গত ৩১ মে, ২০২৬ তারিখে দক্ষিণ লেবাননের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল পাহাড়ি শৈলশিরা ‘বুফোর্ট রিজ আউটপোস্ট’ এবং এর ৯০০ বছরের পুরনো ঐতিহাসিক বুফোর্ট দুর্গটি (Qalaat al-Shaqif) ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী বা আইডিএফ দখল করে নিয়েছে। এই দুর্গ দখলের ঘটনা কোনো সাধারণ সীমান্ত সংঘর্ষ নয়। এটি মধ্যপ্রাচ্যের সমকালীন ইতিহাসে গত ২৬ বছরের মধ্যে লেবাননের সার্বভৌম ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে ইসরাইলি স্থলবাহিনীর গভীরতম এবং সবচেয়ে বিপজ্জনক অনুপ্রবেশ। বাহ্যিকভাবে হিজবুল্লাহর সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস এবং উত্তর ইসরাইলের গ্যালিলি অঞ্চলের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার খোঁড়া যুক্তি দেয়া হলেও, এই অভিযানের ভেতরের গল্পটি একেবারেই ভিন্ন। মূলত, লিতানি নদী পেরিয়ে ইসরাইলের এই জয়োৎসব ওয়াশিংটন, বৈরুত এবং তেহরানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের ভূরাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমীকরণকে এক ঝটকায় ওলটপালট করে দিয়েছে। এই সামরিক আগ্রাসন একদিকে যেমন জায়নবাদী নীতিনির্ধারকদের ‘বৃহত্তর ইসরাইল’ (Greater Israel) প্রতিষ্ঠার ব্লুপ্রিন্ট নগ্নভাবে উন্মোচিত করে, অন্যদিকে মার্কিন ডেমোক্র্যাট প্রশাসনের মধ্যস্থতায় সূচিত চলমান দ্বিপক্ষীয় শান্তির সম্ভাবনা চিরতরে খাদের কিনারায় ঠেলে দেয়।
ভূরাজনৈতিক ও সামরিক তাৎপর্য
সামরিক কৌশলবিদদের দৃষ্টিতে বুফোর্ট রিজের ভৌগোলিক অবস্থান অনন্য। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত এই খাড়া পাহাড়টি সমগ্র দক্ষিণ লেবানন এবং উত্তর ইসরাইলের জন্য একটি প্রাকৃতিক ‘ভ্যান্টেজ পয়েন্ট’ বা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। বিগত দশকগুলোতে এই পাহাড়ের ওপর কৌশলগত আধিপত্যের কারণেই হিজবুল্লাহ ইসরাইলের উত্তরাঞ্চলীয় সামরিক গতিবিধির ওপর কড়া নজরদারি রাখতে সক্ষম হয় এবং সেখান থেকেই সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে রকেট ও ড্রোন হামলা পরিচালনা করত। আইডিএফ এখন এটি দখল করে হিজবুল্লাহর মূল ঘাঁটির ওপর সরাসরি ‘ফায়ার কন্ট্রোল’ বা নিখুঁত নিশানা তাক করার সুবিধা পেয়েছে।
তবে এই অভিযানের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো ১৭ এপ্রিল, ২০২৬-এ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উপস্থিতিতে ঘোষিত মার্কিন মধ্যস্থতার যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন। ইসরাইলি বাহিনী কেবল হিজবুল্লাহকে সীমান্ত থেকে হটিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, তারা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমারেখার ভেতরে ‘লিতানি নদী’ অতিক্রম করে আরো ছয় মাইল উত্তরে ‘জাহরানি নদী’ করিডোরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এর সরাসরি সামরিক ফল হিসেবে দক্ষিণ লেবাননের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র ‘নাবাতিয়াহ’ শহরটি এখন ইসরাইলি অগ্রবর্তী বাহিনীর দ্বারা সম্পূর্ণ অবরোধের মুখে পড়েছে।
লেবাননের অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম আন্তর্জাতিক মঞ্চে অভিযোগ করেছেন যে, আইডিএফ দক্ষিণ লেবাননজুড়ে ‘পোড়ামাটি নীতি’ বাস্তবায়ন করছে। তারা একের পর এক লেবানিজ গ্রাম ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে সীমান্ত অঞ্চলে একটি জনমানবহীন ‘স্থায়ী বাফার জোন’ তৈরি করছে। ইসরাইলের বর্তমান অতি-ডানপন্থী প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজের সাম্প্রতিক বক্তব্য প্রধানমন্ত্রীর এই আশঙ্কা সত্য প্রমাণ করে। কাটজ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, বুফোর্ট রিজ এবং এর আশপাশের বিজিত অঞ্চলকে ইসরাইলের স্থায়ী ‘সিকিউরিটি জোন’ বা নিরাপত্তা অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত রাখা হবে। এর অর্থ, লেবানন নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মানচিত্র স্থায়ীভাবে খণ্ডিত করে ফেলা হছে।
‘বৃহত্তর ইসরাইল’ প্রতিষ্ঠার রোডম্যাপ ও জনমিতিক উচ্ছেদ
আঞ্চলিক পরাশক্তি এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ বলছে, ২০২৬ সালের এই যুদ্ধ কেবল হিজবুল্লাহর রকেট দমন বা জিম্মি উদ্ধারের এজেন্ডার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন বর্তমান চরম ডানপন্থী কোয়ালিশন সরকারের নীতিনির্ধারণে বাইবেলীয় রূপকথাভিত্তিক ‘বৃহত্তর ইসরাইল’ ধারণার আগ্রাসী বাস্তবায়ন এখন আর কোনো গোপন বিষয় নয়। মন্ত্রিসভার দুই প্রধান স্তম্ভ, অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ এবং জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়কমন্ত্রী ইতামার বেন-গভির, দীর্ঘদিন ধরেই নীল নদ থেকে ইউফ্রেটিস পর্যন্ত সীমানা সম্প্রসারণের পক্ষে ইসরাইলি পার্লামেন্ট নেসেটে সওয়াল করে আসছেন।
গাজা উপত্যকাকে প্রায় জনমানবহীন ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা এবং পশ্চিমতীরে প্রতিনিয়ত অবৈধ বসতি সম্প্রসারণের পর, ইসরাইলের সম্প্রসারণবাদী ক্ষুধার পরবর্তী নিশানা যে দক্ষিণ লেবানন, তা বুফোর্ট দুর্গের চূড়ায় ইসরাইলি জাতীয় পতাকা এবং গোলানি ব্রিগেডের ব্যানার ওড়ানোর মধ্য দিয়ে প্রতীকীভাবে স্পষ্ট করা হয়েছে। এটিকে আন্তর্জাতিক আইনের ভাষায় বলা হচ্ছে ‘ভার্চুয়াল অ্যানেক্সেশন’ বা কার্যত ভূখণ্ড গ্রাস। পশ্চিমতীরের স্টাইলে দক্ষিণ লেবাননকেও ধীরে ধীরে ইহুদি রাষ্ট্রের ডি-ফ্যাক্টো অংশ বানানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে।
এই ভৌগোলিক গ্রাসের সাথে যুক্ত হয়েছে একটি সুপরিকল্পিত ‘জনমিতিক প্রকৌশল’ বা ডেমোগ্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং। গত মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে এ পর্যন্ত দক্ষিণ লেবাননের প্রায় ১২ লাখের বেশি লেবানিজ নাগরিককে তাদের পৈতৃক ভিটেমাটি থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে বৈরুত কিংবা সিরিয়া সীমান্তের দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে। আইডিএফের সাউদার্ন কমান্ড থেকে প্রতিনিয়ত যে নতুন নতুন ‘ইভাকুয়েশন অর্ডার’ বা এলাকা খালি করার নির্দেশ জারি করা হচ্ছে, তার গভীর উদ্দেশ্য হলো লিতানি ও জাহরানি নদীর মধ্যবর্তী উর্বর অঞ্চল থেকে শিয়া এবং অন্যান্য আরব মুসলিম জনগোষ্ঠীকে স্থায়ীভাবে বিতাড়িত করা। এর ফলে উচ্ছেদকৃত অঞ্চলগুলোতে ভবিষ্যতে ইহুদি বসতি স্থাপন কিংবা স্থায়ী সামরিক গ্যারিসন তৈরি করা ইসরাইলের জন্য সময়ের ব্যাপার মাত্র। এটি মূলত সামরিক শক্তির জোরে মধ্যপ্রাচ্যের সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলোর সীমানা পুনর্নির্ধারণের একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় উদাহরণ, যা ২০২৬ সালের শুরুর দিকে ওমানের মাস্কাট সংলাপে তৈরি হওয়া আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার আশাকে সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।
লেবানন-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনায় বিপর্যয়
যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ কূটনৈতিক দূত আমোস হোচস্টেইনের শাটল ডিপ্লোম্যাসি এবং লেবাননের পার্লামেন্ট স্পিকার নাবিহ বেরির মধ্যস্থতায় বৈরুত ও তেল আবিবের মধ্যে যে শান্তি আলোচনা বা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতির চেষ্টা চলছিল, বুফোর্ট রিজ দখলের মধ্য দিয়ে তা খাতা-কলমেই সমাহিত হয়েছে।
এতে শান্তি আলোচনার টেবিলটি সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছে, যার প্রধান কারণ তিনটি :
লেবাননের দরকষাকষির ক্ষমতা শূন্য : লেবানন সরকারের কূটনৈতিক অবস্থানের মূল ভিত্তিই ছিল জাতিসঙ্ঘের ঐতিহাসিক ১৭০১ নম্বর প্রস্তাব। এই প্রস্তাবের মূল কথা ছিল- হিজবুল্লøাহ লিতানি নদীর ওপারে চলে যাবে এবং তার বিনিময়ে ইসরাইল লেবাননের আকাশ, জল ও স্থলভাগের ওপর সব সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন বন্ধ করে নিজেদের সীমানায় ফিরে যাবে। কিন্তু ইসরাইল এখন লিতানি নদী পার হয়ে বুফোর্ট রিজে স্থায়ী বাঙ্কার খনন করায়, লেবাননের পক্ষে দর-কষাকষি করার মতো কোনো কার্ড বা ভূখণ্ডগত হাতিয়ার অবশিষ্ট নেই।
হোয়াইট হাউজের বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্কট : বৈরুতের কূটনৈতিক অলিন্দে এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। লেবাননের নীতিনির্ধারকদের মতে, ওয়াশিংটন একদিকে বৈরুতকে কূটনৈতিক টেবিলে শান্ত থাকার এবং যুদ্ধবিরতির খসড়া মেনে নেয়ার প্রলোভন দেখাচ্ছে, অন্যদিকে পর্দার আড়ালে ইসরাইলকে লেবাননের ভেতরে আরো গভীরে ঢুকে ‘বাফার জোন’ গঠনের জন্য অস্ত্র ও সবুজসঙ্কেত দিচ্ছে। মার্কিন এই দ্বিমুখী নীতির ফলে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে মার্কিন রিপাবলিকান প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।
হিজবুল্লাহর ‘অ্যাসিম্যাট্রিক গেরিলা’ যুদ্ধ কৌশল : ফ্রন্টলাইনের সবচেয়ে সুরক্ষিত ও কৌশলগত পোস্ট বুফোর্ট রিজ হারানোর পর, হিজবুল্লাহর সামরিক উইং এখন তাদের যুদ্ধকৌশলে আমূল পরিবর্তন আনতে বাধ্য হচ্ছে। তারা এখন আইডিএফের সাথে কোনো সম্মুখ সমরে না গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অনিয়মিত বা ‘অ্যাসিম্যাট্রিক গেরিলা’ যুদ্ধের দিকে ঝুঁকছে। এর অর্থ হলো, তারা কোনো আন্তর্জাতিক বা মার্কিন যুদ্ধবিরতির শর্তের তোয়াক্কা না করে, লেবাননের ওয়াদি ও পাহাড়ের গিরিপথগুলোকে ব্যবহার করে ইসরাইলি সাঁজোয়া বহরের ওপর চোরাগোপ্তা হামলা, আইইডি বিস্ফোরণ এবং ড্রোন হানার তীব্রতা বাড়িয়ে দেবে। ফলে শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা নিকট ভবিষ্যতে সুদূরপরাহত।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র পরোক্ষ সংলাপে বড় ধাক্কা
দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলের এই আগ্রাসী অভিযানের ঢেউ কেবল বৈরুতেই থামেনি, তা সরাসরি আঘাত করেছে ওমানের মাস্কাটে চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ব্যাকচ্যানেল ডিপ্লোম্যাসির মূল তলানিতে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই পরোক্ষ সংলাপের মূল লক্ষ্য ছিল লোহিত সাগরে হুথিদের আক্রমণ বন্ধ করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে একটি বৃহৎ আঞ্চলিক যুদ্ধ এড়ানো। কিন্তু বুফোর্ট রিজের পতন এই আলোচনার ভারসাম্য নষ্ট করে দিয়েছে।
প্রথমত, হিজবুল্লাহকে বলা হয় মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধ অক্ষের সবচেয়ে ধারালো তলোয়ার এবং তেহরানের প্রতিরক্ষার ‘ক্রাউন জুয়েল’। বুফোর্ট রিজের নিয়ন্ত্রণ হারানোর মাধ্যমে হিজবুল্লাহর মূল অক্ষকে ইসরাইল যেভাবে কোণঠাসা করেছে, তা তেহরানের সামরিক মর্যাদার ওপর একটি বড় আঘাত। ওয়াশিংটন এখন ওমান সংলাপে এই সুযোগটি পুরোপুরি কাজে লাগাতে চাইবে। তারা টেবিল চাপড়ে ইরানকে এই শর্তে বাধ্য করতে চাইবে যে, যদি তারা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি চায়, তবে লেবানন ফ্রন্টে হিজবুল্লাহকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র করতে হবে এবং ইসরাইলের নতুন সীমানাকে মেনে নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, তেহরানের কট্টরপন্থী নীতিনির্ধারকরা এবং রেভলুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) ইতোমধ্যেই আয়াতুল্লাহ খামেনির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এই ‘কূটনৈতিক ছিনিমিনি’ বন্ধ করা হোক। তাদের মতে, ওয়াশিংটন কূটনীতির আড়ালে মূলত সময়ক্ষেপণ করছে যাতে ইসরাইল সামরিকভাবে ইরানের প্রক্সিদের একে একে নিশ্চিহ্ন করতে পারে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান মাস্কাটের পরোক্ষ সংলাপ থেকে সাময়িকভাবে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আলোচনার টেবিল বর্জন করে ইরান হিজবুল্লাহর ওপর চাপ কমাতে সিরিয়া, ইরাক এবং ইয়েমেনের প্রক্সি গ্রুপগুলোর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং লোহিত সাগরে পশ্চিমা বাণিজ্যিক জাহাজে একযোগে আত্মঘাতী ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা জোরদার করতে পারে।
সর্বোপরি, এই আঞ্চলিক বিপর্যয়ের গ্লানি ঢাকতে ইরান তার সবচেয়ে বড় যে তাসটি খেলতে পারে- তা হলো পারমাণবিক কর্মসূচি। প্রচলিত প্রক্সিযুদ্ধে ইসরাইলের আকাশচুম্বী আধিপত্যের ভারসাম্য বজায় রাখতে তেহরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা ৯০ শতাংশ বা ‘উইপনস-গ্রেড স্তরে নিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিতে পারে। ওয়াশিংটনকে নিবৃত্ত করার এই নীতি মধ্যপ্রাচ্যকে সম্পূর্ণ পারমাণবিকীকরণের দিকে ঠেলে দেবে, যা শেষ পর্যন্ত ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যেকোনো পরমাণু চুক্তির সম্ভাবনা চিরতরে সমাহিত করবে।
আঞ্চলিক মহাযুদ্ধের স্পষ্ট পূর্বাভাস
এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট, বুফোর্ট রিজ দখলের মাধ্যমে ইসরাইল মূলত মার্কিন প্রশাসনের তথাকথিত ‘যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণ বা ডি-এস্কেলেশন’ নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে। হোয়াইট হাউজের দুর্বল ও দ্বিমুখী নীতিকে কাজে লাগিয়ে নেতানিয়াহু নিজের সম্প্রসারণবাদী অ্যাজেন্ডা সফল করছেন। লেবানন ফ্রন্টে আলোচনা এখন আর কোনো ‘ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধবিরতি’র ফ্রেমে বাঁধা নেই; বরং তা এখন লজ্জাজনক পর্যায়ে অর্থাৎ, ‘লেবানন তার মানচিত্রের কতখানি ভূখণ্ড চিরতরে ইসরাইলের কাছে হারাবে’-সেই ন্যক্কারজনক দরকষাকষিতে চলে এসেছে। একই সাথে, ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার টেবিলটি এখন আরো বেশি ভঙ্গুর, অবিশ্বস্ত এবং বিস্ফোরক রূপ নিয়েছে। বুফোর্ট রিজের ওপর ওড়া ইসরাইলি পতাকা আসলে কোনো শান্তির বার্তা নয়, বরং তা মধ্যপ্রাচ্যের বুকে একটি দীর্ঘমেয়াদি, ক্ষয়িষ্ণু এবং বহুপক্ষীয় আঞ্চলিক মহাযুদ্ধের স্পষ্ট পূর্বাভাস।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত



