বাংলাদেশের উন্নয়নের মানচিত্রে একটি নির্মম বৈষম্যের ইতিহাস ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। স্বাধীনতার পর থেকে যত বড় বড় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে—তার অধিকাংশই ঢাকা ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকেন্দ্রিক। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলী টানেল, পদ্মা ব্যারাজসহ একের পর এক বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে। অথচ রংপুর বিভাগ, বিশেষ করে তিস্তা অববাহিকার কোটি মানুষ আজও উন্নয়ন বৈষম্যের তলানিতে পড়ে আছে।
এই অঞ্চলের মানুষের জীবন এখনো নদীভাঙন, খরা, বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের সাথে অবিরাম সংগ্রামের নাম। প্রতিবছর তিস্তা ও এর শাখা নদীগুলোর ভাঙনে হাজার হাজার পরিবার গৃহহীন হয়। কৃষিজমি হারিয়ে মানুষ শহরমুখী হয়। কর্মসংস্থানের অভাবে উত্তরাঞ্চল থেকে বিপুল জনগোষ্ঠী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শ্রমবাজারে ঠেলে দেয়া হয়। অথচ এই সঙ্কট নিরসনে সবচেয়ে বড় ও কার্যকর উদ্যোগ হতে পারত তিস্তা মহাপরিকল্পনা।
কিন্তু বাস্তবতা হলো—তিস্তা নিয়ে প্রতিশ্রুতি আছে, বাস্তবায়ন নেই।
গত এক দশকে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে উত্তরাঞ্চলে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছে, তা বাংলাদেশের নদী ও আঞ্চলিক অধিকারের ইতিহাসে বিরল। ‘তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ’ ২০১৫ সাল থেকেই এই দাবিতে ধারাবাহিক আন্দোলন, পদযাত্রা, জনসভা, মহাসমাবেশ, স্তব্ধ রংপুর, কনভেনশন, নৌকা সমাবেশ, তিস্তার দুই তীরে ২৩০ কিলোমিটার মানববন্ধন, গণস্বাক্ষর অভিযান, স্মারকলিপি প্রদান ও গণসংযোগ চালিয়ে আসছে। একই দাবিতে ২০২৫ সালে ‘জাগো বাহে তিস্তা বাঁচাই’ স্লোগানে ‘তিস্তা নদী রক্ষা’ আন্দোলনের ব্যানারে হয়েছিল ৪৮ ঘণ্টার গণঅবস্থান ও মশাল প্রজ্জ্বলন। সাড়া জাগানো এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন বর্তমান সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। তিস্তা পাড়ের কৃষক, শ্রমিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, জেলে, শিক্ষার্থী, নারী—সব শ্রেণির মানুষ এই আন্দোলনে শামিল হয়েছিল।
এক সময় এই আন্দোলন দেশ কাঁপানো গণদাবিতে পরিণত হয়। কারণ মানুষ বিশ্বাস করেছিল—তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের ভাগ্য বদলাবে। কিন্তু প্রতিটি সরকারই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, আবার পিছিয়েও গেছে।
নির্বাচনের আগে নেতারা বলেছেন—তিস্তা হবে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে হবে। উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা হবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখেও প্রায় সব রাজনৈতিক দল তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—ভোট শেষ, প্রতিশ্রুতিও শেষ।
তিস্তা পাড়ের মানুষের ভাষায় : ‘হামরা লড়াই করতে করতে বুড়া হইলাম। সবাই ভোটের আগে কথা দেয়, ভোট শ্যাষ—সব শ্যাষ। ওমরা সবায় হামাক ঠগায় বাহে।’ এই একটি বাক্যের মধ্যেই জমে আছে উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘ বঞ্চনা ও ক্ষোভের ইতিহাস।
আজ মানুষের প্রশ্ন আরো তীব্র হয়েছে। সরকার যখন পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নের ঘোষণা দেয়, তখন উত্তরাঞ্চলের মানুষ জানতে চায়—তিস্তা হবে না কেন? তিস্তা মহাপরিকল্পনার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ব্যয়ের প্রকল্প যদি রাষ্ট্র নিজের টাকায় করতে পারে, তাহলে তিস্তার ক্ষেত্রে এত অনীহা কেন?
এখানেই মূল প্রশ্নটি রাজনৈতিক সদিচ্ছার।
কারণ বাস্তবতা হলো, তিস্তা মহাপরিকল্পনা শুধু একটি নদী খনন প্রকল্প নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি পুনর্গঠন, কৃষি পুনরুজ্জীবন, নদীভাঙন প্রতিরোধ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও জলবায়ু অভিযোজনের সমন্বিত পরিকল্পনা। এটি বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের কৃষিতে নতুন বিপ্লব ঘটতে পারে। সমবায়ভিত্তিক কৃষি, কৃষিভিত্তিক শিল্প, মৎস্যসম্পদ, নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি ও স্থানীয় বাজারব্যবস্থার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
কিন্তু তিস্তা নিয়ে বারবার যে দোদুল্যমানতা দেখা যায়, তা উত্তরাঞ্চলের মানুষকে এই বিশ্বাসে পৌঁছে দিয়েছে যে উন্নয়নের প্রশ্নে তারা এখনো দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই ক্ষোভ এখন ধীরে ধীরে রাজনৈতিক বিক্ষোভে রূপ নিচ্ছে। মানুষ মনে করছে, আন্দোলন করলে তিস্তা হয় না; কিন্তু আন্দোলন ছাড়াই পদ্মা হয়। তাহলে কি রাষ্ট্রের উন্নয়ন পরিকল্পনায় উত্তরাঞ্চলের মানুষের কণ্ঠের মূল্য কম?
এই প্রশ্ন উপেক্ষা করা বিপজ্জনক।
কারণ তিস্তা এখন শুধু নদীর প্রশ্ন নয়; এটি আঞ্চলিক ন্যায়বিচার, সমতা ও রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে যত দেরি হবে, উত্তরাঞ্চলের মানুষের ক্ষোভ তত গভীর হবে। সরকার যদি সত্যিই বৈষম্যহীন উন্নয়নের কথা বলে, তাহলে এখনই স্পষ্ট রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিদেশী অর্থায়ন বা কূটনৈতিক জটিলতার অজুহাত নয়—নিজস্ব অর্থায়নেই তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু করতে হবে। এখানে ভূ-রাজনীতির টানাপোড়েন থাকলে তা ওতরাতে হবে ‘বুদ্ধিদীপ্ত’ ভারসাম্যের কূটনীতি দিয়েই। কারণ উত্তরাঞ্চলের মানুষ আর শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না। তারা বাস্তব কাজ দেখতে চায়। নয়তো ইতিহাস একদিন প্রশ্ন করবে—পদ্মা হলো, তিস্তা হলো না কেন?
লেখক : সভাপতি, তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ।



