ফিরে আসছে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ! আগামী অর্থবছরের বাজেটে শর্ত সাপেক্ষে বেশ কয়েকটি খাতে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া হতে পারে। এই খাতগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আবাসন খাত। এ ছাড়াও বৈধভাবে উপার্জিত বিদেশে থাকা অপ্রদর্শিত অর্থ দেশে ফিরিয়ে এনে সাদা করার সুযোগও থাকতে পারে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে। এনবিআর ও অর্থ বিভাগ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, আবাসন খাতে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়ার জন্য রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সরকারের ওপর একটি চাপ আছে। গত এপ্রিলে প্রাক-বাজেট আলোচনায় আবাসন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতাদের অর্থের উৎস সম্পর্কে কোনো ধরনের প্রশ্ন উত্থাপন না করার প্রস্তাব দেয় রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)। এ ক্ষেত্রে সংগঠনটি আয়কর অধ্যাদেশের পুরনো ধারা (১৯ বিবিবিবিবি) পুনঃপ্রবর্তনের দাবি জানায়। রিহ্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বেশ কয়েক বছর ধরে আবাসন ব্যবসার অবস্থা খুবই খারাপ। বিশেষ করে ২০২৪-২৫ সালে তাদের ব্যবসা পুরোপুরি মন্দার দিকে চলে গেছে। এ সময় তারা ব্যবসায় করতে পারেননি। ফলে এখন হাজার ফ্ল্যাট তাদের অবিক্রীত অবস্থায় রয়েছে। এইখাতের সাথে জড়িত লাখ লাখ মানুষ এখন অনিশ্চিত জীবনযাপন করছে। দেশের আবাসন খাতকে চাঙ্গ করতে হলে বাজেটে অবশ্যই এ খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দিতে হবে। তা না হলে দেশের কর্মসংস্থানের কোনো উন্নতি হবে না।
এ বিষয়ে এনবিআরের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শর্তসাপেক্ষে আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ আগামী বাজেটে দেয়ার বিষয়ে ওপর থেকে একটি গ্রিন সিগন্যাল পাওয়া গেছে। তবে এ ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি শর্ত আরোপ করা হতে পারে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে যারা প্রথমবারের মতো অপ্রদর্শিত অর্থ দিয়ে জমি বা ফ্ল্যাট কিনবেন শুধু তাদেরকেই জরিমানা দিয়ে এ সুযোগ দেয়া হতে পারে। এ ক্ষেত্রে একটি ফ্ল্যাট বা নির্দিষ্ট পরিমাণ জমিতে (সর্বোচ্চ ৫ কাঠা) এই অর্থ বিনিয়োগ করার সুযোগ দেয়া হবে।
সূত্র আরো জানায়, প্রবাসী যারা বৈধভাবে অর্থ উপার্জন করেছেন, এখন তারা যদি সেই অর্থ দেশে আনতে চান সে সুযোগও বাজেটে দেয়া হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে তাদের আয়ের উৎস জানাতে হবে। এবং এ অর্থ তারা কোথায় বিনিয়োগ করবেন তারও একটি শর্ত দেয়া হবে।
আগামী অর্থবছরে সরকারের প্রচুর রাজস্ব দরকার। এ খাত থেকে সরকার আশা করছে একটা ভালো রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হবে।
উল্লেখ্য, গত অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ফ্ল্যাট ও ভবনে বিনিয়োগ করে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রেখেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। তবে সমালোচনার মুখে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে সরকার। ওই বাজেটে অ্যাপার্টমেন্ট বা ফ্ল্যাট এবং ভবন কেনায় কালো টাকা সাদা করার সুযোগ অব্যাহত রাখা হয়। তবে আগের চেয়ে করের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, এলাকাভেদে আয়তন অনুসারে নির্দিষ্ট পরিমাণ কর দিলেই টাকার উৎস সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে বলে ধরে নেবে এনবিআর। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভাগীয় শহর, জেলা শহর, পৌর এলাকাভেদে প্রতি বর্গফুটে ১০০ থেকে দুই হাজার টাকা করহারের প্রস্তাব ছিল। এ ছাড়া একই সুবিধা পেতে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে এলাকাভেদে প্রতি বর্গফুটে ৫০ থেকে ৯০০ টাকা কর নির্ধারণ করার প্রস্তাব করা হয়েছিল।
এ দিকে বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সরকার একাধিকবার কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়েছে। বাংলাদেশে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ প্রথম দেয়া হয় ১৯৭৫ সালে সামরিক আইনের অধীনে। এরপর বিভিন্ন সরকার সময়ে সময়ে এ সুবিধা অব্যাহত রাখে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকার বেশি অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাড়া পাওয়া যায় করোনা মহামারীর সময়ে, ২০২০-২১ অর্থবছরে। সে সময় ১০ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া হলেও ১১ হাজার ৮৩৯ জন ব্যক্তি প্রায় ২০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বৈধ করেন। এতে সরকারের রাজস্ব আয় হয় প্রায় ২ হাজার ৬৪ কোটি টাকা।
তবে পরের অর্থবছরেই সুযোগ কিছুটা সীমিত করা হলে আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ২০২১-২২ অর্থবছরে মাত্র ২ হাজার ৩১১ জন করদাতা প্রায় এক হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা বৈধ করেন। এর আগে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়, ২০০৭-০৮ ও ২০০৮-০৯ অর্থবছরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৯ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা সাদা করা হয়েছিল। তখন ৩২ হাজার ৫৫৮ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এই সুবিধা নিয়েছিল।
আওয়ামী লীগ সরকারের টানা তিন মেয়াদে মোট প্রায় ৩৩ হাজার কোটি টাকা বৈধ করা হয়, যার বড় অংশ আসে ২০২০-২১ অর্থবছরে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৫ শতাংশ কর দিয়ে এ সুবিধা আবার চালু করা হয়েছিল। তবে সরকার পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ধীরে ধীরে বিশেষ দায়মুক্তির সুবিধা প্রত্যাহার করে নেয়।
বর্তমানে বিদ্যমান আইনে যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অপ্রদর্শিত অর্থ আয়কর নথিতে দেখাতে পারেন। তবে সে ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ করের পাশাপাশি করের ওপর আরো ১০ শতাংশ জরিমানা দিতে হয়।



