও আলোকিত করেছিল। একসময় অনার্সের প্রথম থেকে চতুর্থ বর্ষ পর্যন্ত ফাইনাল পরীক্ষায় ২৫ নম্বর বিভাগীয় প্রধানের হাতে থাকত। ইনকোর্স, টিউটোরিয়াল ও ক্লাসে উপস্থিতি যোগ করে নম্বর দেয়া হতো। বাকি ৭৫ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা হলে দিতে হয়।
আমি যখন ২৫ নম্বরের রেজাল্ট শিট তৈরি করছিলাম- দেখি এক ছাত্র একেবারে কম নম্বর পেয়েছে। তাকে খবর দিয়ে কলেজে আনলাম। জানতে চাইলাম তুমি নিয়মিত ক্লাস করো নম্বরের এ অবস্থা কেন? সে জানাল- স্যার, আমার তো বাবা নেই। মা গৃহিণী। মামার বাসায় থাকি। তারা আমাকে দু’বেলা খাবার দেয়। সকালের নাশতা দেয়। কোন মুখে বই কেনার জন্য টাকা চাইব? আমি তাকে সে দিনই বই কিনে দিয়েছি। এভাবে অর্থের অভাবে বহু মানুষ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। সামান্য একটু সাহায্যের হাত বাড়ালে এদের জীবন অর্থবহ হয়ে উঠবে।
মানবিক সমাজ গঠনে করণীয়
মানবিক সমাজ গঠনের জন্য আমাদের প্রত্যেকেরই দায়িত্ব রয়েছে। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ যদি জাকাত, সাদাকা, অনুদান ও দান-খয়রাতের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ান, তবে অসংখ্য মানুষের জীবন বদলে যেতে পারে। বিশেষ করে অনাথ শিশুদের শিক্ষা ও জীবিকার ব্যবস্থা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা তাদের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পথ খুলে দেয় এবং দারিদ্র্যের চক্র থেকে মুক্ত হতে সাহায্য করে।
এখন দানের প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে আত্মপ্রচার। ছবি তুলে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া, সংবাদমাধ্যমে প্রচারের জন্যই তা যেন করা হয়। কিছু মানুষ আছেন, যারা মানুষের প্রশংসা নয়, স্রষ্টার সন্তুষ্টিকেই তাদের দানের প্রকৃত লক্ষ্য মনে করেন। আমি একজন স্বনামধন্য শিল্পপতিকে জানি, যিনি মাঝে মধ্যে গভীর রাতে নিঃশব্দে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। শহরের বিভিন্ন নির্জন পয়েন্টে গিয়ে তিনি অসহায় ও অভাবগ্রস্ত মানুষের হাতে গোপনে কিছু অর্থ তুলে দেন। কোনো ক্যামেরা নেই, কোনো প্রচার নেই।
কয়েক বছর আগে এক তীব্র শৈত্যপ্রবাহে দেশের মানুষ দারুণ কষ্টে ছিল। পাকা ঘরের ভেতরেও মানুষ শীতে থরথর করে কাঁপছিল। আর যাদের মাথার ওপর ছাদ নেই তাদের অবস্থা ছিল আরো করুণ। ফুটপাথ, শপিংমলের সামনের বারান্দা, বাস ও রেলস্টেশন, লঞ্চঘাট- এসব জায়গায় অসংখ্য গৃহহীন মানুষ কাঁথা জড়িয়ে শীতের সাথে লড়াই করছিল। ঠিক এমন এক গভীর রাতে একটি দামি জিপগাড়ি নিঃশব্দে শহরের কয়েকটি স্থানে গিয়ে থামে। গাড়ি থেকে নেমে কয়েকজন মানুষ ঘুমন্ত গৃহহীনদের গায়ে আলতো করে একটি করে উন্নতমানের কম্বল জড়িয়ে দেন। কেউ কিছু বোঝার আগেই গাড়িটি দ্রুত সেখান থেকে চলে যায়। ভোরে ঘুম ভাঙার পর অনেকেই বিস্ময়ের সাথে দেখেন, তাদের গায়ের ওপর একটি উষ্ণ, দামি কম্বল। কে দিলো? কখন দিলো? কেউ জানে না। কিন্তু সেই অজানা দাতার নিঃশব্দ সহমর্মিতা তাদের শীতের রাতে এনে দেয় উষ্ণতা। এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানবিকতার প্রকৃত সৌন্দর্য নীরবতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।
প্রতিদিনের ব্যস্ত জীবনযাত্রায় আমরা নানা ধরনের নিয়মিত কাজ করি অফিস, ব্যবসায়, পড়াশোনা কিংবা পারিবারিক দায়িত্ব। এই দৈনন্দিন রুটিনের মধ্যেই যদি আমরা সামান্য পরিমাণ হলেও দুঃখী ও অভাবগ্রস্ত মানুষের জন্য কিছু দানের ব্যবস্থা করি, তবে তা কেবল একটি দয়া প্রদর্শন নয়; বরং এটি একটি মহৎ সৎকর্মে পরিণত হবে। নিয়মিত অল্প অল্প দান মানুষের হৃদয়ে সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ জাগ্রত করে এবং সমাজে পারস্পরিক সহায়তার একটি সুন্দর সংস্কৃতি গড়ে তোলে।
বিশেষ করে ঘরের দরজায় কোনো অসহায় মানুষ সাহায্যের আশায় এলে শিশুদের মাধ্যমেই তাকে সাহায্য করার ব্যবস্থা করা অত্যন্ত শিক্ষণীয় একটি পদ্ধতি হতে পারে। এতে শিশুরা ছোটবেলা থেকেই বুঝতে শেখে যে, সমাজে অনেক মানুষ আছেন, যারা আমাদের সহযোগিতার প্রত্যাশী। তাদের হাতে নিজের মাধ্যমে কিছু তুলে দেয়ার অভিজ্ঞতা শিশুমনে সহানুভূতি, মানবিকতা ও পরোপকারের বীজ বপন করে। এভাবে পরিবার থেকেই যদি শিশুদের মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া যায়, তবে তারা বড় হয়ে দায়িত্বশীল ও সহমর্মী নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে।
সমাজের প্রতিষ্ঠান, দাতব্য সংস্থা ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো যদি সম্মিলিতভাবে কাজ করে, তবে মানবিকতার পরিধি আরো বিস্তৃত হবে। তখন দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই আরো শক্তিশালী হবে। অতএব, মানবিকতা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি অপরিহার্য দায়িত্ব। এটি এমন এক শক্তি, যা মানুষকে মানবিক করে তোলে, সমাজকে আলোকিত করে, আর পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তোলে।
আসুন, আমরা প্রত্যেকে আমাদের হৃদয়ের দরজা খুলে দিই মানবতার জন্য, মানুষের জন্য।
লেখক : অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা



