দেশের বর্তমান জ্বালানি সঙ্কট কেবল যান্ত্রিক ত্রুটি বা সাময়িক লোডশেডিং নয়, বরং এক ‘দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত দুর্বলতা,’ যা এখন জাতীয় নিরাপত্তার স্তরে পৌঁছেছে। একটি রাষ্ট্রের কার্যকারিতার জন্য যেসব শর্ত অপরিহার্য তার গুরুত্বপূর্ণ একটি হলো জ্বালানি নিরাপত্তা। এই জ্বালানির মধ্যে তেল ও বিদ্যুৎ দুটিই রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে এখন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল-ইরান যে যুদ্ধ চলছে তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জ্বালানির অধিকার, কর্তৃত্ব ও অবাধ প্রবাহের বিষয়টি।
গ্যাস সরবরাহ ও দেশীয় মজুদের চিত্র
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের বড় অংশ এখনো গ্যাসনির্ভর। মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অর্ধেকেরও বেশি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আসে। কিন্তু দেশে গ্যাস উৎপাদন ধীরে ধীরে কমে এসে বর্তমানে দৈনিক প্রায় ২,০০০ থেকে ২,২০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফটি) পর্যায়ে নেমেছে, যেখানে দেশের মোট চাহিদা প্রায় ৩,৮০০ থেকে ৪,০০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে এলএনজি আমদানির মাধ্যমে প্রতিদিনের ঘাটতি পূরণ করতে হচ্ছে।
পেট্রোবাংলা এবং হাইড্রোকার্বন ইউনিটের ২০২৪-২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার না হলে ২০৩১ সালের মধ্যে বিদ্যমান উৎপাদনক্ষম কূপগুলো থেকে গ্যাস উত্তোলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কার্যক্রমে দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতি এই সঙ্কটের অন্যতম কারণ। গত দেড় দশকে স্থলভাগে মাত্র কয়েকটি অনুসন্ধানী কূপ খনন করা হয়েছে, যা বৈশ্বিক মানদণ্ডের তুলনায় অত্যন্ত কম। ফলে সম্ভাবনাময় নতুন রিজার্ভ শনাক্তকরণ পিছিয়ে পড়েছে। আবার সীমান্তবর্তী কিছু স্থলভাগের সম্ভাবনাময় ব্লক আছে যেখানে জ্বালানির মজুদ দুই দেশেরই সীমান্ত অঞ্চলে রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। গত কয়েক দশকে এই এলাকায় গভীর অনুসন্ধান কূপ খননের উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী দশকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় আরো বাড়বে এবং শিল্প খাতেও চাপ সৃষ্টি হবে। তাই এখনই নতুন অনুসন্ধান, উত্তোলন এবং নীতিগত সংস্কারে অগ্রাধিকার দেয়া জরুরি।
এলএনজি নির্ভরতা ও বৈশ্বিক বাজারের ঝুঁকি
গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে বাংলাদেশ এখন স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানির ওপর ক্রমবর্ধমানভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে যে গ্যাস ৬/৭ ডলারে কেনা সম্ভব ছিল সেটি ৩০ ডলারে পর্যন্ত কেনা হয়েছে। স্বল্পমেয়াদি সরবরাহ নিশ্চিত হলেও এই কৌশল দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে।
বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় বাংলাদেশের রিজার্ভের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করছে। ডলার সঙ্কটের কারণে অর্থনীতির সামগ্রিক স্থিতিশীলতাও ঝুঁকিতে পড়ছে।
অন্য দিকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে এলএনজির দামও অনিশ্চিত। ২০২৬ সালের বিভিন্ন প্রক্ষেপণ বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক চাহিদা বৃদ্ধির কারণে এলএনজির দাম প্রতি প্রতি মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফটি) ৩০ ডলার বা তারও বেশি হতে পারে। এই মূল্যস্তর দীর্ঘমেয়াদে বহন করা বাংলাদেশের মতো অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত কঠিন।
ফলে জ্বালানি নিরাপত্তা এখন শুধু সরবরাহ নয়, বরং টেকসই আর্থিক স্থিতির বড় চ্যালেঞ্জ।
সক্ষমতা বনাম উৎপাদন
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের স্থাপিত গ্রিড সক্ষমতা বর্তমানে প্রায় ২৮,০০০ থেকে ৩০,০০০ মেগাওয়াট। কিন্তু জ্বালানি সঙ্কট, বিশেষ করে গ্যাস ও কয়লার ঘাটতির কারণে বাস্তব উৎপাদন অনেক সময় ১২,০০০ থেকে ১৩,০০০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে আসে। ফলে স্থাপিত সক্ষমতা ও প্রকৃত উৎপাদনের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে, যা বিদ্যুৎ ব্যবস্থার কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
সিপিডির গবেষণা অনুযায়ী, দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর প্রায় ৪৬ থেকে ৫০ শতাংশ সক্ষমতা অলসভাবে পড়ে থাকে পর্যাপ্ত প্রাথমিক জ্বালানির অভাবে। অর্থাৎ, অবকাঠামো থাকলেও জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা পুরো ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে তুলছে।
এই অদক্ষতার আরেকটি বড় আর্থিক দিক হলো ক্যাপাসিটি চার্জ। গত ১৫ বছরে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে (আইপিপি) প্রায় ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি দেয়া হয়েছে ক্যাপাসিটি চার্জ হিসাবে, যদিও অনেক কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারেনি। এতে রাষ্ট্রের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
বিদ্যুৎ খাতে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং অর্থনৈতিকভাবে টেকসই উৎপাদন কাঠামো গড়ে তোলা।
শিল্পায়ন ও আরএমজি খাতের ঝুঁকি
বাংলাদেশের রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে তৈরী পোশাক খাত থেকে। এই খাত দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হলেও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি এখন এর প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) তথ্য মতে, গ্যাস সঙ্কটের কারণে একাধিক কারখানায় উৎপাদন খরচ ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান দুর্বল হচ্ছে, বিশেষ করে ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের তুলনায়।
অন্য দিকে বৈশ্বিক নীতিগত চাপও বাড়ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন পরিবেশ নীতির অধীনে ২০৩০ সালের মধ্যে রফতানি পণ্যের উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার নিশ্চিত না করলে বাংলাদেশকে কার্বন ট্যাক্সের মুখে পড়তে হতে পারে। এটি ভবিষ্যতে রফতানি বাজারে প্রবেশাধিকারের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে।
সবমিলিয়ে, জ্বালানি সঙ্কট এখন শুধু উৎপাদন সমস্যা নয়, বরং বাংলাদেশের রফতানি অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা সক্ষমতার জন্যও কৌশলগত চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।

বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বিশ্লেষণ
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় জ্বালানির ধরন অনুযায়ী ব্যাপকভাবে ভিন্ন এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমদানিনির্ভরতা বৃদ্ধির কারণে গড় ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
প্রথমত, গ্যাস ও এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন এখনো দেশের সবচেয়ে বড় উৎস। অতীতে দেশীয় গ্যাসের মাধ্যমে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৩-৪ টাকায় উৎপাদন করা সম্ভব ছিল। কিন্তু গ্যাসের ঘাটতির কারণে এখন উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। বিশেষ করে স্পট মার্কেট থেকে কেনা এলএনজি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে ইউনিট প্রতি খরচ অনেক ক্ষেত্রে ২৫ টাকা বা তারও বেশি পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
দ্বিতীয়ত, ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল উৎসগুলোর অন্যতম। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে এর আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে এই উৎস থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের গড় খরচ প্রতি ইউনিট প্রায় সাড়ে ২৭ টাকা থেকে শুরু হয়ে কেন্দ্রভেদে আরো বেশি হতে পারে।
তৃতীয়ত, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তুলনামূলকভাবে দীর্ঘমেয়াদি সাশ্রয়ী বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হলেও বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন। প্রাথমিকভাবে প্রতি ইউনিট খরচ ৬ টাকা ধরা হলেও নির্মাণ বিলম্ব, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি এবং ঋণের সুদের কারণে এটি এখন ১০-১২ টাকার মধ্যে দাঁড়াতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
অন্য দিকে, সৌরবিদ্যুৎ (solar) দ্রুত সাশ্রয়ী হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক টেন্ডারগুলোতে বড় আকারের সৌর প্রকল্পে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৯-১০ টাকার মধ্যে নেমে এসেছে, যা ফসিল ফুয়েলভিত্তিক বিদ্যুতের তুলনায় অনেক কম ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ইস্যু
সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪০ শতাংশ পরিচ্ছন্ন বা নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি এখনো সেই লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে। বর্তমানে সৌর, বায়ু ও জলবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ৩ শতাংশেরও কম, যা কাঠামোগত রূপান্তরের ধীরগতিকে নির্দেশ করে।
আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য শক্তি সংস্থার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশে সোলার হোম সিস্টেম ব্যাপকভাবে সফল হলেও বৃহৎ পরিসরের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য বাধা রয়েছে। বিশেষ করে জমি বরাদ্দের সীমাবদ্ধতা, দীর্ঘ প্রশাসনিক অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং নীতিগত সমন্বয়ের অভাব এই খাতের অগ্রগতিকে ধীর করছে।
এ ছাড়া গ্রিড অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা ও বিনিয়োগ অনিশ্চয়তাও বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করছে। ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এটি এখনো জাতীয় বিদ্যুৎ মিশ্রণে সীমিত ভূমিকা রাখছে।
এই প্রেক্ষাপটে ২০৪১ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য শুধু ঘোষণাই নয়, বরং দ্রুত নীতিগত সংস্কার, জমি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তি বিনিয়োগ জরুরি হয়ে উঠেছে।
অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও ভবিষ্যৎ শক্তি নিরাপত্তা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের ২০৩০ সালের মধ্যে ১০,০০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন। এটি কেবল পরিবেশগত প্রতিশ্রুতি নয়, বরং একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক রূপান্তরের রূপরেখা। এটি দেশের জ্বালানি সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধার, আমদানি নির্ভরতা হ্রাস এবং নিম্ন-কার্বন, বিকেন্দ্রীভূত ও স্বনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়ার এটি একটি সুযোগ। প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাম্প্রতিক এক আলোচনায় আমার মনে হয়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত নিয়ে তার গভীর চিন্তা ও পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ এলএনজি, তেল ও বৈদেশিক মুদ্রা নির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে বৈশ্বিক মূল্য অস্থিরতার ঝুঁকিতে রয়েছে। সৌরশক্তির বিস্তৃত ব্যবহার এই নির্ভরতা কমাতে পারে। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১০,০০০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ অর্জিত হলে বছরে প্রায় ১.৫ থেকে ২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত জ্বালানি আমদানি ব্যয় সাশ্রয় সম্ভব, যা বৈদেশিক রিজার্ভকে স্থিতিশীল করবে এবং অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি কমাতে সহায়তা করবে।
অর্থায়ন নিয়ে এখানে এক ধরনের প্রচলিত ধারণা রয়েছে যেটি ভুল। অতিরিক্ত বৈদেশিক ঋণ ছাড়াই ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্স মডেলের মাধ্যমে প্রায় ৫.১ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করা সম্ভব- যার মধ্যে রয়েছে ভর্তুকি পুনর্বিন্যাস, কার্বন ট্যাক্স, প্রবাসী গ্রিন বন্ড এবং ব্যাংক সিএসআর তহবিল।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মূলধনের খরচ কমানো। যদি সুদের হার ৮-১২ শতাংশ থেকে ৩-৪ শতাংশে নামানো যায়, তাহলে নবায়নযোগ্য প্রকল্পের রিটার্ন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। এর বাইরে, একটি জাতীয় Prosumer Act প্রণয়ন করে নাগরিক, শিল্প ও কমিউনিটিকে বিদ্যুৎ উৎপাদক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। এখন ব্যবহারকারী পর্যায়ে সোলার বসিয়ে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে বিক্রি করার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীও এ ব্যবস্থার কথা বলেছেন। কিন্তু এর অনুমোদন প্রক্রিয়াটি জটিল। আইনটি প্রণয়ন করে এটিকে সহজ করা সম্ভব।
সবমিলিয়ে, প্রধানমন্ত্রীর এটি শুধু সৌরশক্তির পরিকল্পনা নয় তা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও ভবিষ্যৎ শক্তি নিরাপত্তার একটি রূপরেখা।
সমাধান কেন পথে—
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের গড় বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২.১ টাকা, যেখানে গ্রাহকপর্যায়ে বিক্রয়মূল্য অনেক কম। এই বিশাল ব্যবধানের কারণেই সরকারকে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে পারে না। মূলত বাংলাদেশের সার্বিক জ্বালানি সঙ্কটকে তিনটি স্তরে সমাধান করা যেতে পারে— সরবরাহ বৃদ্ধি, আর্থিক সংস্কার এবং জ্বালানি রূপান্তর।
প্রথমত, অনুসন্ধান খাতে অনশোর ও অফশোর উভয় অঞ্চলে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে দ্রুত গ্যাস অনুসন্ধান জরুরি। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটাতে নতুন কূপ খনন এবং গভীর সমুদ্র ব্লকে বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব নয়। বিদেশী কোম্পানির অনুসন্ধান কার্যক্রমের সাথে জাতীয় কোম্পানি বাপেক্সকে যুক্ত করে এ বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণ সম্ভব হতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনার মধ্যেও এটি রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, বিদ্যুৎ খাতের চুক্তি সংস্কার এখন আর বিকল্প নয়, বরং বাধ্যবাধকতা। বিদ্যুৎ খাতে ‘বিদ্যুৎ নেই, পেমেন্টও নেই’ নীতি বাস্তবায়ন করলে অচল বা অর্ধচালিত কেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জ চাপ কমবে এবং রাষ্ট্রীয় আর্থিক ক্ষতি হ্রাস পাবে। যেসব আইপিপির চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে সেগুলোর শর্ত সংশোধন ছাড়া কোনোভাবেই মেয়াদ বাড়ানো যাবে না।
তৃতীয়ত, আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। নেপাল ও ভুটান থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানির জন্য ডেডিকেটেড ট্রান্সমিশন লাইন তৈরি হলে পরিচ্ছন্ন ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক লাভজনকতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
সারসংক্ষেপে, নতুন কেন্দ্র নির্মাণ নয়, বরং বিদ্যমান অবকাঠামোর দক্ষ ব্যবহার, প্রাথমিক জ্বালানি নিশ্চিতকরণ এবং নীতি-শাসনের সংস্কারই আগামী রূপান্তরের মূল চাবিকাঠি। বাংলাদেশের জ্বালানি সঙ্কট সমাধানের চাবিকাঠি এখন আর নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে নেই, বরং বিদ্যমান কেন্দ্রগুলো চালানোর জন্য প্রাথমিক জ্বালানির উৎস নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতিমুক্ত নীতি প্রণয়নে নিহিত। আগামী দুই বছর (২০২৬-২৮) বাংলাদেশের জন্য এই রূপান্তরের সবচেয়ে সঙ্কটকাল হবে।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত



