ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন বিশ্বের নীরবতা যেকোনো বোমার চেয়ে জোরে, যেকোনো ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে বেশি বিধ্বংসী এবং যেকোনো সহিংসতার চেয়ে বেশি অভিশপ্ত হয়ে ওঠে। গাজা এমনই একটি সময়কাল অতিক্রম করছে। ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ এই উপকূলীয় ভূখণ্ডে আজ যা ঘটছে তা কেবল একটি সামরিক সঙ্ঘাত নয়, কেবল একটি মানবিক সঙ্কট নয় এবং কেবল একটি রাজনৈতিক বিবাদ নয়, এটি পদ্ধতিগতভাবে একটি বেসামরিক জনগোষ্ঠীর সমূলে বিনাশ। যাদের আটকে রাখা হয়েছে, অনাহারে রাখা হয়েছে, বোমায় উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। স্বঘোষিত সভ্য বিশ্ব তা শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে।
২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে গাজায় এক লাখের বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়েছে। এর বড় অংশ শিশু ও নারী। যাদের একমাত্র অপরাধ তারা ফিলিস্তিনি। গাজার প্রায় পুরো জনগোষ্ঠী বাস্তুচ্যুত হয়েছে, অনেকে একাধিকবার, একটি ক্ষুদ্র ও বদ্ধ ভূখণ্ডের এক কোণ থেকে আরেক কোণে ছুটে গেছে যখন ইসরাইলি বোমাবর্ষণ তাদের পিছু নিয়েছে। গাজার ৯০ শতাংশেরও বেশি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। হাসপাতাল বোমায় উড়িয়ে দেয়া হয়েছে, স্কুল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, মসজিদ ও গির্জা ধূলিসাৎ হয়েছে, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন অবকাঠামো ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে এবং ভূখণ্ডের পুরো কৃষি সক্ষমতা ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। জাতিসঙ্ঘ, একাধিক আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালত নিজেই আন্তর্জাতিক আইনি ও নৈতিক শব্দভাণ্ডারে সবচেয়ে ভারী অর্থ বহনকারী শব্দগুলো ব্যবহার করেছে- গণহত্যা, জাতিগত নির্মূল, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, গাজার মানুষদের সাথে যা করা হচ্ছে তা বর্ণনা করতে।
যেসব যুদ্ধবিরতি চুক্তি বিপুল কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সাথে মধ্যস্থতা করা হয়েছে সেগুলো নিরর্থক হয়ে গেছে। তার কোনো অনুশীলন হয়নি। ইসরাইল বারবার এবং স্পষ্টতই কোনো পরিণতি ছাড়াই প্রমাণ করেছে, যে কোনো চুক্তি মানে না। বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো যেখানে ঘুমায় সেই তাঁবুর শিবিরে বোমা পড়তে থাকে। সাহায্যের কাফেলা আটকানো হয়, বিলম্বিত করা হয় এবং আক্রমণ করা হয়। সাংবাদিক, ডাক্তার ও মানবিককর্মীরা এমন সংখ্যায় নিহত হয়েছেন যা ইতিহাসে নথিভুক্ত যেকোনো সঙ্ঘাতে সাহায্যকর্মীদের জন্য সর্বোচ্চ মৃত্যুর সংখ্যা। গাজার মানুষ কেবল সামরিক সহিংসতার মুখোমুখি নয়, তাদের বাধ্য করা হয়েছে অনাহারের মুখোমুখি হতে। খাদ্য, ওষুধ, বিশুদ্ধ পানি ও জ্বালানির পদ্ধতিগত অবরোধ তৈরি করা হয়েছে। শিশুরা অপুষ্টি ও প্রতিরোধযোগ্য রোগে মারা যাচ্ছে।
গাজা ট্র্যাজেডি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নৈতিক দেউলিয়াত্বকে বিশেষভাবে প্রকাশ করে। আমেরিকা, যে নিজেকে বিশ্বের কাছে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার অভিভাবক হিসেবে উপস্থাপন করে, এই বিপর্যয়জুড়ে ইসরাইলের সবচেয়ে অপরিহার্য সহায়ক হয়েছে। এ ফিলিস্তিনি শিশুদের হত্যা করার জন্য বোমা সরবরাহ করেছে। যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবগুলোতে ভেটো দিয়েছে। কূটনৈতিক আবরণ প্রদান করেছে যা ইসরাইলকে আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতা থেকে রক্ষা করেছে। এটি একটি সরল ও বিধ্বংসী কপটতা যা পুরো বিশ্ব পর্যবেক্ষণ করেছে, যা আগামীর আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করবে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন গাজা নিয়ে মানবিক উদ্যোগে কিছুটা সরব ছিল; কিন্তু ইসরাইলের ওপর অর্থবহ রাজনৈতিক চাপে রূপান্তরিত করতে অনিচ্ছুক ছিল। আয়ারল্যান্ড, স্পেন, নরওয়ের মতো পৃথক ইউরোপীয় দেশগুলো ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিতে সাহসী অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু সামগ্রিক ইউরোপীয় প্রতিক্রিয়া ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি বর্বরতা রোধে মোটেও কার্যকর হয়নি।
সবচেয়ে বেদনার মুসলিম বিশ্বের নীরবতা। ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার ৫৭টি সদস্য রাষ্ট্র। দেশগুলোর সম্মিলিত জনসংখ্যা দুই বিলিয়ন। বিশ্বের শক্তি ও সম্পদের উল্লেখযোগ্য অংশের নিয়ন্ত্রণসহ বিশাল অর্থনৈতিক শক্তি তাদের। তবুও গাজার পদ্ধতিগত ধ্বংসের প্রতি মুসলিম সরকারগুলোর প্রতিক্রিয়া অপর্যাপ্ত। কিছু আরব রাষ্ট্র যারা একসময় তাদের পররাষ্ট্রনীতি ফিলিস্তিনের সাথে সংহতির দ্বারা সংজ্ঞায়িত করত, তারা ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে এবং সেই সম্পর্ক আরো গভীর করছে। আরব লিগ সম্মেলন করে। প্রস্তাব পাস হয়। এদিকে গাজায় বোমা পড়তে থাকে।
মুসলিম বিশ্বের মানুষ ইন্দোনেশিয়া থেকে মরক্কো পর্যন্ত, তুরস্ক থেকে পাকিস্তান পর্যন্ত, বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়া পর্যন্ত- এমন সংখ্যায় রাস্তায় নেমেছে যা প্রমাণ করে, নীরবতাটা সরকারের, জনগণের নয়। সর্বত্র সাধারণ মুসলমানরা গাজার যন্ত্রণা হাড়ে হাড়ে অনুভব করেছে, দান করেছে, পক্ষ নিয়েছে, তাদের কাছে যেভাবে সম্ভব ছিল সেভাবে তাদের কণ্ঠস্বর তুলেছে। মুসলিম জনগণের যন্ত্রণা ও মুসলিম সরকারগুলোর নিষ্ক্রিয়তার হতাশা বাড়ায়।
গাজার অবরোধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার ও মানবিক সাহায্যের অবাধ প্রবেশ প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত ও আন্তর্জাতিক আইনের অন্যান্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সব পক্ষের যুদ্ধাপরাধের জন্য পূর্ণ জবাবদিহিতা প্রয়োজন। একটি রাজনৈতিক নিষ্পত্তি প্রয়োজন- আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসঙ্ঘের প্রস্তাব ও প্রতিটি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের মৌলিক নীতির উপর ভিত্তি করে, যা দখলদারিত্ব শেষ করবে, অবৈধ ইসরাইলি বসতি উচ্ছেদ করবে এবং পূর্ব জেরুসালেমকে রাজধানী করে একটি কার্যকর, সার্বভৌম ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবে।
ফিলিস্তিন প্রশ্ন নতুন নয়। যুদ্ধ, ইন্তিফাদা, কখনো বাস্তবায়িত না হওয়া শান্তি চুক্তির মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। বিলম্বের প্রতিটি দশক আরেকটি ফিলিস্তিনি প্রজন্ম তৈরি করেছে যারা বঞ্চনায় জন্মেছে, শরণার্থী শিবিরে বড় হয়েছে, এই জ্ঞানে শিক্ষিত হয়েছে যে, বিশ্ব তাদের অধিকার ও জীবনকে ব্যয়সাধ্য মনে করে। এটি চলতে পারে না। এই অমীমাংসিত অন্যায় যে উগ্রবাদ, অস্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থার ক্ষয় তৈরি করে- তা কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক শান্তির পুরো কাঠামোকে হুমকি দেয়।
এখন যা দরকার তা আর বিবৃতি নয়, প্রয়োজন কার্যক্রম। মুসলিম দেশগুলোকে অবশ্যই বাগাড়ম্বর ছাড়তে হবে। গাজা ধ্বংসকারীদের উপর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিণতি আরোপ করতে হবে। ওআইসিকে অবশ্যই একটি আলোচনা মঞ্চ থেকে সম্মিলিত চাপের একটি প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে হবে। যেসব দেশ ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে তাদের সেই সম্পর্কগুলো পুনর্বিবেচনা করতে হবে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতকে সমর্থন করতে হবে।
গাজার মানুষ অকল্পনীয় দুর্ভোগের মুখে যে সাহস ও মর্যাদা দেখিয়েছে তা এক অসাধারণ সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তারা ভাঙেনি। আত্মসমর্পণ করেনি। সন্তানদের কবর দিয়ে প্রতিরোধ অব্যাহত রেখেছে।
লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক



