আর কয়েক দিন পরই ঈদুল আজহা। প্রতি বছর এই ঈদে সামর্থ্যবান মুসলমানরা মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে গরু, ছাগল, মহিষ, উট, দুম্বাসহ বিভিন্ন পশু কোরবানি করেন। কোরবানির এই ধর্মীয় আমলের সাথে জড়িয়ে আছে দেশের একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক খাত- ‘চামড়া শিল্প’।
বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রফতানিমুখী শিল্প হচ্ছে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য শিল্প। পোশাক শিল্পের পর দীর্ঘদিন ধরে এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। কোরবানির মৌসুমে সংগৃহীত কাঁচা চামড়াই এই শিল্পের প্রধান কাঁচামাল সরবরাহ করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বছরে সংগ্রহ হওয়া মোট কাঁচা চামড়ার একটি বড় অংশ আসে ঈদুল আজহার সময়।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে গত এক দশকে কাঁচা চামড়ার বাজারে ভয়াবহ মূল্যপতন লক্ষ্য করা গেছে। ২০১৩ সালের দিকে গরুর কাঁচা চামড়ার বাজারমূল্য প্রতি বর্গফুট প্রায় ৮০–৯০ টাকার মধ্যে ছিল। অথচ ২০২০ সালে তা নেমে আসে মাত্র ৩৫–৪০ টাকায়। ২০২১ সালে সরকার মূল্য নির্ধারণ করলেও বাস্তব বাজারে অনেক স্থানে সেই মূল্য নিশ্চিত হয়নি। পরবর্তী বছরগুলোতেও একই সঙ্কট অব্যাহত থাকে। ২০২৩ সালে ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয় প্রতি বর্গফুট ৫০–৫৫ টাকা, ঢাকার বাইরে ৪৫–৪৮ টাকা।
২০২৪ সালে তা কিছুটা বাড়িয়ে ঢাকায় ৬০–৬৫ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৫–৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। একইসাথে প্রতি পিস গরুর চামড়ার সর্বনিম্ন মূল্য ঢাকায় ১,২০০ টাকা ও ঢাকার বাইরে ১,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ২০২৫ সালে সরকার আবারো দাম বৃদ্ধি করে ঢাকায় ৬০–৬৫ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৫–৬০ টাকা নির্ধারণ করে। প্রতি পিস গরুর চামড়ার সর্বনিম্ন মূল্য নির্ধারণ করা হয় ঢাকায় ১,৩৫০ টাকা এবং বাইরে ১,১৫০ টাকা।
কাগজে-কলমে মূল্য বাড়লেও বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেখা গেছে, অনেক অঞ্চলে কোরবানির চামড়া মাত্র ৫০ টাকা, ১০০ টাকা, এমনকি বিনামূল্যেও ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন মানুষ। কোথাও কোথাও চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলা, পানিতে ভাসিয়ে দেয়া বা নষ্ট করে দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। পরিকল্পিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনৈতি, রফতানি খাত ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অধিকার দিনের পর দিন ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে।
আমরা সবাই জানি, দেশের হাজার হাজার কওমি মাদরাসায় লাখ লাখ এতিম, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই সরকারি অনুদান ছাড়াই সাধারণ মানুষের দান, জাকাত, ফিতরা এবং কোরবানির চামড়ার অর্থে পরিচালিত হয়। অতীতে কোরবানির চামড়া বিক্রির অর্থ দিয়ে অনেক মাদরাসা তিন থেকে চার মাস পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের থাকা-খাওয়া ও শিক্ষাব্যয় পরিচালনা করতে সক্ষম হতো। কিন্তু বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে সেই আয় ভয়াবহভাবে কমে গেছে।
অথচ একই চামড়া থেকে তৈরি জুতা, স্যান্ডেল, ব্যাগ, বেল্ট, ওয়ালেট, জ্যাকেট, গ্লাভসসহ নানা পণ্যের বাজারমূল্য ক্রমাগত বাড়ছে। তাহলে প্রশ্ন জাগে, কাঁচামালের দাম এত কমে যাচ্ছে কেন? এর পেছনে কি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে?
অভিযোগ রয়েছে, একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী, আড়তদার এবং মধ্যস্বত্বভোগী পরিকল্পিতভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে কাঁচা চামড়ার মূল্য কমিয়ে রাখছে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ কোরবানিদাতা মানুষ, ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, দরিদ্র জনগোষ্ঠী এবং জাতীয় অর্থনীতি।
২০২৫ সালে বাংলাদেশে প্রায় ৯১ লাখ পশু কোরবানি হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৭ লাখ গরু ও মহিষের চামড়া রয়েছে, যা দেশের চামড়া খাতের মূল অংশ। কওমি মাদরাসাগুলো যদি এবার চামড়া সংগ্রহে অংশ না নেয়, তাহলে এই প্রায় ৪৫–৫০ লাখ মূল্যবান চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরিবহনে সরকারকে বিশাল প্রশাসনিক ও আর্থিক চাপ নিতে হতে পারে।
সরকার ইতোমধ্যে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ ও ৩০ হাজার মেট্রিক টন লবণের উদ্যোগ নিয়েছে। তবুও মাদরাসাগুলো মাঠে না থাকলে সংগ্রহ, পরিবহন ও সংরক্ষণে অতিরিক্ত আনুমানিক ১০০ কোটি টাকার প্রশাসনিক চাপ তৈরি হতে পারে। তাই ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কওমি মাদরাসাগুলোর চামড়া সংগ্রহ থেকে বিরত থাকার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে ভাবার সময় এসেছে।
অতএব, এখনই সময় চামড়া সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়ার। যারা পরিকল্পিতভাবে চামড়ার বাজারে সিন্ডিকেট তৈরি করে দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী ও দেশের অর্থনৈতিক খাত ধ্বংস করছে তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। একইসাথে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
চামড়া শিল্প রক্ষা হলে দেশের অর্থনীতি, রফতানি খাত, ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থা এবং অসহায় মানুষের অধিকার রক্ষা হবে। তাই আসুন, চামড়া সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে এবং জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে সকলেই সোচ্চার হই।
লেখক : সিনিয়র সহ-সভাপতি, ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশ



